নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা আনতেই হবে

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনেই ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে এবং কোনো আসনেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। নিঃসন্দেহে এটি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পেছনে নির্বাচন কমিশন মূলত তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন।

প্রথম কারণটি হলো সময় স্বল্পতা। দ্বিতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় না পাওয়া এবং শেষ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া।

এর পূর্বে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পদ্ধতি এবং ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালনার বিষয়ে ধারাবাহিক সংলাপ করেছেন। সংলাপে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ আটটি রাজনৈতিক দল ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের পক্ষে মত দেয়।

বিএনপি এই সংলাপে অংশগ্রহণ না করলেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনকালীন সরকার ও ইভিএম বিষয়ে আপত্তির কথা বলেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ ইভিএমের ব্যাপারে আপত্তির কথা জানায়। এমন অবস্থায় নির্বাচন কমিশন প্রথমে একশ পঞ্চাশ সংসদীয় আসনে ইভিএম এবং বাকি একশ পঞ্চাশ আসনে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের কথা জানায় ও সেই মোতাবেক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে।

কিন্তু সম্ভবত দেশের বর্তমান বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থায় ইভিএম প্রস্তুত ও ক্রয় করার জন্য নির্বাচন কমিশনের চাহিত বারোশত ষাট কোটি টাকার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাড়া পাওয়া যায়নি বলে শেষে কমিশন স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সিদ্ধান্তটি কি নির্বাচন কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা ফেরাতে শাপে বর হলো? উত্তর পেতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন সচিবের সংবাদ সম্মেলনে শুধু অর্থসংক্রান্ত জটিলতা ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা। এটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে নিশ্চয়ই।

দেশে নির্বাচন ও ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে হুদা কমিশনের সময় থেকেই। এমতাবস্থায় ব্যালটে ভোট গ্রহণের ঘোষণা কিছুটা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য নিরসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তবে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের করণীয় আছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেহেতু ব্যালট পেপারে হবে, তাই আসন্ন পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হতে পারে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের একটি লিটমাস টেস্ট। গাজীপুর, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ট্রায়াল হিসেবে কমিশন চাইলে ব্যালটে ভোট গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কমিশন আবার ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাতীয় নির্বাচন যেহেতু ব্যালটের মাধ্যমে হচ্ছে সেহেতু বিতর্ক নিরসনে এবং নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থায় আসতে কমিশন সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা এবং প্রতিজ্ঞার বিষয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা প্রদান করতে পারে।

কিন্তু পাঁচটি সিটি করপোরেশনে ইভিএম ব্যবহারের ঘোষণা এই আস্থার জায়গায় সংকট তৈরি করতে পারে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। ইভিএম নিয়ে যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে মতবিরোধ রয়েছে এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ব্যালটের মাধ্যমে হবে সেহেতু কমিশন সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে নতুন করে ইভিএম ব্যবহার করে বিতর্ক তৈরি না করাই সমীচীন।

এখনো পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তাদের সদিচ্ছা এবং সক্ষমতাকে সমর্থন করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়।

এদিকে ব্যালটে নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও আপত্তির কথা জানা যায়নি। যদিও মূলত কেবল আর্থিক বিবেচনায় ব্যালটে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়তো মেনে নিয়েছে দলটি, কিন্তু তবুও এটি ক্ষমতাসীন দলের দিক থেকে বড় রকমের সমঝোতা বলা যায়। আবার বিরোধী দলগুলোর প্রধান দাবিগুলোর একটি ব্যালটে ভোট গ্রহণ; সেটিও এক অর্থে পূরণ হয়েছে। এটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি।

এই অগ্রগতিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে নির্বাচন কমিশনের গুরুদায়িত্ব রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের কোনো কাজ যেন বিতর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি না করে সেদিকে নজর দিতে হবে।

আবার শুধু নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা অসম্ভব, যদি না রাজনৈতিক দলগুলো একটি মতৈক্যে না পৌঁছায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্য সব কটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব রয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা।

ইভিএমের মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে সংকট রয়েছে, সেটিও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার মাধ্যমে সমাধান হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে আমরা আশা করতেই পারি।

তবে এ ক্ষেত্রে সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। অন্য কোনো দেশের প্রেসক্রিপশন কিংবা ফর্মুলা আমাদের সংকট সমাধান করতে পারবে না। বিদেশি বন্ধুদেশের রাষ্ট্রদূতরা নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে যেভাবে হস্তক্ষেপ করে সেটি যেকোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের জন্য বিব্রতকর।

রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। আমাদের হয়তো অনেক সংকট রয়েছে, তবে আমরা এখনো বিশ্বাস রাখি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতা, সততা এবং দেশের মানুষের প্রতি প্রতিজ্ঞা সব সংকট দূর করে বাংলাদেশকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে ও গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় গণমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী কর্মতৎপরতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাই পারে নির্বাচন নিয়ে ঘনীভূত সব সংকট নিরসন করে একটি সুন্দর সমাধান দিতে।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন হোক জনগণের আস্থার প্রতীক।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়