গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা গ্রেপ্তার নিয়ে কিছুদিন ধরে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও টিভি টক শো’তে ঝড় বইছে। দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের ভুলক্রটি যেমন সংবাদপত্রে তুলে ধরা দরকার, তেমনি সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করে সংবাদ, সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ হওয়া দরকার। কিন্তু অনেক সময় কোনো কোনো সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম সরকারের ভালো কাজের প্রশংসার পরিবর্তে, পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ, সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতকে কটাক্ষ করে সংবাদ প্রকাশ করে। একইভাবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনকালে নেতাকর্মীদের হাতে লাঠি ও মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে। সাধারণ মানুষের ওপর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর, পাশর্^বর্তী দোকান, শপিংমলে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগে লিপ্ত হওয়ার খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখি।
সম্প্রতি একটি পত্রিকায় স্বাধীনতা দিবসের দিন মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতাকে কটাক্ষ করে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাও আবার মিথ্যা বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংবাদে এক শিশুর হাতে ১০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে, তাকে দিয়ে শেখানো কথা বলানোর চেষ্টা, অন্যলোকের কণ্ঠে বক্তব্য প্রকাশ করে সংবাদপত্র জগতে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। একইসঙ্গে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভূমিকাকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদকের দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি, দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন এরকম একটি নির্জলা মিথ্যা, কল্পকাহিনীকে সংবাদ আকারে প্রকাশের পর একজন সংবাদকর্মী হিসেবে নিজেকেও অপরাধী মনে করছি। ঐ দৈনিকের দায়িত্বহীন মিথ্যাচারে দুষ্ট অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে পেশাজীবী, সাংবাদিক সংগঠনসমূহ, নাগরিক সমাজ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন প্রতিবাদে সোচ্চার। তারা এ ধরনের হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধের পাশাপাশি দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন। কোনো অপপ্রচার, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ নিকট অতীতে এটাই প্রথম। অবশ্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বন্ধে ও সাংবাদিক সংগঠনসমূহ সরকারের কাছে তাদের অবস্থানও তুলে ধরে।
প্রশ্ন হচ্ছে- কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র সরকারের সমালোচনা, সরকারের কর্মকা-, সরকারি দলের এমপি, মন্ত্রীদের কর্মকা-, বক্তব্য-বিবৃতি নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে প্রায়শই। এ জন্য কখনো সরকারি দলের পক্ষ থেকে তেমন উচ্চবাচ্য হতে দেখিনি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে পত্রিকায় প্রতিবাদ পাঠিয়ে প্রকাশিত সংবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে। বিগত সময়ে এ ধরনের সংবাদ সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়েছে। আবার কখনো কখনো ঐসব সংবাদ সম্পাদকীয় নিবন্ধের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের প্রতিবাদ ছাপা হয়েছে, আবার কখনো কখনো মামলা হয়েছে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ক্ষতিগ্রস্ত এমপি, মন্ত্রী বা সরকারি সংস্থা থেকে মামলা করার নজিরও আছে।
সম্প্রতি প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশের নামে, আমাদের মহান স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে শেখ হাসিনা সরকারের ইতিবাচক উন্নয়ন তৎপরতা তথা সাফল্যকে হেয় করে দেখার অপপ্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। অবশ্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ, ব্যবহার ও এই আইনে মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিষয়টি তদন্ত, পর্যালোচনা করার দাবি রয়েছে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। সরকারের দায়িত্বশীল মহল নিশ্চয় সাংবাদিক সংগঠনসমূহের এই দাবি পর্যালোচনা করে বিদ্যমান আইনের সংশোধন, সংযোজন করবেন।
২৭ মার্চ (২০২৩) প্রকাশিত একাত্তর টিভির ‘স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আলোর সেই ছবি পুরোটাই ভুয়া’ শিরোনামে সংবাদে জানানো হয়েছে, দৈনিক প্রথম আলোর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ভাইরাল হওয়া খবরের ছবি ছিল- ফুল হাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ফটকে এক শিশু। নাম জাকির হোসেন। শিশুটির উদ্ধৃতি ছিল এমন- ‘পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম? বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।’ জাকির নামটি ভুল ছিল। আসলে সাত বছরের সবুজ নামে ওই শিশুর হাতে ১০ টাকা দিয়ে দৈনিক প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক ছবি তুলেছেন বলে দাবি ওই শিশু ও তার পরিবারের। সাভারের কুরগাঁও পাড়ায় সবুজের বাড়ি। তার মা মুন্নী বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে মেজ সবুজের নাম কীভাবে জাকির হোসেন হলো, আর প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানকে কেন দিনমজুর বলা হলো তাতে তিনি অবাক হয়েছেন। রাজমিস্ত্রি বাবা আর মা’র আয়ে সংসার চলে। অন্যদিকে, ছোট সবুজ কেমন করে জানল বাজারের দ্রব্যমূল্যের খবরÑ সেটাও বিস্ময়কর। স্বাধীনতা দিবসে এমন খবরকে ১৯৭৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে জাল পরানো বাসন্তীর ছবির মতোই চক্রান্ত বলা হচ্ছে বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিকোণ থেকে।
বাস্তবতা হলো, প্রকৃতপক্ষে অসৎ উদ্দেশ্যে উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে একজন শিশুকে সংবাদের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে ‘বাসন্তী’ নামের একজনকে জাল পরিয়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য হচ্ছে, যিনি সংক্ষুব্ধ হন, তিনি মামলা করেন। প্রথম আলোর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যে মামলাটি হয়েছে, সেটি সঠিক হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দেশসমূহের কাছে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোও যখন নাস্তানাবুদ অবস্থার সম্মুখীন, পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ যখন দেউলিয়া অবস্থায় পতিত, এমন পরিস্থিতিতেও শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।
দেশপ্রেম, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকার প্রশ্নে কমিটমেন্ট থাকা জরুরি। এই বিষয়গুলোকে অস্বীকার করলে আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের জাতীয় সত্তাকে অস্বীকার করা হয়। স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রথম আলোর এমন একটা কাল্পনিক ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। প্রত্যাশা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবাদিক সংবাদপত্রসমূহের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, বস্তুনিষ্ঠতা- নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের মহান স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতকার সম্মান সমুন্নত রাখাও গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
মনে রাখা দরকার- ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোনো দলের পক্ষে উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থেকে স্বাধীন, সঠিক সাংবাদিকতাকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে একই সঙ্গে সাংবাদিক, সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনসমূহ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি সরকার, সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকেও সহায়ক ভূমিকা নিতে হবে। তাহলেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: সাংবাদিক। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম