নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদদের অধিকাংশই হচ্ছেন বাংলাভাষী। বাংলা ভাষাতে না লিখুন, অবিভক্ত ভারতের বাংলা প্রদেশ সম্পর্কে যখন লিখেছেন তখন তাদের মধ্যে যে ধরনের প্রত্যয় ও স্বাভাবিকতা দেখা গেছে, সর্বভারতীয় বিষয়ে লেখার সময়ে তেমনটা দেখা যায়নি। রণজিৎ গুহের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ রুল অব প্রপার্টি অব বেঙ্গল (১৯৬৩) বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ওপর লেখা; পরবর্তীতে তিনি সর্বভারতীয় বিষয়ে লিখেছেন, কিন্তু সেখানেও বাংলা থেকেছে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। এবং তার সর্বশেষ গ্রন্থে হিস্ট্রি অ্যাট দি লিমিট অব ওয়ার্ল্ড-হিস্ট্রিতে তিনি চলে এসেছেন রবীন্দ্রনাথের এবং বাংলা ভাষায় ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম প্রণেতা রামরাম বসুর কাছে। পার্থ চক্রবর্তী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে জরুরি গ্রন্থ ও প্রবন্ধ লিখেছেন, কিন্তু তার সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দি কুমার অব ভাওয়াল অ্যান্ড দি সিক্রেট হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থে গভীর অভিনিবেশ সহকারে উদ্ঘাটিত এবং রুদ্ধশ্বাসে পাঠযোগ্য যে একটি ইতিহাস রচনা করেছেন তার ভিত্তিতে রয়েছে ঢাকা জেলার ভাওয়ালগড়ের রাজকুমারত্ব নিয়ে সেই বিখ্যাত মামলা, যেটির কথা মুখে মুখে আমরা অনেকেই শুনেছি, গ্রন্থকারও শুনেছেন। ভাওয়ালের রাজকুমারকে নিয়ে মামলার ওই কাহিনিকে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন; যুক্ত না করলেও ক্ষতি ছিল না, কেননা সংযোগটি অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তা এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, শিরোনামে অন্তর্ভুক্তি দাবি করবে। গৌতম ভদ্র অবশ্য ব্যতিক্রম এ জন্য যে, তিনি তার প্রকাশকের মতে, ‘অল্পবিস্তর ইংরেজিতে লিখলেও বাংলা ভাষাতেই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন’; তাকেও দেখছি গভীর গবেষণার ও ইতিহাস বিষয়ে কৌতূহলের সঙ্গে অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন বর্ধমানের জাল রাজা প্রতাপচন্দ্রের ওপর। তার এই গ্রন্থটি ইতিহাস গ্রন্থমালার অন্তর্গত, যার প্রধান সম্পাদক হচ্ছেন রণজিত গুহ নিজে। এই গ্রন্থমালার এ পর্যন্ত প্রকাশিত আটটি গ্রন্থের তিনটিই বঙ্গদেশকে নিয়ে।
বস্তুত বাংলা ভাষায় এবং বঙ্গদেশ সম্পর্কে লেখার সমতুল্য। বঙ্কিমচন্দ্রের কথা স্মরণযোগ্য। তিনি ইংরেজিতে লিখতে পারতেন, তার কালে কেউ কেউ লিখেছেনও বৈকি, তিনি নিজেও যে শুরু করেননি তা নয়, প্রথম উপন্যাসটি ইংরেজিতেই লিখেছিলেন, কিন্তু আসলে ছিলেন তিনি অসংশোধনীয়রূপে বাঙালি, তাই কেবল যে বাংলা ভাষায় লিখেছেন তা নয়, বাঙালিকে নিয়েই লিখেছেন, মূলত। তার পত্রিকার নাম ‘বঙ্গদর্শন’, এবং সে পত্রিকাতে তিনি বাঙালির ইতিহাস নেই বলে কাতরোক্তি করে ইতিহাস লেখার আবশ্যকতার কথা বলেছেন। বলা বাহুল্য, এই ইতিহাস যে অন্য কেউ লিখে দেবে না, বাঙালিকেই যে লিখতে হবে, এটাও তিনি জানিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র অনেক বড় লেখক ছিলেন, কিন্তু সে তুলনাতে যে কম জাতীয়তাবাদী ছিলেন তাও নয়। জাতীয়তাবাদ সব সময়ে শত্রু খোঁজে এবং শত্রুর সন্ধান পেলে খুশি হয়। জাতীয়তাবাদী বঙ্কিমও শত্রুর অন্বেষণ করেছেন; শত্রু তার সামনেই অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি আর কেউই নয়, উপনিবেশবাদী ইংরেজ ভিন্ন। কিন্তু প্রকাশ্য ওই শত্রুকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছিল। আশঙ্কা ছিল যে, শত্রু বলে চিহ্নিত হলে ইংরেজরা ক্ষিপ্ত হবে এবং ওই নতুন শাসকদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে শ্রেণিগত ও ব্যক্তিগতভাবে যেসব সুযোগ-সুবিধা লাভ করা যাচ্ছিল সেগুলোও বিপন্ন হবে। তাই বর্তমান থেকে পেছনে হটে ততদিনে ইতিহাস-কর্তৃক পরিত্যক্ত মুসলমানদের তিনি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলেন। তা