গুপি-বাঘা আমাদের কী বলে

ছোটদের জন্য সত্যজিৎ রায় শুধু গল্প লিখে বা পত্রিকা সম্পাদনা করেই ক্ষান্ত হননি, নির্মাণ করেছেন বেশ কয়েকটি সিনেমা। তার ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছোট-বড় সকল দর্শকের মন জয় করে নেয়। কালক্রমে সিনেমাটি এতই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যে, অনেকে চলচ্চিত্রটির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা সত্যজিৎ রায়ের বলে ভুল করেন। চিত্রনাট্য ও পরিচালনা  সত্যজিৎ রায়ের হলেও কাহিনি তার বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর। তবে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, সত্যজিতের হাতেই গুপি-বাঘা অমরত্ব লাভ করেছে।

গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমায় রাজা আছে, রাজবাড়ি আছে তাহলে কি এটি রূপকথার সিনেমা? নাকি গুপি গাইন বাঘা বাইন ভৌতিক বা হরর সিনেমা এতে তো ভূতও আছে। মজাটা হলো এখানেই। এই সিনেমায় রাজা, রাজবাড়ি, ভূত, ভূতের জাদু, জাদু দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্পও আছে, তবু এটি ঠিক রূপকথার গল্প বলে এমন সিনেমা নয়। কারণ এই সিনেমায় রাজা-রাজবাড়ি-রাজকন্যা-রাজপুত্রকে গৌণ করে মুখ্য হয়ে উঠেছে দুজন সাধারণ মানুষ, যারা সংগীতকে ভালোবাসে, শিল্পকে ভালোবাসে। কিন্তু নেহাত পারিবারিক শিক্ষা ও ছেলেবেলা থেকেই তালিম না পাওয়ার কারণে তাদের এই সংগীতপ্রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসদৃশ। গুপি গাইন গান গাইতে ভালোবাসে কিন্তু তার গান গ্রামবাসী সহ্য করতে পারে না আর বাঘা ঢোলক বাজাতে ভালোবাসে কিন্তু তার বাজনা সহ্য করা সম্ভব নয় গ্রামবাসীর পক্ষে। ফলে গুপি ও বাঘাকে গ্রাম ছাড়তে হয়, বনে নিতে হয় আশ্রয়। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা হয় ভূতের রাজার সঙ্গে। ভূতের রাজা তাদের গান ও বাজনা শুনে মুগ্ধ হন এবং বর দেন, যে বরের বদৌলতে তারা বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু গুপি গাইন ও বাঘা বাইনের এই সিনেমাটিকে যদি আমরা একটু ভিন্নভাবে দেখি? তাহলে কিন্তু আমরা একটি শিক্ষণীয় বিষয় উপলব্ধি করতে পারি। গুপি-বাঘা নিজ নিজ গ্রামে সংগীতচর্চা করতে পারছিল না। এ অবস্থায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়াটাই তাদের শাপে বর হয়ে দাঁড়াল না? বিতাড়িত হয়ে তারা দুজনেই বনে নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় মনোনিবেশ করতে পারল। এই নিরবচ্ছিন্ন সাধনাই কি তাদের সাফল্য এনে দিল না? ফলে ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যদি তোমাদের পছন্দের বিষয়ে ভালো করতে চাও তাহলে আশপাশের কারও কথায় কান না দিয়ে সে বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে চর্চা করে যাও। দেখবে, তোমরাও গুপি-বাঘার মতো সফল হবে। কোনো বিষয়ে লেগে থাকলে সাফল্য নিশ্চিত গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমা আমাদের এই কথাই বলে। যারা সিনেমাটি দেখেছ তারা এ কথাটি নিশ্চয়ই মিলিয়ে নিতে পারছ আর যারা এখনো দেখনি তারা ঝটপট দেখে ফেলো আর মিলিয়ে নাও আমার কথাটি ঠিক কি না।