ইকবাল হাবিব। স্থপতি, নগরবিদ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক। একের পর এক শব্দ সাজিয়ে, কথা বলেন দ্রুতলয়ে। বাক্য গঠনের এমন চমৎকারিত্ব, সব মানুষের থাকে না। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বললেন, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে। দীর্ঘ আলোচনার উল্লেখযোগ্য বিষয় নিয়েই আজকের আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান
দেশ রূপান্তর : রাজধানী ঢাকা শহর নিয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
ইকবাল হাবিব : একটি সম্ভাবনাময় শহর, ঢাকা। শুধু এই শহরের সমস্যার অংশটুকু বলেই আমরা থামি না। সমস্যার সম্ভাবনাটুকু অর্জন করার জন্যই যত রকমের চিৎকার-চেঁচামেচি। সম্ভাবনার প্রথম শব্দই হলো একুইটি বেইজ। অর্থাৎ সবার অন্তর্ভুক্তিতায় পরিকল্পনাগুলো সাজানো। এই যে অন্তর্ভুক্তিতায় পরিকল্পনার বিন্যাস সেটা আমাদের সব সংগঠনের মধ্যে থাকা দরকার। সম্ভবত ১১টা মন্ত্রণালয়ের ৫৪টি সংস্থা ঢাকাকে পরিচালনা করে। এরাই ঢাকার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। তারা পারস্পরিকভাবে সংঘবদ্ধ না, সংগঠিত না এবং সমন্বয় করতেও রাজি না। এই ধারণাটুকুও নিতে রাজি না যে, বিষয়টার সঙ্গে সবাই জড়িত। এটি কোনো ব্যক্তি বিশেষের বিষয় নয়।
দেশ রূপান্তর : যেমন?
ইকবাল হাবিব : তখন অল্প মানুষের তোষণে, যেটিকে আমরা ধনী মানুষ নীতিমালা বলি। এতে বিশাল অংশের মানুষ বঞ্চিত হতে থাকে। শহরের যোগাযোগব্যবস্থার কথাই যদি বলি। যোগাযোগব্যবস্থায়, গণপরিবহনভিত্তিক নগর ব্যবস্থা, এই মুহূর্তে ঢাকার অন্যতম উপায় মুক্তি।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু তা থেকে সমাধান কী?
ইকবাল হাবিব : সমাধান হচ্ছে, আমাদের স্বল্প সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সবচেয়ে বেশি মানুষের জন্য নিশ্চিত করা।
দেশ রূপান্তর : সেটি কীভাবে সম্ভব?
ইকবাল হাবিব : এই মুহূর্তে সড়কের সঠিক ব্যবহার। আমরা পথচারীবান্ধব ফুটপাত দিয়ে, পুরো রাজধানীকে ছেয়ে দিতে পারতাম। তাতে কমপক্ষে ১-১২ ফুট প্রশস্ত ফুটপাত থাকবে। গাছ এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সেখানে থাকবে। কিন্তু তা হলো কোথায়?
দেশ রূপান্তর : হচ্ছে না কেন?
ইকবাল হাবিব : কারণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা প্রজ্ঞা নেই। আবার এও হতে পারে, যারা এটি কার্যকর করবে, তাদের বাধ্য করা যাচ্ছে না। তারা এটি অনুভব বা বিশ্বাসেও নিচ্ছে না। বিপজ্জনক হচ্ছে, অভিঘাতে ভরা এই নগরী।
দেশ রূপান্তর : সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য তো কর্তৃপক্ষ আছে। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই?
ইকবাল হাবিব : কারও কোনো জবাবদিহিতা নেই। কারও বিচার হয়নি। যে কারণে, অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড একের পর এক ঘটছে। একটি ঘটনারও সুরাহা হয়নি।
দেশ রূপান্তর : ‘অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড’ বলতে কোন বিষয়টি বোঝাতে চাইছেন?
ইকবাল হাবিব : অবশ্যই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। এটি হত্যাকান্ড। মগবাজারের ঘটনার পর, সায়েন্স ল্যাবের ঘটনা ঘটতে পারে না। আবার সায়েন্সল্যাবের ঘটনার পর ফুলবাড়িয়ার সিদ্দিকবাজারের ঘটনা ঘটতে পারে না। প্রত্যেকটি ঘটনা একই ধরনের, একই ছাঁচের। এরপরও আমরা সব ভবনকে বসবাসের উপযোগী কিনা সেই সনদ দিতে পারিনি! কোনো কর্মসূচি নিতে পারিনি।
দেশ রূপান্তর : বঙ্গবাজারের অগ্নিকান্ড নিয়ে কী বলবেন?
