বহুত্ববাদ পরিত্যাগ করে হিন্দুত্ববাদ!

হিন্দুত্ববাদী বিজেপির শাসনামলে ভারত কি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে? বিজেপির বিদ্যমান শাসনামলে নানা ঘটনায় ও দৃষ্টান্ত তেমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে অহিন্দু সংখ্যালঘু হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়নের অজস্র নৃশংস ঘটনাসহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেই চলেছে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়, মুসলিম বসতি উচ্ছেদে মুসলিম শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায় ঘৃণিত ঘটনাও ঘটিয়েছে দলটির উগ্রবাদী কর্মীরা। ভারতের নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, পক্ষপাতমুক্ত কিন্তু বলা যাবে না। আর্থিক এবং পেশিশক্তির প্রভাব প্রতিটি নির্বাচনে লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারানোর ঘটনাও অহরহ ঘটে। ভারতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে আসছে নির্বাচনের মাধ্যমে। এটাই দেশটির গণতান্ত্রিকতার একমাত্র সনদ হতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে ভারত এককেন্দ্রিক শাসনের অধীন। ভারত একজাতি ও এক সম্প্রদায়ের দেশ অতীতেও ছিল না। আজও নয়। অজস্র ভাষাভাষী ও অনেক সম্প্রদায়ের দেশ ভারতে জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সাংবিধানিকভাবে খর্ব করা হয়েছে, সংবিধান প্রণয়নকালে। কংগ্রেস অখণ্ড ভারতের দাবি তুলেছিল, বৃহৎ ভারতের পুঁজিপতি গোষ্ঠীর সর্বভারতীয় জনগণের ওপর একচেটিয়া পুঁজির শাসন-শোষণ নিশ্চিত করার অভিপ্রায়ে। ভারতীয় পুঁজিপতিরাই কংগ্রেস এবং গান্ধীর প্রধান পৃষ্ঠপোষকরূপে অকাতরে অর্থের জোগান দিয়েছিল। পুঁজির শাসন ও শোষণের জাঁতাকলে ভারতীয় জনগণ খেসারত দিয়ে আসছে, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর থেকে এযাবৎ। ভারত স্বাধীন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কিন্তু স্বাধীন হতে পারেনি। মুক্তি তো অবিশ্বাস্য।

স্বাধীনতার বহু পরে ১৯৭৪ সালে ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বাস্তবে সেটা কাগুজে পরিণত। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিধান তবে উন্মুক্ত কেন? ধর্মনিরপেক্ষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস নেতৃত্বের স্বেচ্ছাচারী কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেই ধর্মভিত্তিক পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তুলেছিলেন। তবে ভারত বিভাগের জন্য কেবল জিন্নাহ একা দায়ী ছিলেন না। হিন্দুরা এক পৃথক জাতি, এই কথা ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের পূর্বে ১৯৩৮-৩৯ সালে হিন্দু মহাসভার অধিবেশনগুলোতে সাভারকার সভাপতিরূপে বারবার বলেছেন। গান্ধীও তখন ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান পৃথক দুটি জধপবং (নরগোষ্ঠী) বলে উল্লেখ করেছেন। সর্দার প্যাটেলও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, হিন্দু ও মুসলমানরা দুই পৃথক জাতি, এমন কি গান্ধী ও কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ঘনশ্যাম দাস বিড়লা লাহোর প্রস্তাবের দুই বছরেরও আগে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের প্রস্তাব করেছিলেন গান্ধী ও ভাইসরয় লিনলিথগোর কাছে। গান্ধী ‘হরিজন’ পত্রিকায় লিখে ও বলে বেড়িয়েছেন, মুসলমানরা ভারতবর্ষকে ভাগ করতে চাইলে তিনি বাধা দেবেন না। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থিরা তো বটেই, কংগ্রেস দলের ভূমিকায় ভারত ভাগের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছিল এবং জিন্নাহকে ওই পথে অগ্রসর হয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবে পরিণত করেছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রস্তাব নিয়ে ভারতে আসেন ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপস্ ১৯৪২ সালের ১২ মার্চ। ক্রিপসের ওই প্রস্তাবে, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় বিধানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক রাজ্যের স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থার অধিকারের কথাও উল্লেখ ছিল। এমন কি কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারের কথাও ছিল ওই প্রস্তাবে। ক্রিপস্ কমিশনের প্রস্তাব, মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন। ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তাগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কংগ্রেস বিচ্ছিন্নতার অধিকার হিসেবে অভিহিত করে। মূলত কংগ্রেসের এককেন্দ্রিক ভারত-শাসনের অভিপ্রায় ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় কংগ্রেস ক্রিপস কমিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। জিন্নাহরও অভিন্ন বাসনা ছিল ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা। ধর্মের বিভাজনে ভারত বিভক্তি ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বে এ ধরনের দ্বিতীয় ঘটনা কিন্তু আর একটিও ঘটেনি।

