পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে স্তালিন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিখ্যাত তিন বিজয়ীর একজন ইউসেপ স্তালিন। এই সোভিয়েত একনায়ক নেতা পশ্চিমা গোষ্ঠীর প্রচারণার কারণে নানারূপে ইতিহাসে মূল্যায়িত হয়েছেন। একসময় পান ‘ভিলেন থেকে হিরো’র তকমা। বলশেভিক এই নেতাকে এখনো যতটা না বন্ধু তারচেয়ে বেশি অত্যাচারী হিসেবে তুলে ধরা হয়। লিখেছেন নাসরিন শওকত

১৯৫৩ সালের ৫ মার্চ মারা যান ইউসেপ স্তালিন। সোভিয়েত এই নেতা ছিলেন অল-ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীদের একজন। তার জীবন, রাজনৈতিক কর্মকা- এবং তার নীতির প্রভাব নিয়ে রুশ ও পশ্চিমা প-িতরা ব্যাপক গবেষণা করেছেন। মৃত্যুর ৭০ বছর পরে জর্জিয়ার এই নেতা, রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের  সাবেক রাষ্ট্রগুলোর কাছে এক সমস্যাজনক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েছেন। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গ প্রায়ই তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে। যদি পশ্চিমের কথা বলি, তাহলে দেখা যাবে স্তালিনের নীতির নিন্দা এখন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আগে এমনটা ছিল না। স্তালিন প্রসঙ্গে পশ্চিমা মিডিয়ার প্রচার-প্রচারণা এবং অভিযোগ নিয়ে রুশ গণমাধ্যম আরটি-এর ভাষ্য এ আলোচনায় তুলে ধরা হল।

স্তালিনের উত্তরাধিকার জটিলতা

বিশ শতকের শুরুর দিকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েক দশক শাসন করেন রুশ নেতা স্তালিন। অভিযোগ করা হয়, তার নিপীড়নমূলক শাসনের জেরে তখন কয়েক লাখ মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। বলশেভিক বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধের পরে সোভিয়েত ক্ষমতার লড়াই চলে বছরের পর বছর, যা পরবর্তীকালে দেশের অস্থিতিশীলতায় ইন্ধন জোগায়। ১৯২৭ সালে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিক ত্রতস্কির রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। এবার স্তালিন তার ক্ষমতা সুদৃঢ় করেন। ত্রতস্কি যেখানে বিশ্বে বিপ্লব ঘটাতে চান, সেখানে স্তালিনের আকাক্সক্ষা তার দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা। তিনিই প্রথম কৃষি খাতে সমবায় (কালেক্টিভাইজেশন) প্রথা চালু করেন, যা জার আমলের ধনী  কৃষক দমনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এই সমবায়ীকরণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নজুড়ে বিদ্যমান দুর্ভিক্ষ আরো বিস্তৃত ও বর্ধিত হয়। এতে মৃত্যু ঘটে লক্ষাধিক মানুষের।

১৯৩৬-১৯৩৮ সাল। এই দুই বছর ধরে চলে তার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন। ইতিহাসে ‘গ্রেট টেটর’ নামে পরিচিত এই দমন-পীড়নই ছিল স্তালিনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পশ্চিমে এই সময়কালকে সাধারণত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ রবার্ট কনকুয়েস্টের চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে। তবে ওই দমন-পীড়নে হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য দেওয়া এবং লেনিনের শুদ্ধি অভিযানের শুরু বাদ দেওয়ায়  তিনি অন্য ইতিহাসবিদের অভিযোগের মুখে পড়েন। তখন ইতিহাসবিদরা হতাহতের এই পরিসংখ্যান ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করতেন।

এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমাদের বেশি মনোযোগ কাড়ে। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, স্তালিনের তখনকার দমননীতিগুলো ছিল অত্যন্ত কঠোর। এমনকি তার বিরুদ্ধে ইউক্রেন, দক্ষিণ রাশিয়া ও কাজাখস্তানেও জোর করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির অভিযোগও আনা হয়। আবার জার্মানির নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ পরিচালনা করেও তিনি সমালোচনার শিকার হন। বলা হয়,  হিটলারের যুদ্ধকৌশল ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তখন স্তালিন তার লাখ লাখ সেনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন। যুদ্ধকালে পুনর্নির্বাচন চাওয়া পশ্চিমা নেতাদের কাছে এই বিশাল পরিমাণের জীবন বিসর্জন ছিল অভিশাপ। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তারা সোভিয়েত নাগরিকদের এই আত্মত্যাগকে কখনো স্বাগত জানায়, আবার কখনো ভয়ংকর হিসেবে উল্লেখ করে।

বর্তমানে পশ্চিমাদের কাছে স্তালিন তার বর্বরতার জন্যই বেশি পরিচিত। এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও লেখক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা স্তালিনের শাসনকালের মানুষ, যুগ ও ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে সময় কাটিয়েছেন। তাদের মধ্যে ইতিহাসবিদ জে আর্ক গেটি ও ম্যাথিও লেনোয়ে অন্যতম। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের ঘটনাগুলোতে নেতা হিসেবে স্তালিনের ভূমিকা মূল্যায়নে বাস্তবমুখী অবদান রেখেছেন। এই গবেষকরা তার দমন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাদের লেখায় তুলে ধরেন। এই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে শিল্পায়ন প্রসার ঘটে, যা তার জনসংখ্যাকে বিপর্যয়কর হতাহতের মুখে ঠেলে দেয়।

স্তালিনের ভাবমূর্তি

যুদ্ধের আগে ও পরের স্তালিন সম্পর্কে পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিকরা আজ যা লিখছেন, তা এক বিষয়। তবে তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে সোভিয়েত এই নেতাকে সেই সময় কীভাবে দেখা হয়েছিল। পশ্চিমা অনেকের কাছে রুশ বিপ্লব এবং ‘সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব’ ছিল, ‘পুবের এক উজ্জ্বল আলো, ভালো দিনের প্রতিশ্রুতি ও সত্যিকারের আলোর উৎস এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্তালিন ছিলেন সেই আলোর প্রতিমূর্তি। এমন সময়ই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কমিউনিস্টরা ও সোভিয়েত প্রচারণা (প্রোপাগান্ডা) তখন তাকে ‘জাতির পিতা’ উপাধি দেয়। এদিকে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (কোমিনটার্ন)  নিয়ন্ত্রিত ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলোর কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থা ছিল অনেকটা ইউএসএসআর-এর হাতে থাকা তুরুপের তাস, যা পশ্চিমা জনগোষ্ঠীর  কাছে তাদের নেতার (স্তালিনের) অনুকূল ভাবমূর্তি প্রচারের জন্য ব্যবহার হতো। ফলে স্তাালিনের প্রতি ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের মুগ্ধতা এমন বিস্ময়কর একপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে ইউএসএসআর জার্মানির ওপর আক্রমণ শুরু করলে স্তালিন সবুজ সংকেত না দেওয়া পর্যন্ত তারা হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে গড়িমসি শুরু করে।

ইউরোপে জনপ্রিয় ফ্রন্টের উত্থান ও স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের অস্থিরতার সময়ে অনেক বামপন্থি বুদ্ধিজীবী অভিজাত মহলে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এই সম্মানিত ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিলেন লুই আরাগন, জ্যাঁ-পল সার্ত্রে, লুই আলথুসার, নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা ওয়াল্টার ডুরান্টি, পাবলো নেরুদা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আন্দ্রে মালরাক্সসহ রোমেন রোল্যান্ড প্রমুখ। বামপন্থার প্রতি সংবেদনশীল এই বুদ্ধিজীবীরা তখন তাদের ঔপনিবেশিক বিরোধী অবস্থান, শান্তিবাদ ও আদর্শবাদের কারণে মস্কো ও স্তালিনের এক ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়া ‘কেমব্রিজ ফাইভ’ বা পদার্থবিদ ক্লাউস ফুচের মতো ব্যক্তিরা সক্রিয়ভাবে ইউএসএসআরের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। মস্কোর ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে ও সোভিয়েতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে তাদের অবদান অবমূল্যায়ন করা যায় না।