ছাড়া জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে ব্যক্তিগতভাবে তিনি ধর্মের দিকে যে ঝুঁকে পড়েছিলেন এটাও সত্য। বাঙালির জাতীয়তাবাদের জন্য ওই সময়টা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাদের জাতীয়তাবাদ ভাষাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ না করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে না এগিয়ে পেছন দিকে সরে যাচ্ছিল, সেই পশ্চাদগমনে বঙ্কিমের মতো মনেপ্রাণে বাঙালিও বড় একটা অবদান যুক্ত করে দিয়েছিলেন। ফলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিণত হলো সাম্প্রদায়িক আন্দেলনে; ক্রমে হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের উচ্চবর্গের মানুষদের মধ্যে মার মার কাট কাট লড়াই শুরু হয়ে গেল। এবং পরিণতি কী দাঁড়াল সে ইতিহাস তো আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েই পড়ে রয়েছে।
ভাষাকে ভুলে যখন মানুষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে তখন বর্ণ চলে আসে। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রের মতো অসাধারণ মানুষের মধ্যেও যেমনটা এসেছিল। ‘বাঙ্গালী উৎপত্তি’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘ইংরেজ এক জাতি, বাঙ্গালীরা বহু জাতি। বাস্তবিক কারণে যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলি তাহাদের মধ্যে চারি প্রকার বাঙ্গালী পাই। এক আর্য্য, দ্বিতীয় অনার্য্য হিন্দু, তৃতীয় আর্য্যানার্য্য হিন্দু, আর তিনের বার এর চতুর্থ জাতি বাঙ্গালী মুসলমান। এই চারি ভাগ পরস্পর হইতে পৃথক থাকে। বাঙ্গালী সমাজের নিম্ন স্তরেই বাঙ্গালী অনার্য্য বা মিশ্রিত আর্য্য ও বাঙ্গালী মুসলমান; উপরের স্তরে প্রায় সকলেই আর্য্য। এই জন্য দূর হইতে দেখিতে বাঙ্গালী জাতি অমিশ্রিত জাতি বলিয়াই বোধ হয় এবং বাঙ্গালার ইতিহাস এক আর্য্যবংশীয় জাতির ইতিহাস বলিয়া লিখিত হয়।’
ভাষা ছেড়ে বঙ্কিমচন্দ্র এখানে বর্ণের কাছে চলে গেছেন। বর্ণ অর্থ (শেষ পর্যন্ত) আর্য্যত্ব, এবং আর্য্যত্ব অর্থ সনাতন হিন্দুত্ব। এটা খুবই পরিষ্কার সত্য যে, ব্রিটিশ আমলে বাঙালি যখন ভারতীয় হবার চেষ্টা করেছে তখন তার পক্ষে হিন্দু বা মুসলমান না হয়ে উপায় থাকেনি। কেননা সর্বভারতীয় অঙ্গনে বাঙালির সঙ্গে তথাকথিত অন্য ভারতীয়দের ঐক্য তো ভাষার ভিত্তিতে হতে পারে না, যদি হয় তবে হতে পারে শুধু ধর্মের ভিত্তিতেই। ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল বটে, কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলাটা তাদের লক্ষ্যের মধ্যে থাকার কথা নয় এবং তা মোটেই ছিল না। ভারতীয়রা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হোক, এটা তাদের কাম্য হতে পারে না, কারণ তেমন ঐক্য ব্রিটিশের পক্ষে নয়, বিরুদ্ধেই যাওয়ার কথা; শাসনের স্বার্থে ভারতীয়দের বিভক্ত করাই বরঞ্চ ছিল তাদের রাজনৈতিক নীতি। ভারতীয়রা যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সেই কাজটা শাসক ব্রিটিশের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ঘটেছে। ভারতীয়দের উপনিবেশবাদ-বিরোধিতার ক্ষেত্রে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ছিল বৈকি; ওই ঐক্যকে জাতীয়তাবাদী ঐক্য বলা হয়েছিল বটে, কিন্তু সেই নাম দেওয়াটা সম্ভব ছিল কেবল ব্রিটিশ-বিরোধিতার ক্ষেত্রেই; তার বাইরে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে ধর্মের বিবেচনা কিন্তু অপরিহার্যভাবেই এসে গেছে। এবং আসার ফলে একদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে মুসলিম জাতীয়তাবাদ দাঁড়িয়ে গিয়ে ভয়ংকর এক বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলেছে।
জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্ষেত্রে ভাষার যে ভূমিকা সেটা বঙ্কিমচন্দ্র জানতেন, না হলে বাংলাভাষী মানুষকে তিনি বাঙ্গালী বলবেন কেন, তা তারা যে বর্ণের মানুষই হোক না কেন। কিন্তু তিনিই আবার হিন্দু হয়ে যান, বাঙালিত্বকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে এবং হিন্দু হয়ে সর্বভারতীয় জাতীয়তার অংশীদার হয়ে পড়েন। ধর্ম একই ভাষাভাষীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, ঐক্য তৈরি না-করে। মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাভাষা যে শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে জাতীয় পরিচয়ের স্মারক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সে বিষয়টি রণজিৎ গুহ নিজেও লক্ষ্য করেছেন, তার ‘ডমিন্যান্স উদ্আউট হেজিমনি’ বইতে। সেখানে ‘অ্যান আইডিওলজি অব মাতৃভাষা’ প্রবন্ধে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। নিজের পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ ঈশ্বর গুপ্ত বলছেন যে, পৃথিবীতে সব জাতির মানুষই নিজেদের জাতীয় ভাষার চর্চা করে থাকে; কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এটি যে, বঙ্গের শিক্ষিত মানুষেরা জাতীয় ভাষার প্রতি কোনো প্রকার মনোযোগ না দিয়ে ইংরেজি ভাষার চর্চায় অধিকাংশ শক্তি ব্যয় করায় ব্যস্ত রয়েছে।
ঈশ্বর গুপ্ত অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্রের মতো অতটা বড় লেখক নন। প্রবলও নন; এবং তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে তেমন ভাবে লেখেননি, যেমনভাবে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত ‘আধুনিকতা’ ও সিপাহী অভ্যুত্থানে যোগদানকারী বিদ্রোহী সিপাহী উভয়কে নিয়েই পরিহাস করেছেন, তার মধ্যে একটা পশ্চাদপসরণ ছিল যেটা, ধরা যাক, বিদ্যাসাগরের মধ্যে ছিল না। ওই কালে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভাষা যে কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল তা দেশপ্রেমিক অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যিকরা যেভাবে বাংলাভাষার চর্চা করেছেন তার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। না ঔপনিবেশিক কালে, না পরবর্তীতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ যে পূর্ণতা পায়নি সেই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার জন্য নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদদের দুঃখের পেছনে তাই একটি ভ্রমের উপস্থিতি দেখি; সেটি এই যে, ভারতীয়রা তো কখনোই এক জাতি ছিল না, তারা একটি পরিপূর্ণ জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলবে কী করে? যা ছিল না এবং গড়ে ওঠা সম্ভবও নয়, তাকে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা বৃথা কালক্ষেপণ মাত্র। পার্থ চ্যাটার্জি তার ‘দি নেশন অ্যান্ড ইটস ফ্র্যাগমেন্টস : কলোনিয়াল অ্যান্ড পোস্ট-কলোনিয়াল হিস্টোরিজ’ বইতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনায় ঐক্যের সমস্যাটির কথা তুলেছেন। বাঙালি জাতি সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের যে বক্তব্যটির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন যে, বাঙালির ইতিহাস বৃহত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে আলাদা, এই ধারণাটির মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তার অখণ্ডতার বিষয়ে সংশয় নিহিত রয়েছে কি না সেটা একটা জিজ্ঞাসা বটে। বলছেন যে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বিকল্প ইতিহাস যদি স্বতন্ত্রভাবে লেখা যেত ভারতবর্ষের ইতিহাস তাহলে দিল্লির সিংহাসনকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হতে পারত। কিন্তু ওই রকমের ভিন্ন ইতিহাস রচনার উপাদান যেহেতু এখনো হস্তগত হয়নি তাই স্বীকার না-করে উপায় নেই যে, ভারতবর্ষের জাতীয় ইতিহাসের অখণ্ডতার ধারণাই ভারতীয়দের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। পার্থ চ্যাটার্জির এই মন্তব্য যথার্থ। কিন্তু ভৌগোলিক আঞ্চলিকতা আসল সত্য নয়, আসল সত্য হচ্ছে জাতিগত বিভাজন, যে বিভাজনের ভিত্তি ধর্ম নয়, ভিত্তি হচ্ছে ভাষা।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়