ইকবাল হাবিব : অবহেলার ভয়াবহতম উদাহরণ হচ্ছে, বঙ্গবাজারের অগ্নিকা-। এতে প্রমাণিত হয়েছে, দ্রুত হারিয়ে যাওয়া জলাধারগুলো সংরক্ষণে আমরা কতটা নিষ্ঠুরতায় অবহেলা করেছি।
দেশ রূপান্তর : আমাদের রাজনীতিতে কী তাহলে
সাংস্কৃতিক শূন্যতা বিরাজ করছে?
ইকবাল হাবিব : সবকিছুই একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। মূলত, আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়েছে। বিষয়টা যদি আরেকটু গভীরভাবে দেখি, তাহলে কী দেখা যায়? উন্মুক্ত খেলার মাঠ না থাকাতে, মোবাইল ফোন, ড্রাগসে ছেয়ে গেছে বাড়ি বাড়ি। ঘরে ঘরে, শিশু থেকে আবালবৃদ্ধবনিতার হাতে মোবাইল। তারা সেখানে কী করছে? বিষয়টা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। আমাদের সমাজবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন।
দেশ রূপান্তর : শিশুদের প্রকৃতিনির্ভর মানসিকতা তৈরিতে কী করা প্রয়োজন?
ইকবাল হাবিব : আসলে দরকার বিনিয়োগ। শিক্ষা কার্যক্রমে, উন্মুক্ত স্থান নির্মাণ এবং জনগণের সচেতনতার জন্য বিনিয়োগ দরকার। জনগণ কখনো একা একা সচেতন হয় না। সামাজিক আন্দোলন যারা করেন, তাদের কাজে লাগানো দরকার। মিডিয়ায় যারা কাজ করছেন, তাদের কাজে লাগানো দরকার। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কাজে লাগানো দরকার। শুধু মুখের কথা দিয়ে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কর্মসূচির যে তা-ব চলছে তা করে সমাধান হবে না। কোনো পরিবর্তনই হবে না।
দেশ রূপান্তর : আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কী হবে!
ইকবাল হাবিব : আমি জানি না। আগামী প্রজন্ম, কে গড়ে তুলবে সেটি স্পষ্ট না হলেও, ‘সময়’ ঠিকই তৈরি করে নেবে। বর্তমানেও অনেক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। আরও হবে। আমাদের পক্ষ থেকেই নেতৃত্ব তৈরি হতে হবে, তা না। পেছন দিয়েও, হঠাৎ করেই নেতৃত্ব তৈরি হতে পারে। আমি মনে করি আজ হোক, কাল হোক তারুণ্যের জয় হবেই। যতই আমি নতুন প্রজন্মকে বিকলাঙ্গ হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করি না কেন?
দেশ রূপান্তর : ‘বিকলাঙ্গ প্রজন্ম’ বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?
ইকবাল হাবিব : এই প্রজন্মকে দূষণের মধ্য দিয়ে, শ্বাসযন্ত্র নষ্ট করা হচ্ছে। খাবারের মধ্যে বিষ দেওয়া হচ্ছে। তাদের কিডনি ধ্বংস করছি। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের আগেই, বায়ুদূষণের মাধ্যমে স্নায়বিক দুর্বলতা তৈরি করছি। এই যে বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা করছি, তারপরও এর মধ্য থেকেই বোধসম্পন্ন নেতৃত্ব উঠে আসবে, আসবেই। আবারও বলছি সকলের জন্য, সর্বজনীননির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব নেতৃত্ব উঠে আসবে। সত্যিকার অর্থে প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়ন বন্ধ করে, টেকসই উন্নয়ন দরকার।
দেশ রূপান্তর : এর নেপথ্যে কোনো চক্র, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অথবা সচেতনভাবে কাজ করছে?
ইকবাল হাবিব : না, ঠিক তা না।
দেশ রূপান্তর : তাহলে কী, আত্মকেন্দ্রিকতা বা অতিলোভের কারণে এসব হচ্ছে?
ইকবাল হাবিব : একদম। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা গোষ্ঠীস্বার্থ যখন বেড়ে যায়, তখনই এ রকম হয়। এটাকে রোধ করতে হবে। ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লুট করার পরও আমি তাকে কিছু বলছি না! কোনো দায়বদ্ধতার মধ্যে আনছি না। এই অবস্থা চলতে দিলেই তারা নেতৃত্বে বা কতৃত্বে চলে যায়। যে কারণে, আরাভদের জন্ম হয়। এই অবক্ষয়কে চিহ্নিত করা জরুরি। এসব মেনে নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তবে এটা মনে রাখতে হবে, ভেতরে ভেতরে অনেক বিকাশমান ধারা তৈরি হচ্ছে। সেই কারণে আমি এখনো আশাবাদী। সম্ভাবনা তো হঠাৎ করে তৈরি হয় না। তবে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে। রাজনীতিও নতুন ধারায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে অন্তর্ভুক্তিতা প্রাধান্য পাচ্ছে। সময় কিন্তু বদলাচ্ছে। অন্তর্ভুক্তি কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, অনেক মানুষকে অনেক দিন বোকা বানানো যায় না।
দেশ রূপান্তর : আগের প্রসঙ্গে আসি। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি কোথায়?
