শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল মিনিট পাঁচেকের। অনুষ্ঠানের শুরুতে, বঙ্গভবনের দরবার হলের মঞ্চে একই সঙ্গে দুই জন ‘মহামান্য’ উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে তিনটি আসনের মধ্যে বসা ছিলেন বিদায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। তার ডান পাশের আসনে নবনির্বাচিত মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, বাম পাশে মাননীয় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। স্পিকার শপথ বাক্য পাঠ করানোর পর, বিদায়ী রাষ্ট্রপতি নতুন রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন এবং দুজন আসন বদল করেন। মাঝের আসনে চলে আসেন নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরই মাধ্যমে বঙ্গভবনে আব্দুল হামিদের দুই মেয়াদে ১০ বছরের কার্যকাল শেষ হলো। শুরু হলো মো. সাহাবুদ্দিনের নতুন অধ্যায়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার আগ পর্যন্ত এ পদের জন্য মো. সাহাবুদ্দিনের নাম শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারও কল্পনায় ছিল না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে ২ মাস ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, শপথ নিয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য। এটা ঠিক, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাম আসার আগ পর্যন্ত জনপরিসরে তিনি খুব পরিচিত ছিলেন না। তবে ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থেকেছেন। দলের প্রতি এই আনুগত্যই তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন করেছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের জীবনের আসলে চারটি অধ্যায়। ১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্ম নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৮২ সাল পর্যন্ত পাবনায়ই ছিলেন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে রাজনীতি করেছেন পাবনার জেলা পর্যায়েই। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, বাকশাল, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সক্রিয়ভাবে। পাবনায়ই সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাভোগ করেছেন। সয়েছেন নির্মম নির্যাতন। কারাগারে ছিলেন তিন বছর।
১৯৮২ সালে শুরু হয় তার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন। ২৫ বছর চাকরি শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসরে যান। ২৫ বছরের চাকরি জীবনেও তিনি আওয়ামী আদর্শে অবিচল ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আইন মন্ত্রণালয় নিযুক্ত সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পরপর দুইবার বিসিএস (বিচার) অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
চাকরি জীবন শেষে জীবনের তৃতীয় অধ্যায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে দেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর তাণ্ডব চালায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই তাণ্ডব তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে, যার প্রধান ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। সে দায়িত্ব শেষে তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দল, দেশ ও জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি তিনি পালন করেন দুদকের কমিশনার থাকার সময়। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের পথ ধরে অন্য উন্নয়ন সহযোগীরাও নিজেদের সরিয়ে নিলে বাংলাদেশ বিপাকে পড়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণের চেয়ে তখন বড় হয়ে উঠেছিল দেশের ভাবমূর্তি। শেখ হাসিনার সাহসিকতায় নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে। শেখ হাসিনা সেই সাহসটা পেয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে।
দুদক কমিশনার হিসেবে তিনি তদন্ত করে প্রমাণ করেছিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক কমিশনার তদন্ত করে বললেই সবাই সেটা মানবেন কেন? মানতে হয়েছে, কারণ দুদকের তদন্ত গ্রহণ করেছিল কানাডার আদালত। এভাবে আড়ালে থেকে তিনি দেশকে একটি বড় কলঙ্কের দায় থেকে বাঁচিয়েছিলেন।
দুদক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে গত ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি অন্যতম নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। পরে তাকে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করা হয়। সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি ঘোষিত বিভিন্ন উপ-কমিটির তালিকায় তিনি প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। মো. সাহাবুদ্দিন বরাবরই আড়ালে থেকে দলের জন্য কাজ করেছেন। জীবনের প্রথম তিনটি পর্যায়ের ত্যাগের মূল্যায়ন করেই শেখ হাসিনা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন।
জীবনের প্রথম ৭৪ বছরের তিনটি পর্বে তিনি আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন। দেশকে রক্ষা করেছেন, বড় কলঙ্কের দায় থেকে। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি আর আওয়ামী লীগার নন। তিনি এখন রাষ্ট্রের প্রধান, সবার অভিভাবক, মহামান্য। অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে সবার প্রতি ন্যায্য আচরণের শপথ নিয়েছেন। সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়েছেন।
যদিও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ‘ফিতা কাটা আর মাজার জিয়ারত’ ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই, তবুও চাইলে রাষ্ট্রপতি অনেক কিছুই করতে পারেন। মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিলেন, যখন দেশ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে অনড়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সংবিধানের বাইরে কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন না দেওয়ার ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে। রাজনীতি যখন পয়েন্ট অব নো রিটার্নে, এমন এক জটিল সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
তার সামনে এখন অগ্নিপরীক্ষা। নতুন রাষ্ট্রপতির প্রথম কাজ হলো, সব রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন করা, জনগণের ভালোবাসা আদায় করা। নতুন রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘আমি রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখব, আমার করণীয় কী আছে। আমার করণীয় যা থাকবে, তা আমি করব। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে।’
তিনি যদি দুই দলের দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নিতে পারেন, যদি সব দলকে নির্বাচনে আনতে পারেন, যদি একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভূমিকা রাখতে পারেন; তাহলেই মো. সাহাবুদ্দিনের জীবনের চতুর্থ অধ্যায়টিও সাফল্যে মোড়ানো থাকবে। সেটা তার জন্য যেমন, দেশের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।