বেকার, সার ও দারিদ্র্যের হার

বিগত কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের আর্থ-সামাজিক সূচক সম্পর্কিত কয়েকটি জরিপের ফলাফল খবরের কাগজে পড়ে কৌতুকের সেই নির্বোধ মাতবরের মতো প্রথমে হেসেছি, পরে কেঁদেছি এবং আবার হেসেছি। প্রথম হাসির কারণ, দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া; শ্রমশক্তি জরিপ ‘২২ মোতাবেক এখন দেশে বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ ৩০ হাজার মাত্র, শতাংশের হিসাবে মাত্র ৩.৬। ২০১৭ সালে এদের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ, তখন তাদের শতাংশ ছিল ৪.২। কোভিড সৃষ্ট নিশ্চল অবস্থা, ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবং বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও কর্মসংস্থানের এই দ্রুত উন্নতি মনে স্বস্তি ও আনন্দ দুটোই দিয়েছে। কাজেই মনের সুখে কিছুক্ষণ হেসেছি। এর কয়েক দিন পর কান্না পেল সারের দাম প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বাড়ানোর খবর পড়ে। বিগত বছর দর বৃদ্ধির পর বছর না ঘুরতেই আবারও সারের দর বৃদ্ধি কৃষকের কোমর ভাঙা ও মুদ্রাস্ফীতির আগুনে ঘি ঢালার আশঙ্কায় কেঁদেছি। শেষে হেসেছি খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর সাময়িক ফলাফল সংবাদপত্রে দেখে। বেসরকারি অনেক থিংক-ট্যাংক এ সময়ের জন্য দারিদ্র্যের হার কয়েকগুণ বাড়িয়ে যেসব প্রাক্কলন করে আসছিলেন, সেসব মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এই জরিপ দেখায় যে, ২০১৬ সালের ২৪.৩ শতাংশ থেকে দারিদ্র্যের হার কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ শতাংশে, আর অতিদারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশ থেকে নেমে গেছে ৫.৬ শতাংশে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্যের হার কমতিতে একটা স্থবিরতা এসে গিয়েছিল। কিন্তু এখনকার এত সব দুর্যোগের মাঝে এভাবে দারিদ্র্যের হার কমায় কার না আনন্দের হাসি হাসতে ইচ্ছা করে। এখন এগুলো একটু খতিয়ে দেখা যাক।

দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ কীভাবে কর্মহীন হলেন, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়; কর্মহীনতার সংজ্ঞা এই জরিপে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে কর্মক্ষম কোনো মানুষের কর্মহীন থাকার কথা নয়। সপ্তাহে অন্যূন এক ঘণ্টা উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ পেলেই সে অবস্থাকে আর কর্মহীন বলা চলবে না। পরিবারের জন্য ওই সময় উৎপাদন কাজ করলেও বা হাঁস-মুরগি পালন করলেও কর্তা কর্মে নিযুক্ত বলে গণ্য; অর্থাৎ তিনি আর বেকার নন। মজুরি গ্রহণের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্মের এই সংজ্ঞা কেন প্রবর্তন করেছিল, তা আমার জানা নেই। তবে এই সংজ্ঞায় কেউ বেকার থাকতে পারে না। অবসর গ্রহণের পর কর্মহীন হয়ে আমি বসে আছি। কিন্তু এই সংজ্ঞা পঠনের পর মনে হচ্ছে যে, আমিও কর্মে নিযুক্ত; কারণ, আমার স্ত্রী আমাকে দিয়ে মাঝে মধ্যেই বাজার করায়, আমি না করলে পয়সা খরচ করে তাকে অন্যকে দিয়ে সে কাজ করাতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো কর্মহীনতার এই জাতীয় সংজ্ঞার উপযোগিতা কি? যে কর্ম একজন মানুষকে তার ন্যূনতম মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ, সেই অবস্থাই তো প্রকৃতপক্ষে বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব এরূপ বেকারত্বের নিরসন ও তার পথ-নকশা বিরচন; সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে বেকারত্বের অসুরকে আড়াল করা সমস্যা সমাধানের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে না।

কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বৈত অভিঘাতে অন্যসব খাত যখন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে, তখন কৃষিই আমাদের রক্ষা করে। এখনো আমরা যেটুকু ভালো আছি, তার প্রধান কারণ কৃষি ও কৃষকের অপরিমেয় অবদান। এই শ্রমশক্তি জরিপেই উল্লেখ আছে যে, প্যাকেজে প্যাকেজে পাওয়া এত সুবিধার পরও শিল্প খাতে নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে; ২০১৭ সালে শিল্প খাতে নিয়োজিতদের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ, কিন্তু ২০২২ সালে তাদের সংখ্যা কমে হয়ে গেছে ১ কোটি ২১ লাখ। উল্টো দিকে কৃষি খাতে নিয়জিত লোকবল বেড়েছে ৭৫ লাখ; ২০১৬ সালে এই খাতে নিয়োজিত ছিল ২ কোটি ৪৭ লাখ, ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২২ লাখ। ২০১৬ সালে কৃষিতে নিয়োজিত ছিল ৪০.৬ শতাংশ শ্রমশক্তি, এখন সেটা বেড়ে ৪৫.৩৩ শতাংশ হয়ে গেছে। এবারকার খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা যাচ্ছে, কৃষিনির্ভর গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়ে গেছে ২০.৫ শতাংশ, পক্ষান্তরে শহরাঞ্চলে এর হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৭ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে যখন সারের মূল্য নিম্নে ২৪ শতাংশ থেকে ঊর্ধ্বে ৫৪ শতাংশ কমে গেছে, তখন সারের দামের বৃদ্ধি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নানা রকমের অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দারিদ্র্য হারের কমতিতে দীর্ঘদিন পর চমৎকারিত্ব এসেছে; দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হার কমে যথাক্রমে ১৮.৭ শতাংশ এবং ৫.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্রটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক, কিন্তু এটা কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী স্টাগফ্লেশনের এমন এক সময় ঘটেছে, যখন অধিকাংশ বোদ্ধারা এর উল্টোটাই প্রাক্কলন করে আসছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, দুরবস্থা যেন সুফলের ডালা নিয়ে হাজির হয়েছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের একটা কৌতুক এখানে প্রাসঙ্গিক। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে চার্চিল কতিপয় অন্তরঙ্গ বন্ধু মিলে এক জায়গায় কিছু অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। তখন এক বন্ধু হঠাৎ মন্তব্যও করে বসেন এটা কী রকম বিদ্রুপাত্মক অবস্থা যে, বিশ্বযুদ্ধে যারা হেরে গেলন জার্মানি ও জাপান, তারা আজ বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী দেশ। পক্ষান্তরে বিজয়ীরা গ্রেট ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মনে হচ্ছে আজ এক ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির মধ্যে পড়ে প্রতিনিয়ত খাবি খাচ্ছে। তখন চার্চিল এক কোনা থেকে তামাশা করে বলেছিলেন, ‘Well, we might fight another war and lose it?’ আমরা কি তাহলে দারিদ্র্য কমাতে কোভিড সংক্রমণ ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রলম্বন চাই? বেসরকারি থিংক-ট্যাংকগুলোর দারিদ্র্যের অভিক্ষেপের সঙ্গে খানা আয়-ব্যয় জরিপের যেন যোজন যোজন মাইলের দূরত্ব। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে এই প্রহেলিকার স্বরূপ ও কারণ উন্মোচনে এগিয়ে আসা। তাতে স্বচ্ছতার জয় হবে।

এই জরিপে আরও কিছু মজার তথ্য দেখা যাচ্ছে। গড় বৈষম্যের মাত্রা গিনি সহগ স্কেলে ২০১৬ সালে ছিল ০.৪৮২; সেটা বেড়ে ২০২২ সালে ০.৪৯৯-এ উন্নীত হয়ে গেছে। ০ থেকে ১ পর্যন্ত বিস্তৃত বৈষম্য পরিমাপকের এই গুণাঙ্ক স্কেলে ০ নির্দেশ করে এমন এক সমাজ যেখানে সবার আয় ও সম্পদ সমান; আর এর মান ১-এর অর্থ সমাজের সব সম্পদ ও আয় একজন বা এক পরিবারে কেন্দ্রীভূত। দেখা যাচ্ছে যে, আমরা এখন এই স্কেলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু মুখটা ১-এর দিকে। এটা অবশ্যই উদ্বেগের একটা কারণ। কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ না। শহর ও গ্রামের মধ্যে এই বৈষম্যের প্রবৃদ্ধির হারেও তারতম্য রয়েছে। ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলে বৈষম্যের মান ছিল ০.৪৫৪, কিন্তু ২০২২ সালে তা কিছুটা কমে হয় ০.৪৪৬। অপরদিকে ২০১৬ সালে শহরাঞ্চলে এই সহগের মাত্রা ছিল ০.৪৯৮ এবং ২০২২ সালে এসে এই সহগ হয়ে গেছে ০.৫৩৯। এখানে দারিদ্র্যের হার কমেছে ঠিকই, কিন্তু বৈষম্য প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে যে, দেশের অর্থনীতিবিদরা কোভিডের নেতিবাচক প্রভাবে শহরাঞ্চলে নব্য গরিব শ্রেণির আকস্মিক উত্থানের যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন, তা আসলে অমূলক। উল্টো গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে, আবার সেখানকার বৈষম্যের মাত্রাও কমে গেছে। তাহলে কি বৈষম্যের মাত্রা কমাতে দারিদ্র্যের হার বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে? নাকি দরকার উন্নয়নের কৌশল ও মডেলে বাঞ্ছিত পরিবর্তন আনয়ন? এখানেই রয়েছে সুষম ও সমতাভিত্তিক উন্নয়নের নীতি প্রবর্তন এবং সংশোধনে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণালব্ধ তথ্য সংগ্রহের গুরুত্ব। 

গবেষণা ও জরিপে যদি প্রত্যয়ের সংজ্ঞায়ন ও পদ্ধতিগত হস্তচালনে সমস্যার স্বরূপ উন্মোচিত না হয়, তবে সে জরিপের ফলাফল পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালন ও সংশোধনে ভুল বার্তা দেবে। এমনিতেই এখন বৈষম্যের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়ের স্বল্পতা ও পর্যাপ্ত কর্মাভাব যে এই বৈষম্যের প্রধান কারণ তা বলাই বাহুল্য। গ্রাম ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে এখন ব্যাক সিটে চলে যেতে দেখছি। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ও শ্রমশক্তির ধারক-বাহক এখনো গ্রামাঞ্চলই। কাজেই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে গবেষণা পরিচালনা করে যতটা সম্ভব অভ্রান্ত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তার ভিত্তিতে উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও সংশোধন করতে হবে। আর সেখানে গ্রামাঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com