ইকবাল হাবিব : অভিঘাতের। নানা ধরনের অভিঘাত। অনেক বেশি মানুষের, বাস্তুসংস্থান না থাকার, পরিবেশগত এবং প্রাকৃতিক অভিঘাত। প্রতিরোধভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন। এর জন্য তাগিদ থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে, আমরা প্রচ- অভিঘাতের মধ্যে আছি। আমাদের বসবাস নিশ্চিত করা দরকার। মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : তাহলে ঢাকা শহর আর তিলোত্তমা নেই!
ইকবাল হাবিব : প্রশ্নই আসে না। মেগা প্রজেক্ট দিয়ে কখনো তিলোত্তমা হয় না। যতদিন মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন না হবে, ততদিন কিছুই হবে না। সেই মানুষ নিরাপদ আছে কিনা, তার বাসস্থান আছে কিনা এ বিষয়ে আগে নিশ্চিত হতে হবে। লাগাতার এতগুলো দুর্ঘটনার পর, কী করে আমি এই কথা বলব? বারবার বলব, ঢাকা এখন বসবাসের অনুপযোগী।
দেশ রূপান্তর : বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা, তার শেষ কোথায়?
ইকবাল হাবিব : ভূমিকে পণ্য বানানোর যে মহাপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে রাজউকের মাধ্যমে, বিভিন্ন হাউজিং অথরিটির মাধ্যমে তা বন্ধ করতে হবে। কী করে ন্যাশনাল হাউজিং
অথরিটি, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের প্রথম পাইলট প্রজেক্টে মাত্র ১০ শতাংশ তার ভাগে আর বাকি ৯০ শতাংশ ডেভেলপারের ভাগে দিয়ে, প্রকল্পের পর প্রকল্প শুরু করেছে! এত বড় অনাচার কী করে মানুষ সহ্য করবে? স্বাভাবিকভাবেই ৫০%-৫০% থাকে। ৫০% সরকারের মানে, দরিদ্র-নিপীড়িত মানুষ পাবে। বাকি ৫০% যে ব্যবসা করছে, সে করবে। আপনি তাকে ৯০% দিয়ে দিলেন! এটি কোনোভাবেই হতে পারে না।
দেশ রূপান্তর : এই দুর্নীতির সঙ্গে কোন কর্তৃপক্ষ জড়িত?
ইকবাল হাবিব : সবাই জড়িত, সব পক্ষের। আপনি পূর্বাচল কার জন্য করলেন? কেন পূর্বাচলে প্লট দিচ্ছেন? ২০টি ফ্ল্যাট হয় একটা প্লটে। ফ্ল্যাট দিলেই তো শত শত পরিবারের আবাসন সমস্যা কাটানো যেত। অথচ তা হলো না। জমিকে পণ্য বানানোর অধিকার কে দিল? এটি তো রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
দেশ রূপান্তর : এর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই?
ইকবাল হাবিব : আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এখনই সময়।
দেশ রূপান্তর : কিশোরদের নিয়ে আপনার সুন্দর একটি পরামর্শ আছে। বিস্তারিত বলবেন?
ইকবাল হাবিব : উন্মুক্ত খেলার মাঠ দরকার। তাদের
সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য রাষ্ট্রকে বিনিয়োগ করতে হবে। বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে তাদের যে বিকাশ হচ্ছে তা প্রবঞ্চিত বিকাশ, বিকলাঙ্গ বিকাশ। আমরা এই বিকাশ চাই না। এই শিশু-কিশোরদের প্রকৃতি নির্ভরতায় বড় করতে হবে। এই দায়িত্ব কারও একার না।
দেশ রূপান্তর : ঢাকা শহরে, এত খোলা জায়গা কি আছে?
ইকবাল হাবিব : অবশ্যই আছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে, একজন স্থপতি হিসেবে এই কথা বলছি। হাতিরঝিল করার আগে, কেউ কী ভেবেছিল শহরের মধ্যেই এত খোলামেলা সুন্দর জায়গা রয়েছে? কিন্তু আমরা তো বের করেছি। ধানমন্ডি লেকের আগে, কেউ ভেবেছিল? আসলে স্বপ্ন দেখতে হয়। ইচ্ছা থাকতে হয়।
দেশ রূপান্তর : শেষে কিছু বলবেন?
ইকবাল হাবিব : আমি মনে করি, সবার আগে সচেতন হতে হবে। নিজের অধিকার প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। পরিবার, সমাজ এবং পারিপাশির্^কতার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করে নেতৃত্বে আসতে হবে। প্রতিবাদের ভাষায় দায়িত্বশীল হতে হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, এটা হবেই। আমরা কোনো কোনো সেক্টরে প্রমাণ করেছি না, আমরা পারি।