নির্বাচনে বিজয়ী সরকার মাত্রই গণতান্ত্রিক নয়। বিশ্ব ইতিহাসের নিন্দিত হিটলার, মুসোলিনিও কিন্তু জনরায় নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। দীর্ঘ মেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতায় থাকাই শাসকদের ফ্যাসিবাদী করে তোলে। প্রতিটি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর মধ্যে তাই ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে রাজ্যে-রাজ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্তিতে দলটি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ তকমা মুছে দেওয়ার নানা অপকীর্তি সংঘটনে মেতে উঠেছে। বামদুর্গ খ্যাত ত্রিপুরায় বিজেপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দখলে নিয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে। পশ্চিম বাংলায় ৩৪ বছর বামফ্রন্টের শাসনাধীন থাকলেও বামফ্রন্টের পতন ঘটে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় নানা স্বেচ্ছাচারিতায়। বামফ্রন্টের সুযোগ-সুবিধাভোগীরা পরবর্তী সময় ওই সুবিধার লোভে দলে দলে এখন ক্ষমতাসীন তৃণমূলে, এমনকি বিজেপিতেও শামিল হয়েছে। সুবিধাভোগীরা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রবণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটেছে যেমন ভারতে, তেমনি বাংলাদেশেও।

তৃণমূলের প্রতিপক্ষ ছিল বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস। গত দুটি বিধানসভার নির্বাচনে সেটা দেখা গেছে। বিজেপির ভারতজুড়ে বিজয়ের চাকা অগ্রসরমাণ অথচ পশ্চিম বাংলায় তাদের ছিল দুরবস্থা। বিজেপির রথের চাকা পশ্চিম বাংলায় প্রায় অচলই ছিল। বিজেপির অবস্থার বদল ঘটতে কিন্তু বিলম্ব হয়নি। পশ্চিম বাংলার নির্বাচনে শূন্য অবস্থান থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বিজেপি। অচিরেই যদি পশ্চিম বাংলা ত্রিপুরার ভাগ্যবরণ করে তাহলে অবাক-বিস্ময়ের কারণ হবে না। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে।

বামফ্রন্টের পতনে তৃণমূলের উত্থান আমাদের চমকে দিয়েছিল। ভবিষ্যতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির পশ্চিম বাংলার ক্ষমতা গ্রহণে আমরা কিন্তু বিস্মিত হবো না। কলকাতায় মার্কসবাদী একজন রাজনীতিকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘দেখুন, আমরা দেশভাগের পর পূর্ববাংলার প্রত্যাগতরা প্রায় সবাই এ দেশে এসে বামপন্থায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর হতে এযাবৎ যারা এসেছে, তারা সবাই আচানক বিজেপির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই বাস্তবতা। আসামে এবং ত্রিপুরায়ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী পূর্ববঙ্গীয়রা বিজেপির ভোটব্যাংক হয়ে পড়েছে। পশ্চিম বাংলার ভবিষ্যৎ যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, বলা মুশকিল।’ তার বক্তব্যের প্রমাণ তো পশ্চিম বাংলার গত বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল।

ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময়ে প্রতিটি রাজ্যের রাজ্যপালকে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল, ওই প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নেহরু। নেহরু ওই প্রস্তাবের বিপরীতে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক রাজ্যপালের নিয়োগকে সংবিধানভুক্ত করেন। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস এবং নেহরুর অসীম জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের কারণে প্রস্তাবকরা নিশ্চুপ হয়ে যান। নেহরু, সর্দার প্যাটেলের প্রস্তাবই সংবিধানে সর্বাধিক অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, দলের ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় এবং নানা কূটকৌশল অবলম্বনে। কেন্দ্রীভূত শাসনের জালে আবদ্ধ ভারতের রাজ্যগুলোর শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা কেন্দ্র কর্তৃক কুক্ষিগত। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত রাজ্যপাল ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগত-তল্পিবাহক। পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথাগত রায় বিজেপির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ত্রিপুরার রাজ্যপাল পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। রাজ্যপালের পদ সাংবিধানিক এবং রাজ্যের নির্বাচিত সরকারকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করার এখতিয়ারও রাজ্যপালকে দেশটির সংবিধান দিয়েছে। রাজ্যপালদের অসীম ক্ষমতা প্রদানের মাশুল এখন স্বয়ং কংগ্রেস দলকেই দিতে হচ্ছে। আশার কথা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পা সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হবেন বিবেচনায় শপথের ৭২ ঘণ্টার মাথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে কংগ্রেস এবং জেডিএস জোট রাজ্যে সরকার গঠন করে। কংগ্রেস-জেডিএস জোটের অধিক আসন সংখ্যার পরও রাজ্যপাল কোন যুক্তিতে বিজেপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণসহ ইয়েদুরাপ্পাকে মুখ্যমন্ত্রীর শপথ করিয়েছিলেন? ওদিকে বিজেপি কংগ্রেস ও জেডিএসের বিধায়কদের অর্থের বিনিময়ে দলে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। দল ভাঙতে বিজেপি অর্থের ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। নেহরু উদ্দেশ্যমূলক রাজ্যপালের নিয়োগের এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের বিধি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই অগণতান্ত্রিক বিধির শিকার এখন খোদ কংগ্রেস দল। তাদেরই বলির পাঁঠায় পরিণত করেছে। আমাদের উপমহাদেশের তিন খণ্ডে বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতায় থাকা সরকাররা ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজেদের দেশের শেষ সরকার বিবেচনা করে। এটা যে চরম আত্মঘাতী সেটা অতীত এবং বর্তমানের ইতিহাসের নানা দৃষ্টান্ত এবং অভিজ্ঞতায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক নতুন দিগন্ত