নিরপেক্ষ ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা

বামপন্থি লুলা দা সিলভা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন সফর করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। লুলার সেই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঝালাই। সে সফরে মূলত গুরুত্ব পেয়েছিল গণতন্ত্র রক্ষা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরম মিত্র ডানপন্থি জইর বলসোনারোকে হটিয়ে ব্রাজিলের ক্ষমতায় লুলার আগমনে শুরুতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিল বাইডেন প্রশাসন। তবে এখন হয়তো তাদের সন্তুষ্টি মলিন হচ্ছে। অন্তত চীন-রাশিয়ার প্রতি লুলার মনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ব্রাজিলের নিজস্ব স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে লুলার সরকার। লুলার চীন সফরের পর এবার ব্রাজিল সফরে আসছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। অথচ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ ল্যাভরভের ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্রাজিল এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ল্যাভরভকে স্বাগত জানাচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লুলার চীন-রাশিয়ার ঝোঁক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনের শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘যুক্তরাষ্ট্রের হতাশা সত্ত্বেও লুলার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে ল্যাভরভের ব্রাজিল সফর’। প্রতিবেদন বলছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্রাজিলের হারানো অবস্থান ফিরিয়ে আনতে চাইছেন লুলা দা সিলভা। ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে ব্রাজিলের জন্য লুলার এ চেষ্টা আসলে সব অংশীদার দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার পদক্ষেপ।

ব্রাজিলভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সংস্থা মানডুল্যাবের সমন্বয়ক রুবেনস দুয়ার্তের মতে, ‘ব্রাজিলের ঐতিহ্যগতভাবে বহুপক্ষীয় পররাষ্ট্রনীতির দেশ। সেদিক দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরতে দেশটিকে সবার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়তে হচ্ছে।’

বাস্তবতা হলো ব্রাজিলের দুই প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হলো চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। আবার লাতিন আমেরিকার দেশটির কৃষি অনেকটাই রাশিয়ার সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে চীন সফরে গিয়ে লুলার ইউক্রেন যুদ্ধবিষয়ক মন্তব্য। বেইজিং সফরে থাকা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জানান, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কমিয়ে চীনের যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরিকল্পনা তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী তার দেশ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠককালে লুলা বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উদ্দেশ্য শুধু বাণিজ্যিক নয়। আমাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। আমাদের আগ্রহ রয়েছে নতুন একটি ভূরাজনীতির জন্ম দেওয়া যাতে করে জাতিসংঘের সাহায্যে আমরা বিশ্বের শাসনব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারি।’ সফরের শেষদিকে বেইজিংয়ে লুলা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধকে উৎসাহিত না করে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত শান্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও সেটাই করা উচিত।’

সেই সফর থেকে ব্রাজিলে ফেরা লুলার দেশে এখন আসছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক উইলসন সেন্টারের ব্রাজিল ইনস্টিটিউটের পরিচালক ব্রুনা সান্তোস লুলার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। তিনি গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে লুলার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অবস্থান তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে, এমনকি ইউরোপের পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছেও তা-ই হয়েছে।’

কিন্তু ব্রাজিলের জন্য ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থানটি আসলে দেশটির দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থানেরই প্রতিফলন। এমনকি ব্রাজিল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাতেও আগ্রহী। ব্রাজিলের এমন অবস্থান নতুন নয়। বিশেষ করে লুলার আগের শাসনামলে। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন লুলা সরকার হাইতিতে শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ছাড়া তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানেরও চেষ্টা করেছে।