চলতিসহ বিগত আট বাজেটবর্ষে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ পিছিয়ে পড়লেও, বছর বছর রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি শতকরা ১৭-২০ হলেও যথেষ্ট উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেই ২০২৩-২৪-এর জাতীয় বাজেট নির্মাণের আভাস মিলছে নীতিনির্ধারকদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে। করোনাবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার যেখানে চ্যালেঞ্জ, নিজেদের সৃষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতির সংকটকে ইউরোপীয় যুদ্ধের ওপর চাপানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখে, নির্বাচনের বছরে নতুন-পুরনো মেগা প্রকল্পসহ বাহুল্য ব্যয়ের বাজেট তৈরি হলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার বাজেটও বড় হবে ।
এনবিআর সেই রাজস্ব আহরণ করতে সক্ষম কিনা, যে সমাজ ও অর্থনীতি থেকে রাজস্ব আহরিত হবে সেই পরিবেশ ও অর্থনীতিকে সে মতে সুস্থ-সবল পাওয়া যাবে কিনা সেটা বিবেচনায় আনার অবকাশ থেকে যাবে। সব চাইতে বড় বিবেচ্য থেকে যাবে ২০২৩-২৪-এর বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে দুটি সরকার বর্তমান সরকার (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৩) এবং নতুন নির্বাচিত সরকার (জানুয়ারি ২০২৪-জুন)। বাজেট বাস্তবায়নের বাস্তবতায় বছরের মাঝপথে গিয়ে হয়তো উন্নয়ন বাজেট ওরফে এডিপি বড় কাটছাঁটের শিকার হবে, অনুন্নয়ন বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাত বিশেষ করে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণসহ স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দের হিস্যা হ্রাস পেতে পারে, ব্যাংক ঋণসহ নানান সংস্কারের শর্তসংবলিত দাতা সংস্থার কাছ থেকে আরও বাজেট সাপোর্ট ফান্ডের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সে নিরীখে রাজস্ব আয়ের বড় বাজেট হবে।
রাজস্ব আহরিত না হলে ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’। মূল্যস্ফীতি বাড়ানো যার অনিবার্য পরিণতি। বাড়বে সুদের কিস্তি। যার মাশুল দিতে হবে আমজনতাকেই। অর্থনীতির অ-ব্যবস্থাপনার দায়ভার বর্তাবে সাধারণ সব মানুষের কাঁধে।
কর রাজস্ব জিডিপির অনুপাত ন্যায্য পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হতেই থাকবে। আসল কথা থেকে যাবে করের হার না বাড়িয়ে কর জালের সম্প্রসারণ ঘটিয়েই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাযতœবান হতে হবে। উপলব্ধিকে বাস্তবতায় এভাবে আনতে হবে সব পক্ষকেই যে, বাঞ্ছিত পরিমাণ রাজস্ব বা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য নয় শুধু, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি।
দেশকে স্বয়ম্ভর এর গৌরবে গড়তে ও পরনির্ভরতার নিগড় থেকে বের করে আনতে কর রাজস্ব অন্যতম প্রভাবক ভূমিকা পালন করবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তরফে সরকারের সামষ্টিক আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি প্রয়াসে তাই থাকা চাই বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সম্মিলনে উন্মোচিত আত্মবিশ্বাসের, সহযোগিতা সঞ্জাত মনোভঙ্গি ভজনের, পদ্ধতি সহজীকরণের, করদাতার আস্থা অর্জনের অয়োময় প্রত্যয়। গতানুগতিক কর্মধারায় নয়; নীতিনির্ধারক, বাস্তবায়ক ও নাগরিক নির্বিশেষে সবাইকে সক্রিয় সচেষ্ট হতে হবে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণে। নতুন জাতীয় বাজেটে সে মর্মে দিকনির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনার পথনকশা প্রত্যাশিত থেকেই যাবে।