ইতিহাসের আরেক স্তরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের মধ্যেও সোভিয়েত এই নেতার প্রতি আন্তরিক মনোভাব  লক্ষ্য করা যায়। দি¦তীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ‘ইফপ’ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বেশির ভাগ ফরাসিই তখন বিশ্বাস করেছিলেন, যুদ্ধে পশ্চিমারা নয় সোভিয়েত ইউনিয়নই জিতেছে। স্তালিনের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে এবং এরই মধ্যে অনেকেই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা মানতেও শুরু করেন।

তবে স্তালিনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার শুরুটা ১৯৫৬ সালে। যখন ২০তম পার্টির কংগ্রেসের সময় ইউএসএসআরের নতুন নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ তার ক্ষমতা সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেন। তখন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি তার সাবেক বস স্তালিনের সব অপরাধ ও তার শাসনামলের ব্যক্তিগত সব নৃশংসতার নিন্দা জানান। তখন তার এই বক্তব্য ইউরোপের বিভক্ত কমিউনিস্টদের জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা।

একদিক থেকে স্তালিনের ইতিবাচক ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে ক্রুশ্চেভের রাজনৈতিক কূটকৌশলকে পুরো সোভিয়েত কাঠামোর ওপর প্রথম আঘাত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ এই সময় পশ্চিমের ভিন্নমতাবলম্বীরা বই প্রকাশ শুরু করলে স্তালিনের খ্যাতির ক্রমাবনিত হতে থাকে এবং তার মতো এক একনায়কের প্রতি অন্ধ থাকায়, তার পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী অনুরাগীরাও ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়েন। তবে এ কথা সত্য, স্তালিন ত্রতস্কির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে ইতিহাস তাকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করে।

পশ্চিমা বাগাড়ম্বর

পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইভান দ্য টেরিবলকে বহু শতাব্দী ধরে এক দানব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্মম নিপীড়ন চলিয়েছেন তিনি। এ কারণে তার বিশালাকারের অঞ্চল বিজয় বা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের জন্য তার একমাত্র হুমকি হয়ে ওঠাকেও ছোট করে দেখানো হয়েছে। রুশ রাজনীতির ইতিহাসে তিনি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকদের একজন ছিলেন, তা বেশ কৌশলেই উপেক্ষা করা হয়েছে। এর বিপরীতে পিটার দ্য গ্রেটের কথাই ধরা যাক। তিনি কিন্তু মোটেও নরম স্বভাবের কোনো নেতা ছিলেন না। তারপরও তাকে এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ তিনি ‘ইউরোপের জন্য রাশিয়ার একটি পথ’ খুলে  দেন এবং রুশ সভ্যতায় ইউরোপীয় উপাদানের সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেন। তবে যখনই স্তালিন বা ত্রতস্কির কথা আসে, তখন বিস্ময়করভাবে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিকতাবাদের পক্ষে চলে যায়। সে তুলনায় গর্বাচেভ ও ইয়েলেৎসিন নিজেদের পশ্চিমামানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। তাই তাদের দুজনকে রাশিয়ার ‘ভালো’ নেতাদের কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে তারা। বর্তমানে ভøাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমাদের অবস্থান একেবারে পাল্টে গেছে। ২০০৭ সালে পুতিন তার মিউনিখ ভাষণে বলেছিলেন, এক দুর্বল রাশিয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে।

