ইতিহাসের সত্যপাঠ নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা

সভ্যতার ক্রমবিকাশের নেপথ্যে একমাত্র শিক্ষাই মৌলিক ভূমিকা পালন করে চলেছে। ভূ-আঞ্চলিক পরিমন্ডল হতে উদ্ভূত প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক আবহে পরিপুষ্ট সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন তদসংশ্লিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই সাধারণত আবর্তিত হয়। এই বাস্তবতায় কোনো জাতিগোষ্ঠীকে দুর্বল অথবা বিপন্ন করার কুরাজনৈতিক মন্ত্র চরিতার্থের লক্ষ্যে এই শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই প্রথমে আঘাত হানা হয়। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষাবিষয়ক আগ্রাসন তার জ্বাজল্য উদাহরণ। বহু বিচিত্র তিক্ত ঘটনার মধ্যে এটি উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করার অংশ হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা থাকার পরেও সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়; অথচ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পূর্বে ব্রিটিশ শাসনাধীনে যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক যথেষ্ট বেশি ছিল।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে মূলত ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যত খুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনকে উপেক্ষা করা হয়। পাকিস্তানিদের মতো ধর্মকে কূটকৌশলে ফোকাস করে সমাজতান্ত্রিক সুষমনীতির পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর নামে মূলত পুঁজিবাদী বুর্জোয়ানীতি বিশিষ্ট প্রহসনী জাতীয়তাবাদী চিন্তা শিক্ষায় প্রবিষ্ট করানো হয়। এ লক্ষ্যে বাঙালি জাতিসত্তার চিরন্তন স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে নিষিদ্ধ করে সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানি স্লোগানের আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ সংযোজন করাসহ আরও বহু বিচিত্র অপকৌশলে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত মৌলিক ইতিহাস-ঐতিহ্যগুলোকে বিকৃত ও নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করা হয়, যা এরশাদ ও খালেদা জিয়ার শাসনামলেও অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময় খালেদা জিয়া ১৯৯১-১৯৯৫  সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে ওই একই নীতির ওপর রাষ্ট্রপরিচালনা করেন এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত স্বঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াতের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করার মাধ্যমে তা প্রকাশ্যে ভয়ংকর জঙ্গিবাদে রূপ নেয়!

আমরা দেখেছি যে, মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী বিদেশি বন্ধুদের জন্য নির্মিত সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণে ভেজাল মিশিয়ে দেশে-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের সৃষ্টিশীল চেতনাকে ম্লান করার পাশাপাশি সরকারকেও চরম বিতর্কিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নে যথেষ্ট ভুল সৃষ্টির মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও এই সরকারকে চরম বিতর্কিত করা হয়েছিল।

সম্প্রতি শিক্ষা ক্ষেত্রে একাধিক সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা চলছে। ঢাকা বোর্ডের এইচএসসি ২০২২ সালের বাংলা ১ম প্রশ্নপত্রের সৃজনশীল অংশে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ঘটনা সন্নিবেশ করা হয়েছিল; সেটা দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। এ ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্ন প্রণয়নে জড়িত শিক্ষকদের প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হয়েছিল। বলা বাহুল্য, যেকোনো রকম সাম্প্রদায়িক চর্চা মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক চেতনায় পরম আঘাত হানে বৈকি; শিক্ষাঙ্গনকে ঘিরে এ চর্চা খুবই নেতিবাচক-স্পর্শকাতর হয়।

সম্প্রতি দেখতে পেলাম, ২০২৩ সালের নতুন জাতীয় কারিকুলামের আওতায় প্রণীত ষষ্ঠ শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ের ‘ভাষা আন্দোলন’ শিরোনামের পাঠে কোথাও বঙ্গবন্ধুর অবদানকে তুলে ধরা হয়নি। অথচ ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন গণপরিষদে যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন তখন বঙ্গবন্ধু তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন এবং এই ইস্যুকে ঘিরে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মুসলিম লীগের এই স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের প্রস্তাব দেন।

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আহুত ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে অনুষ্ঠিত ধর্মঘট হতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তাকে ১৫ মার্চ ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভূখা মিছিল হতে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারে তাকে প্রায় দুবছর পাঁচ মাস আটক রাখা হয়; পরে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে ফরিদপুর জেল থকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এ কারণেই ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু সশরীরে রাজপথে উপস্থিত থাকতে পারেননি। কিন্তু জেলে বসেই তিনি অকুতোভয় চিত্তে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এদিকে সপ্তম শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ের ‘রাজনৈতিক সংযোগ’ শিরোনামের পাঠে ২৫ মার্চের মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু নিজবাড়িতে গ্রেপ্তারবরণ করেন মর্মে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেটা ছিল ইতিহাসঘাতক বিএনপি-জামায়াতের বেশ আগে থেকেই প্রচলিত বিকৃত রাজনীতির একটি নগ্ন প্রপাগাণ্ডা। শিশু-কিশোর শ্রেণির পাঠ্যবইগুলোতে ইতিহাস বিকৃতির এ রকম পচনশীল তথ্যসংযোজন দেশব্যাপী তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে!

পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী বর্ণচোরা গোষ্ঠীদের গুজব ও ষড়যন্ত্রের পালে দারুণ বাতাস জুগিয়েছে! মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এই ঐতিহাসিক আওয়ামী লীগ ও তার সরকার যখন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বিগত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বই তুলে দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় ও অধিক প্রশংসনীয় কৃতিত্ব অর্জন করে চলেছে, ঠিক তখনই নিকটাসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এহেন অপতৎপরতা গভীর ষড়যন্ত্রেরই ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণির মতো এত ছোট শ্রেণির বইতে ‘বিবর্তনবাদ’-এর মতো এমন হাই-কনসেপ্ট বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণ সমীচীন হয়নি মর্মে সচেতন মহলে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ও আওয়ামী লীগকে সাধারণ জনগণের মাঝে বিতর্কিত করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রজন্মের মাঝে বদ্ধমূল করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ ও ‘শেখ রাসেল দেয়ালিকা’ স্থাপনের নির্দেশনা থাকলেও খোঁজ নিলে দেখা যাবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এগুলো নেই। কেননা, এ দেশের একশ্রেণির শিক্ষকরাও মহান স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নয়, যাদের সংখ্যাও যথেষ্ট। এসব কথিত শিক্ষকদের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয় দিবসগুলো সরকার নির্দেশিত কর্মসূচি অনুযায়ী যথাযথ পালিত হয় না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত আঞ্চলিক দপ্তরগুলো যেমন জেলা-উপজেলা শিক্ষা দপ্তরগুলো সাধারণত এগুলো মাঠ পর্যায়ে যথাযথ মনিটরিং করে না। ফলে ইতিহাসের সত্যপাঠ উদীয়মান প্রজন্মের মাঝে অজানাই থেকে যাচ্ছে, যা বাঙালি জাতীয়তাবোধে শূন্যতা সৃষ্টি করবে; এটা কখনোই দেশ ও জাতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না।

লেখক : কলামিস্ট