সবার ওপর দাবি থাকবে, অর্থনীতির মেরুদ- আর্থিক খাতের সংস্কার, কড়া বিচার-আচার। তাৎক্ষণিক বা অগৌণে সে বিচার-আচার শুরু এবং শেষ না হলে ব্যাংকিং খাতকে আইসিইউ থেকে বের করে আনা যাবে না। ব্যাংকিং খাতের সম্ভাব্য অপমৃত্যু ঠেকাতে না পারলে রাজস্ব আহরণসহ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে থাকা অর্থনীতির আম-ছালা দুটোই যাবে। ব্যাংক কমিশন গঠন এবং অবিলম্বে কাজে নামার অঙ্গীকার আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় উচ্চারণ পর্যন্ত অপেক্ষার সুযোগ দেখছি না।
২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো বৃত্তাবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কর রাজস্ব আহরণের সাফল্য লাভের পরবর্তী পাঁচ বছরে পেছনে তাকাতে হয়নি এনবিআরকে। সেই পাঁচ অর্থবছরে সার্বিক রাজস্ব আয় প্রায় শতভাগ বৃদ্ধি পায়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পেছনে অন্যান্য কারণের সঙ্গে এডিপির আকার বৃদ্ধিজনিত প্রবৃদ্ধিও সহায়ক ভূমিকায় ছিল। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাস্তবায়িত এডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮৪৫৫ কোটি টাকা আর ২০১৪-১৫-তে তা ৮৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। গত অর্থবছরগুলোতে এডিপির বাস্তবায়ন পরিমাণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে সমানুপাতিক হারে অধিক পরিমাণে রাজস্ব অর্জিত হয়নি, বিষয়টি বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে।
দেখা গেছে, আগের পাঁচ অর্থবছরে কোম্পানি ও কোম্পানি ব্যতীত করের অনুপাত ৫৯:৪১ থেকে ৫৫:৪৫-এর মধ্যে ওঠানামা করলেও পরবর্তী দু-তিন অর্থবছরে এই অগ্রগতি অনুপাত পরিলক্ষিত হয়নি। রাজস্বে আয়করের হিস্যা ২৫ থেকে ৩৩-এর মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এখনো আয়কর কর রাজস্ব প্রাপ্তির পরিবারে অন্যতম শরিক হওয়ার সংগ্রাম করছে। অর্থনীতির আকার অবয়ব চেহারা ও চরিত্র অনুযায়ী আমদানি শুল্ক (আশু) ও মূল্য সংযোজন করকে (মূসক) টপকিয়ে আয়করের অবস্থান অনেক ওপরে হওয়া বিধায় এবং বাঞ্ছনীয়, নয় কি?
সার্বিক রাজস্ব আয়ে অধিক পরিমাণে মূসক হিস্যা এখনো শতকরা ৩৫ আর আশু ৩৩। সামষ্টিক অর্থনীতিতে আয়কর এর অবদানকে অগ্রগামী গণ্য হতে হলে আরও জোরে চালাতে হবে পা, হতে হবে আরও গতিশীল, চাই অধিকতর সমন্বিত উদ্যোগ।
দেখা যাচ্ছে, আয়কর আয়ের প্রবৃদ্ধির মাত্রা এখনো ধীর, মিশ্র ও নৈরাশ্যজনক, অথচ অর্থনীতির সার্বিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষকরের মুখ্য ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রমে কোম্পানি ও কোম্পানি ব্যতীত কর আয়ের অনুপাত ৭০:৩০ থেকে ৫৮:৪২-এ পৌঁছিয়েছে। দেশে করপোরেট ব্যবসাবাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও কোম্পানি প্রদত্ত আয়করের প্রবৃদ্ধি সেভাবে বা সেহারে বাড়েনি বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে কোম্পানি ব্যতীত করদাতার মধ্যে ব্যক্তি করদাতা, পার্টনারশিপ ফার্ম, অ্যাসোসিয়েশন অব পার্সন, আর্টিফিশিয়াল জুরিডিক্যাল পার্সনস রয়েছেন তাদের করনেটের আওতায় আনার উদ্যোগ আরও জোরদারকরণের অবকাশ রয়েছে।
ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা (টিআইএনধারীর হিসাব অনুযায়ী) নিকট অতীতেও যথাযথভাবে শুমার ও সংরক্ষণ করা না হলেও যখন থেকে এসবের অগ্রগতির পরিসংখ্যান পর্যালোচিত হচ্ছে তখন থেকে অগ্রগতির ধারা বেগবান করার প্রয়াস চলছে। যারা আয়কর নথি খুলেছেন তাদের শতকরা মাত্র ২৫-৩০ ভাগ করদাতা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, বাকিদের উপযুক্ত অনুসরণের উদ্যোগ জোরদার করার আবশ্যকতা রয়েছে। আয়কর বিভাগের লোকবল বাড়ানো ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান লোকবল ও কাঠামোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এবং দেশিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ কর প্রশাসন-ব্যবস্থাপনা-প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
