খোকনের চ্যালেঞ্জ ঘরের ঐক্য

বরিশালে দলীয় কার্যালয়ে এক মঞ্চে পৃথক সময়ে মে দিবসের দুটি অনুষ্ঠান করেছে আওয়ামী লীগ। একটি সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী পক্ষ, অন্যটি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের পক্ষ। বরিশাল সদর রোডের সোহেল চত্বরে দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠান করেন জাহিদ ফারুক। ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ সেরনিয়াবাত ওরফে খোকন।

বিকেল ৪টায় একই মঞ্চে সাদিক অনুসারীরা অনুষ্ঠান করে। সেখানে খোকন সেরনিয়াবাতকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। শ্রমিক লীগ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আবদুল্লাহর নির্দেশনায় তা হয়েছে বলে দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান।

আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। তার আগে খোকন সেরনিয়াবাতের পাশের ঘরের লোকজনকে দেখা যাচ্ছে না বলে জানান তারা।

বিএনপিবিহীন এ নির্বাচনে বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ এবার মনোনয়ন দিয়েছে খোকন সেরনিয়াবাতকে। তিনি বর্তমান মেয়রের চাচা। বরিশালের প্রভাবশালী পরিবার আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছোট ভাই। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে খোকন সেরনিয়াবাতের সঙ্গে লড়বেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতা আহসান হাবীব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রূপন। ভোটের লড়াইয়ে কে থাকছেন, কে থাকছেন না তা নিশ্চিত হতে ২৫ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওইদিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য ‘শাঁখের করাত’ হিসেবে দেখা দেয়। এর আগেও দুবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওই পাঁচ সিটির ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৩ সালে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজয় হজম করতে হয়। দশম সংসদ নির্বাচনে দলের শক্তি পরীক্ষা করতে গিয়ে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে দলে আলোচনা আছে।

২০১৮ সালে সেদিকে আর হাঁটেনি ক্ষমতাসীনরা। এবারও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা আওয়ামী লীগকে পাঁচ সিটিতে ভোটের লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে। এর মধ্যে বরিশাল সিটিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদলানোর কারণে সেখানে দলটিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে অন্য সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সময়মতো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে সিটি নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার অবসান ঘটবে।

বরিশালের বর্তমান মেয়র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কারণে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রার্থী পরিবর্তন করেছেন বলে জানা গেছে। বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী পরিবারটির একজনকে বাদ দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন একই পরিবারের আরেক সদস্যকে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও বরিশালের স্থানীয় একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মনোনয়ন বোর্ড নতুন প্রার্থী বেছে নিলেও আবুল হাসানাত ও তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ তা মেনে নিতে পারেননি। তাই বরিশাল সিটি ভোটে হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে উঠেছে। বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মনোনয়ন বদলের পর এখন পর্যন্ত বাবা-ছেলে কেউই বরিশাল যাননি। মনোনয়ন ঘোষণার দিন থেকে তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, তাদের অনুসারীদের সঙ্গে লাইভে যুক্ত হলেও সিটি নির্বাচন নিয়ে কাউকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেননি।

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মে দিবসের কর্মসূচি পালনে বরিশালে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও মেয়র পদে ভোটে প্রভাবশালী পরিবারের ভূমিকা কী হতে পারে, সবাই টের পাচ্ছে। ২০১৩ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আহসান হাবীব কামালের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আলোচনা বরিশালে আবার জমে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ ওই নেতা আরও বলেন, ‘ঘরের দ্বন্দ্ব’ বরিশাল সিটির নির্বাচনকে কোথায় নিয়ে যায়, বলা মুশকিল। এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেলে নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। ‘ঘরের ঐক্য’ নিশ্চিত হলে নৌকার জয় সহজ হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মনোনয়ন বদলের কারণে বরিশাল সিটি করপোরেশন ভোটে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। ওলট-পালট হয়ে গেছে বরিশালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটও। মেয়র পদে প্রার্থী বদলালেও প্রভাবশালী পরিবারেই রাখা হয়েছে। এতে পরিবারের ভেতর যেমন অস্বস্তি-সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে, তেমনি বরিশালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখনো পর্যন্ত প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য খোকন সেরনিয়াবাত মনোনয়ন পেলেও বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত পরিবারের সদস্যরা কেউ তার সঙ্গে প্রকাশ্যে নামেননি। মে দিবসের অনুষ্ঠানে দূরত্বটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেয়র পদের ভোট নিয়ে হাসানাত পরিবারের বিভক্তি ও মাঠে খোকন সেরনিয়াবাতের একলা অবস্থা পিছিয়ে দিচ্ছে প্রার্থীকে। পারিবারিক এ অবস্থার কারণে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও নামতে পারছেন না প্রকাশ্যে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অস্বস্তি কাজ করছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সব নেতাকর্মীর মধ্যে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস দেশ রূপান্তরকে বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে মুখে মুখে অনেক কথা হয়। সব সত্যি নয়। তিনি বলেন, পরিবারে সামান্য ঝামেলা হতেই পারে। এগুলো বড় করে দেখার সুযোগ নেই।

প্রচারে খোকন সেরনিয়াবাত একলা কেন এ প্রশ্নে মো. ইউনুস বলেন, প্রচারে নামার সুযোগ এখনো হয়নি। মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রত্যাহার, বাছাই অনেক প্রক্রিয়া রয়েছে। এগুলো শেষ হলেই সবাই সম্মিলিতভাবে নৌকার পক্ষে মাঠে নামবে। হাসানাত পরিবার অনুসারী হিসেবে পরিচিত এ নেতা বলেন, এ মাসের মাঝামাঝি জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা হবে, সেখানে জাতীয় নেতারাও উপস্থিত থাকবেন। তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই মাঠে নামবেন।

তিনি বলেন, অনেকেই অনেক কথা বলেন, কিন্তু হাসানাত ভাই আমাকে একটা কথা বলেছেন, ‘ইউনুস, ও তো আমার ভাই’। বর্তমান মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ তো মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি।