পুলিশকে চাঁদা দিয়ে হকারের দাপট

কলেজ থেকে বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রী ছাউনিতে এসেছে চার সহপাঠী। বেঞ্চে পর্যাপ্ত জায়গা নেই; অল্প জায়গায় আঁটোসাঁটো হয়ে বসে আছে তারা। বামপাশে একজন হকার মোবাইল সিম বিক্রি করছে। ডানপাশে ফ্লোরে বসে একটি শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে সবার কাছে সাহায্য চাইছেন এক নারী। চারপাশে কোলাহল। যাত্রী ছাউনিতে ও ফুট ওভারব্রিজে জামাকাপড়, ফল, ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রিতে ব্যস্ত হকাররা।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে এমন চিত্রই দেখা গেল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে খিলক্ষেত ট্রাফিক পুলিশ বক্সের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের যাত্রী ছাউনিতে ও ফুট ওভারব্রিজে।

কুর্মিটোলা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী জীবন নেছা নিপা দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘প্রতিদিন বাড্ডা থেকে খিলক্ষেত কলেজে আসি। প্রতিদিন ব্যবহার করতে হয় ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু হকারদের কারণে ফুট ওভারব্রিজ ও যাত্রী ছাউনিতে হয়রানির শিকার হতে হয়। যাত্রী ছাউনিতে হকারদের কারণে বসা যায় না। বেঞ্চে ময়লা-আবর্জনা লেগেই থাকে। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শান্তিপূর্ণভাবে এখানে বসে অপেক্ষা করার সৌভাগ্য আপনার হবে বলে মনে হয় না। এত শব্দদূষণ যে আপনার মাথা ধরে যাবে।’ 

যাত্রী-পথচারীদের অনেকেই বলে, ফুট ওভারব্রিজ ও যাত্রী ছাউনিতে হয়রানির শিকার হন পথচারীরা। প্রায় প্রতিদিন ঘটে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা।

মাহাতাব উদ্দিন সরকার পেশায় শিক্ষক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন জনগণের সেবার জন্য অনেক টাকা খরচ করে যাত্রী ছাউনি ও ফুট ওভারব্রিজ করেছে। কিন্তু এগুলোর দেখভাল করার জন্য কেউ নেই। ঢাকার ফুটপাত আর ফুট ওভারব্রিজ পথচারীদের দখলে থাকার কথা ছিল। ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলা, আর ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে পারাপার হওয়ার কথা মানুষের। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। ফুটপাত উপেক্ষা করে প্রধান সড়ক ধরে হাঁটছে এবং চলতি যান থামিয়ে উঠছে মানুষ। এর কারণ, ফুটপাত আর ফুট ওভারব্রিজ ভাসমান দোকানদার ও ভিক্ষুকের দখলে।’

নাম-পরিচয় গোপন রেখে এক পথচারী বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছে অসাধু ট্রাফিক পুলিশ ও থানার কিছু পুলিশ কর্মকর্তা। যাত্রী ছাউনি ও ফুট ওভারব্রিজে সারাক্ষণ হকারদের মেলা। যে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে তারাই সেখান থেকে প্রতিদিন মাসোহারা নেয়। প্রতিটা দোকান থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচশ টাকা চাঁদা তোলা হয়। কিন্তু আপনি হকারদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তারা কিছুই বলবে না। কারণ তাদের ব্যবসা করতে হবে। সন্ধ্যা হলেই টহল পুলিশ এখান থেকে টাকা নিয়ে যায়।’ 

একথা স্বীকার করেছে সেখানে থাকা কয়েক জন হকার। কিন্তু তারা নাম-পরিচয় জানাতে রাজি হননি। একজন হকার বলেন, ‘কী করব, কোথায় যাব? যত জুলুম-নির্যাতন আমাদের ওপরে চলে। সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। নেতারা সুবিধা নেয়। টাকা দিলে পুলিশ ব্যবসা করতে দেয়। কিছু করে খেয়েপরে পরিবার নিয়ে বাঁচতে হবে তো।’ 

পুলিশের নাম করে ওই স্থানের দোকানিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ কমিশনার (পেট্রোল ক্যান্টনমেন্ট জোন) খন্দকার রেজাউল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। অনেকেই প্রশ্নটি করেন, কিন্তু কোনো প্রমাণ দিতে পারেন না। তবুও আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’ 

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-১-এর নির্বাহী কর্মকর্তা জুলকার নায়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই আমরা ওয়ার্ডগুলোতে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছি। শিগগির সেখানেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব, যাতে যাত্রী ছাউনি ও ফুট ওভারব্রিজ সাধারণ মানুষ স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারে। আবার কোনো হকার যাতে ওই স্থানে বসতে না পারে তার জন্য খিলক্ষেত থানা ও খিলক্ষেত ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলব।’ 

উল্লেখ্য, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকায় সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে এবং উভয় পাশের যাত্রী ছাউনি ও ফুট ওভারব্রিজ হকার ও ভিক্ষুকমুক্ত করেছে।