তাকে ‘টাইগার জাহাঙ্গীর’ নামেই চেনে সবাই। নব্বইয়ের শুরুর দিকে দেশ সেরা ফ্রন্ট ফুট ড্রাইভ শটগুলো তার ব্যাটেই ছিল। শুধু দারুণ সব কাভার ড্রাইভ-ই নয়, সাহসী ব্যাটিংয়ের জন্যই তার ওই ছদ্মনাম হয়ে যায়। তাকে আরও চেনা লাগবে আরেকটি ঘটনায়। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে এই জাহাঙ্গীরের বদলেই শেষ মুহূর্তে সুযোগ পেয়ে যান মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। তাই দুইবার আইসিসি ট্রফি খেলা ওপেনার জাহাঙ্গীর আর ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। ১৯৯৯ এরপর আরও সেই সুযোগ ছিল না। তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই সাবেক এই ক্রিকেটারের। বরং ক্রিকেট তাকে যা দিয়েছে তা নিয়েই খুশি। তবে এখন ভিন্ন আশা আছে তার। তার ছেলে জিসান আলম এখন যুব দলের সদস্য। টি-টোয়েন্টি স্টাইলের দারুণ ব্যাটিং করেন। ঢাকা লিগে খেলছেন শাইনপুকুরের হয়ে। ক্রিকেটার বাবা জাহাঙ্গীরের আশা তার ছেলেও জাতীয় ক্রিকেটার হয়ে উঠুক, বিশ্বকাপ খেলুক।
২০০৬ সালের পর খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানা জাহাঙ্গীর এখন পুরোদস্তুর কোচ। তিনি জাতীয় লিগে ঢাকা বিভাগের হেড কোচ। নিজ শহর নারায়ণগঞ্জে আছে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিও। গতকাল ঢাকা মোহামেডান ও ব্রাদার্সের খেলা দেখতে এসেছিলেন ফতুল্লা স্টেডিয়ামে। সেখানেই জানালেন বর্তমান প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে তাদের সময়ের লিগের পার্থক্যের কথা, ‘পার্থক্য বলতে এখন লিগ তো অনেক উন্নত। ভালো পিচে খেলা হয়, রান হয়। সাদা বলে খেলা হচ্ছে যেটা আমাদের সময়ে ছিল না, আমরা লাল বলে খেলতাম। এখন আর্থিক দিকটা অনেক বেশি। আসলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আমাদের সময়ও ভালো ছিল এখনো ভালো। তখন দলে তিনটা বিদেশি ক্রিকেটার নেওয়া হতো। তখন তিন বিদেশির সঙ্গে লড়াই করে আমাদের খেলতে হতো। তবে এখন আমরা টেস্ট খেলছি, নিজস্ব ক্রিকেটাররা ভালো এজন্য লিগে বিদেশি ক্রিকেটার নেওয়াও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কিন্তু বড় পার্থক্য যে এখন আমাদের লিগে নিজেদের ক্রিকেটারদের নিয়েই খেলা হয়।’
১৯৮৬ থেকে পরের পায় এক যুগ বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিয়মিত মুখ তিনি। বিশেষ করে নব্বইয়ের দিকে। ঢাকা লিগে আবাহনী, মোহামেডান, বিমান, ব্রাদার্সে খেলেছেন। ১৯৯২ মৌসুমে সর্বোচ্চ ৫৮২ রান করেছিলেন। নিজেই জানালেন ভিক্টোরিয়ার চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য তিনি। জাতীয় দলে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দুটো আইসিসি টুর্নামেন্ট ও ’৯৯ বিশ্বকাপ দলে ছিলেন। পরে তার জায়গায় নান্নুকে নেওয়া হয়। বিশ্বকাপ না খেলতে পারলেও আক্ষেপ নেই জাহাঙ্গীরের। তবে হতাশা আছে ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফিতে সেমিফাইনালে উঠতে না পারায়, ‘১৯৯৪ এর ওই আসরে আমাদের দেশের সেরা ক্রিকেটাররা যেমন নান্নু, আকরাম, বুলবুল, সেলিম শাহেদ, মনি, প্রিন্স, ফারুক ভাইরা ছিলেন। ওখানে কেনিয়ার সঙ্গে ম্যাচটা জিতলে আমরা সেমিফাইনাল খেলতাম। ওপেনিং জুটিতে আমি ও বুলবুল ওই ম্যাচে ১২৪ রান করি, মোট ২৫৫ রান করেছিলাম। ম্যাচটা আমরা ১৩ রানে হেরেছিলাম সেখানে জিতলে আমরা অনেকটা এগিয়ে থাকতাম টেস্ট খেলার দিকে। তা না হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড় আফসোস ছিল। আমার ব্যক্তিগত কোনো আক্ষেপ নেই। ক্রিকেট থেকে আমি যা পেয়েছি তাতে আমি অনেক খুশি। ৯৪ আইসিসি কোয়ালিফাই করলে আমরা আরও একটু আগে টেস্ট খেলতে পারতাম। ওই আসরেই আরব আমিরাতের সঙ্গে আমি ১১৭ অপরাজিত করেছিলাম, ওটা ওই পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান ছিল।’
তার ছেলে জিসান আলম যুবদলের হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন। যুবদলের হয়ে গত আরব আমিরাত সফরে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে এক ইনিংসে ৩২ বলে ৬২ করলেন। এছাড়াও ৪০, ৩৮, ৩৫ রানের ইনিংসগুলো সবকটিই কম বলে। এছাড়া ঢাকা লিগে ৭৫ বলে ৮৬ করেছেন সিটি ক্লাবের সঙ্গে। ছেলের ব্যাটিং তাই বাবার জন্য গৌরব। জাহাঙ্গীর বলছিলেন, ‘ও ভালো খেলতেছে, দোয়া করবেন সবাই। আমি চাই যেন আমার মতো জাতীয় দলে খেলতে পারে। জিসানের মধ্যে আমি পাওয়ার হিটিংয়ে এখন বেশি ভালো দেখছি। ওর সাহসটা আছে কিন্তু ওকে মাথা খাটিয়ে খেলতে হবে।’
এই মাথা খাটিয়ে খেলার ব্যাপারগুলোই ছেলেকে বোঝান জাহাঙ্গীর। তবে সেটা বাড়িতে নয় মাঠেই হয়ে থাকে বেশি, ‘ওকে বোঝাই একটা ক্রিকেটার ৫০ রান করে ফেলেছে খুব মেরে খেলে এখন তাকে ধরে খেলতে হবে তাহলে ইনিংসটা বেশি বড় হবে। এসব নিয়ে মাঠেই কথা হয়। ওর মধ্যে প্রতিভা আছে বলেই ওরে নিয়ে কাজ করেছি। অনূর্ধ্ব-১৪, ১৫ বয়সভিত্তিক দলে ভালো করেছে। সেটা দেখেই আমি ওকে ক্রিকেটার হিসেবে এগিয়ে নিয়েছি। কোনো চাপ দিইনি। আমার বিশ্বাস সে প্রতিভা দিয়েই এগিয়ে যাবে।’