ধার্য ও আদায়কৃত আয়কর যথাসময়ে ও প্রকৃত পরিমাণে কোষাগারে আসার ব্যাপারে নজরদারি ও পরিবীক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনি করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব করদাতাবান্ধব বা সহজীকরণ করা যাবে, তত দূরত্ব কমবে করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে। আর এভাবে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হলে করনেটের সম্প্রসারণ ঘটতে থাকবে। দেশের কর জিডিপি রেশিও উপযুক্ত পর্যায়ে উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে এ কথা অনস্বীকার্য যে, সার্বিক রাজস্ব আয়ের পরিবারে প্রত্যক্ষ করকেই মোড়লের ভূমিকায় আসার যথেষ্ট অবকাশ ও সুযোগ রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে প্রকৃত অর্থে বোঝা যাচ্ছে না করদাতা সত্যিই বাড়ছে কিনা। সার্বিকভাবে উৎসে কর ও কোম্পানির করের ওপরই আয়করনির্ভর হয়ে পড়েছে। এটি বাড়ছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে করের প্রকৃত পরিধি বাড়ছে কিনা। করদাতার সংখ্যা বাড়ছে কিনা এবং সেই হারে করের পরিমাণ বাড়ছে কিনা। আবার এর সঙ্গে ঢালাও রেয়াত ও অব্যাহতি প্রদানসহ কর ফাঁকি রোধ বা সীমিত করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে করপোরেট করও যারা দিচ্ছেন, তারা সবাই সঠিক পরিমাণে দিচ্ছেন কিনা সেটিও দেখার বিষয় রয়েছে। কারণ প্রায়ই প্রতিবেদনে দেখা যায়, অমুক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির এত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি। এটি তো ছেলেখেলার বিষয় নয়। এখানে কর আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। সেখানে কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের, প্রয়াসের, দক্ষতার, সততার দায়িত্বশীলতার ঘাটতির প্রতিই ইঙ্গিত আসতে পারে।
গত কয়েক বছরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের বেশ কিছু সংস্কার ও জনবল কাঠামোয় ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভেবে দেখতে হবে যেহারে সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে, সেহারে কর বা করদাতা বাড়ছে কিনা, কিংবা যারা যুক্ত হচ্ছে তারা পরবর্তীতে থাকতে পারছে কিনা? বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কর বিভাগের অপারগ পরিস্থিতির কারণে করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। করের বেজ বাড়ানোর জন্য এটি জরুরি।
যোগ্য করদাতাদের করের আওতায় আনতে যুগপৎভাবে উৎসাহিত ও বাধ্য করতে কারও টাকার মালিকদের প্রতি তোষণ ও পোষণ নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। সবার বিচার, আইন ও নির্বাহী বিভাগসহ সবার সম্পদ বিবরণী দাখিল ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা হলে অনুপার্জিত অর্থের উৎস জানতে চাওয়া না চাওয়ার প্রয়োজন হবে না, দুর্নীতি দমন-নিরসন- নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হবে না। আয়কর দাতার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, যা বাড়ানোর উদ্যোগকে গতিশীল করতে দক্ষ ও দায়িত্বশীল লোকবলের সমাহার ঘটিয়ে সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা দূর করতে পারলে মোট রাজস্ব আয়ের হিস্যা বাড়ানো সহজতর হবে। কর জিডিপি রেশিও উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বাগ্রে তাই প্রয়োজন সবার সমন্বিত প্রয়াস।
লেখক: রাজস্ব অর্থনীতির বিশ্লেষক