রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিঃসন্দেহে পৃথিবীকে নতুন এক মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাশিয়া ও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট, মাঝে রক্তক্ষয়ী ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ধরেই বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে কোনো না কোনো পক্ষ নিতে হচ্ছে বা পক্ষে-বিপক্ষে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। পৃথিবী এখন অনেক বেশি বিভক্ত। এই বিভক্তি হিংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতার, সহযোগিতার নয়। একদিকে ন্যাটোর রাশিয়াকে কোণঠাসা করার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রতিউত্তরে রাশিয়া তার পরমাণু অস্ত্র বেলারুশে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ন্যাটো সীমান্তবর্তী অঞ্চল। এই বৈরিতার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে রাশিয়ার সম্প্রতি ঘোষিত নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে চীন ও ভারতকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সূত্রমতে, এ পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এরই মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে ইউক্রেনের বাখমুতে, যেখানে মৃত্যু সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অন্যদিকে যুদ্ধে পশ্চিমাদের ব্যয় চোখ কপালে তোলার মতো। বিবিসির তথ্যমতে, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ইউক্রেনকে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিভিন্ন ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সামরিক সাহায্য ও মানবিক সাহায্য। এর বাইরে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ও বিভিন্ন ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে যাচ্ছে। একদিকে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনে একের পর এক শহর ধ্বংস হচ্ছে এবং অঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আরও আরও অস্ত্র সহায়তা চাচ্ছেন। অবশ্যই এর উদ্দেশ্য হচ্ছে রাশিয়াকে ঠেকিয়ে রাখা এবং প্রতিউত্তর দেওয়া।
ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধে দুই দেশের সৈন্যবাহিনীই যুদ্ধ করছে না। সেখানে দুই দেশের পক্ষেই যুদ্ধ করতে বিভিন্ন দেশে থেকে আসা ভাড়াটে যোদ্ধারাও যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে মিডিয়া এদের কাউকে বলছে স্বেচ্ছাসেবক আবার কাউকে বলছে ভাড়াটে। নির্ভর করছে কার পক্ষে কে? অন্যদিকে যুদ্ধে রাশিয়াকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য ন্যাটোর পক্ষ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, যুদ্ধে শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য যেমন উদ্যোগ নেই। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইউক্রেনে বিশেষ করে দনবাস অঞ্চলে, শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করেনি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক খবরে জানা যায়, বিশ^ খাদ্য সংস্থা বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা কমিয়ে মাথাপিছু ১২ থেকে ১০ ডলার করেছে। একই অবস্থা ইরাক ও সিরিয়ায় শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও। যুদ্ধে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে মানবিক সংকটে ধনী দেশগুলোর পিছুটান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে আরও বাড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধ ব্যয়ের একটি অংশও যদি বিশ্বের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ব্যয় করা হতো, তা বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জন্য সত্যিকারের সহায় হতে পারত। ২০২২ সালের অক্সফার্ম আমেরিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব থেকে মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষুধা দূর করার জন্য ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বিশ্বে মারাত্মক পুষ্টিহীন শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রতিবছর ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু সেদিকে মনোযোগ যে সামান্যই তা বলাই বাহুল্য। এখন সব নজর যুদ্ধের দিকে, কার প্রভাব কতটুকু টিকে থাকল, কার কথায় বিশ্ব চলবে, কে কাকে কোণঠাসা করতে পারল সেটাই যেন বিবেচ্য। এসবের মধ্যে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের আলোচনা যে কতটা ফিকে তা স্বার্থের সংঘাতে স্পষ্ট ধরা পরে বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বেআইনিভাবে ইউক্রেনের শিশুদের রাশিয়াতে সরিয়ে নিয়েছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টাকে এক কথায় প্রায় অসম্ভব বিষয় বলেছেন। সম্প্রতি রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, সন্ত্রাসের হাতে বিশ্বের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বভাবতই জেলেনস্কি যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
এবার ফিরে আসা যাক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে যেখানে বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের প্রাসঙ্গিকতার উল্লেখ। ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, টোকিও ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময়। বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার সন্তান। ছিলেন আইনের শিক্ষক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, জাপানের সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হয়, সেই ট্রাইব্যুনালের এগারোজন বিচারকের একজন ছিলেন রাধা বিনোদ পাল। এই ট্রাইব্যুনালে রাধা বিনোদ পালের রায় ও অভিমত সেই সময়ে বিজয়ী পশ্চিমা গোষ্ঠীকে অবাক করেছিল। তিনি অভিমত দিয়েছিলেন, যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে তা নিরপেক্ষ নয়। যে কারণে জাপানি কর্মকর্তাদের বিচার করার নৈতিক অধিকার এর নেই। যে অভিযোগ জাপানি কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অভিযোগকারী পক্ষরা সেই অপরাধ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। রাধা বিনোদ পালের সেই রায়ের তাৎপর্য হয়তো এত বেশি ছিল যে, জাপান আজও তা স্বীকার করে। তার মতামত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, সবকিছুই ক্ষমতাবান ও বিজয়ীদের দখলে এমনকি বিচার ব্যবস্থাও।
জাপান এই অসামান্য বাঙালি বন্ধুকে ভোলেনি। জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাকে ভূষিত করেছিলেন জাপানের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘কোক্কা কুনশোও’ বা ‘ঋরৎংঃ ঙৎফবৎ ড়ভ ঃযব ঝবপৎবঃ ঞৎবধংঁৎব’ পদকে। জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভূষিত করেছে সম্মানসূচক খখ.উ উপাধিতে। টোকিও এবং কিয়োটো শহরের মেট্রোপলিস গভর্নররা তাকে ‘ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব টোকিও ও কিয়োটো’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। তার সম্মানে ইয়াসুকুনি মাঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। রাজধানী টোকিওতে সুপ্রশস্ত রাজপথের নাম রাখা হয়েছে তার নামানুসারে। প্রয়াত হিরোহিতো জাপানের সম্রাট থাকাকালে একবার বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।’
মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখন পর্যন্ত যে ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা মূলত পশ্চিমামুখী ও এককেন্দ্রিক। এই ব্যবস্থার সঙ্গে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের গতি-প্রকৃতিতে, বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের আলোচনা হয়তো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক- সেটাই বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজনীয়।
লেখক উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com