ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রাণসংহারি ঘূর্ণিঝড়ের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আবারও ফিরে এসেছে ২৯ এপ্রিল। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সহ উপকূলবাসীর কাছে এ দিনটি বয়ে আনে শোক আর কান্না। ১৯৯১ সালের এই দিনটিতে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস তছনছ করে দিয়েছিল লাখ লাখ মানুষের সাজানো সংসার। প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল অন্তত : দুই লক্ষাধিক মানুষের।
উপকূলবাসীদের কাছে ৩২ বছর আগের সেই দুর্যোগের বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও জ¦লজ¦ল করে ভাসে চোখের সামনে। সেদিনের কথা মনে পড়লে স্বজন হারানোর বেদনায় ঝাপসা হয়ে আসে দুই চোখ।
কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী উপকূলীয় আনোয়ারা উপজেলার পশ্চিম রায়পুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সত্তরোর্ধ্ব আবুল কালাম দেশ রূপান্তরের কাছে তুলে ধরেন সেই মহাপ্রলয়ের রাতে দেখা দৃশ্যের বর্ণনা। তিনি বলেন, সেদিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। দিনভর ঝরছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মাঝেমধ্যে আসছিল বাতাসের ধাক্কা। সন্ধ্যা নামতেই পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। দমকা হাওয়া আর বৃষ্টি বাড়তে লাগল। রাত ১০টার পর থেকে প্রচ- বেগে শুরু হয় ঝড় ও বৃষ্টি। বিপদ আসন্ন জেনে অনেকেই বাড়ি ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটে যায়। আবার অনেকেই সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে না পেরে কিংবা সাজানো সংসারের মায়ায় নিজ নিজ ঘরেই অবস্থান করতে থাকে। রাত ১২টার দিকে সাগরের প্রচ- ঢেউয়ের আঘাত বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা। মারা যায় অগুনতি নারী-পুরুষ ও শিশু। প্রাণে বাঁচতে পারেনি গৃহপালিত পশুও।
সেই জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা। পরদিন এ প্রতিবেদক সরেজমিনে আনোয়ারা উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখতে পান শুধু লাশ আর লাশ। পানির স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা সারি সারি নারী-পুরুষের লাশ পড়েছিল রাস্তার পাশে। ভাসছিল পুুকুরের পানিতেও। এর মধ্যেই অনেকে খুঁজে ফিরছিল হারানো স্বজনদের মুখ। বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল পুরো উপকূলীয় এলাকা। অধিকাংশ এলাকায় বাড়িঘরের নিশানা পর্যন্ত ছিল না। কিছু কিছু জায়গায় উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো ছিল সম্পূর্ণ পাতাবিহীন। সাগরপাড়ের কাছাকাছি এলাকার জমিতে জমেছিল সাগর থেকে ওঠে আসা বালির স্তূপ।
সেই ঘূর্ণিঝড়ে বড় ধরনের ক্ষতি সাধিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর, ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার। দ্বিখ-িত হয়ে পড়েছিল কর্ণফুলী নদীর ওপর স্থাপিত শাহ আমানত সেতু। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা ছিল বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায়।
বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদে প্রাণ ফেরাতে সেদিন পাশে দাঁড়িয়েছিল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিল মার্কিন টাস্কফোর্স ‘অপারেশন সি এঞ্জেল’। মার্কিন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জেনারেল হেনরি স্ট্যাকপোলের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স সদস্যরা ২৮টি হেলিকপ্টার ও উভচর যান নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায়। অংশ নিয়েছিলেন উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায়।
প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল উপকূলবাসীর কাছে সেই শোকের স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে। এই দিনে উপকূলীয় এলাকায় কান পাতলেই শোনা যায় ঘরে ঘরে কান্নার শব্দ। সেই ভয়াল দিনের স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, কোরানখানিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে তারা।
আলোকচিত্র প্রদর্শনী : ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল স্মরণে সেই ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন ছবি নিয়ে আজ শনিবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে চিত্রসাংবাদিক দেব প্রসাদ দাশ দেবুর একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে শতাধিক আলোকচিত্র স্থান পাবে।