তবে জর্জিয়ার স্তালিনই একমাত্র নেতা, যিনি সম্ভবত পশ্চিমাদের কাছ থেকে একই সঙ্গে প্রশংসা ও ঘৃৃণা কুড়িয়েছিলেন। যুদ্ধের সময়ে উদার গণতান্ত্রিক প্রচারের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দেখা দেন তিনি। তখন স্তালিন কেন একজন মহান রাষ্ট্রনেতা এবং ভালো মিত্র ছিলেন, তা  অ্যাংলো-স্যাক্সন গণমাধ্যমকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। ঠিক এই সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধে রুশপন্থি চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু হয়। মহান স্তালিনের ভালোত্বেও দাবির নায্যতা প্রমাণের জন্য তখন কাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র ‘ মিশন টু মস্কো’ নির্মিত হয়েছিল।  টাইম ম্যাগাজিন তিন বছরের মধ্যে দুই বছরই স্তালিনকে ‘বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে তাদের প্রচ্ছদে স্থান দেয়। এর বিপরীতে জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমল ফার্ম’-এর প্রকাশনা বন্ধ করা হয়। স্তালিনের চারপাশে তখন পক্ষপাতমূলক ইতিবাচক প্রচারণা সক্রিয় ছিল।

তবে স্নায়যুদ্ধের সময় থেকে ধীরে ধীরে এই আখ্যানের পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে হিটলারের সঙ্গে স্তালিনকে এক কাতারে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়ছিল তখন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইউএসএসআরের প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। আর এই সম্ভাব্য পৌনে দুই কোটি রুশ নাগরিকের মৃত্যুই তাকে (স্তালিন) বিজয়ীদের টেবিলে বসার সুযোগ এনে দেয়। ঐতিহ্যগতভাবে বিজয়ী তারাই যারা ইতিহাস লেখেন এবং তা  সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করেন।

বিশ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিমারা এমন এক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায়, যেখানে ক্ষমতার শক্তিশালী বিমূর্ত রূপ কাম্য ছিল না। ১৯০০ সালের মার্কিন দার্শনিক শেলডন ওলিনের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে একটি ‘বিপর্যস্ত সর্বগ্রাসীবাদ’ (ইনভার্টেড টোটালাইটারিয়ানিজম)-এর অধীনে বাস করছিল; অর্থাৎ এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে করপোরেশন ও লবিস্টরা শাসন করে, আর সরকার একজন সেবক হিসেবে কাজ করে। এদিকে মার্কিন তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড লুই বার্নেস ১৯২৮ সালে ‘প্রোপাগান্ডা’ নামের  এক বিখ্যাত বই লেখেন। বইটির উপসংহারে তিনি  যা বলেছেন, তা যদি সঠিক হয় তবে এর অর্থ হলো, পশ্চিমা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু জাতির জন্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনৈতিক সংস্কারকের প্রয়োজন নেই, এ ক্ষেত্রে শুধু স্বল্পকালীন প্রতিশ্রুতির প্রশাসক ও পরিচালকদের প্রয়োজন।

ফরাসি ভূকৌশলবিদ পিয়েরে কনেসা ‘দ্য ফেব্রিকেশন অব দ্য এনিমি’ এবং ‘হলিওয়ার: হলিউড, উইপেন অব মাস প্রোপাগান্ডা’ নামের দুটি বই লিখেছেন। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, চলচ্চিত্রশিল্পের খামখেয়ালি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে বার্তা পাঠানো হয়, তা দিয়ে কীভাবে পশ্চিমারা তাদের শত্রুদের ওপর কর্তৃত্ব করছে এবং সেই সঙ্গে তাদের একটি অংশকে আবার নায়ক হিসেবেও তুলে ধরছে। এই উদাহরণের জন্য স্তালিন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিত্ব। ক্রেমলিনের তিনিই একমাত্র নেতা, যাকে কখনো বিপজ্জনক ব্যক্তি, কখনো নায়ক এবং সবশেষে শয়তানের এক প্রতিমূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।