২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে তখন ধারণা করা হয়েছিল, কয়েক দিনেই ইউক্রেনকে কবজা করে নেবে মহাশক্তিধর রুশ বাহিনী। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উল্টো ইউক্রেনের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় রাশিয়ার সেনারা। ইউক্রেনে সামরিক অচলাবস্থার জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে উঠছে সমালোচনা। এরই মধ্যে ইউক্রেনের বাখমুত শহর থেকে নিজের সেনাদের প্রত্যাহারের হুমকি দেন ভাড়াটে সেনা দল ওয়াগনারের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন। কয়েক দিন ধরেই বাখমুতে ওয়াগনার অস্ত্রসংকটে ভুগছে জানিয়ে আসছিলেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তার চাহিদা অনুযায়ী মাত্র ৩২ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করছে।
সর্বশেষ এক ভিডিও বার্তায় নিজের সেনাদের মৃতদেহ দেখিয়ে প্রিগোজিন অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ দাবি করেন। না হলে ১০ মে তিনি নিজ সেনাদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দেন। ওই ভিডিওতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ চেহারায় প্রিগোজিন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেগেই শোইগু ও চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভের সমালোচনা করেন। ওয়াগনারপ্রধান জবাব দাবি করে বলেন, ‘শোইগু! গেরাসিমভ! গোলাবারুদ কোথায়? ওয়াগনার সেনারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে লড়তে এসে মারা যাচ্ছে মেহগনি কাঠের দপ্তরে তোমাদের মোটাতাজা হওয়ার জন্য।’ যদিও শোইগু-গেরাসিমভকে দেওয়া প্রিগোজিনের হুমকি আপাতত কাজে লেগেছে। রুশ বার্তাসংস্থা তাস জানিয়েছে, ওয়াগনারকে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রিগোজিনের ভিডিওকে তার আত্মপ্রচার ও প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখছে পশ্চিমা গণমাধ্যম। ভক্স, বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমের মতে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের প্রতিরোধ মোকাবিলায় সব যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র-গোলাবারুদ সমন্বয় করছে। কিন্তু ওয়াগনারপ্রধান শুধু নিজের বাখমুতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রব লি ভক্সকে বলেন, ‘বাখমুতে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তা পেয়ে আসছে ওয়াগনার, সবদিক দিয়ে তাদের বেশ প্রাধান্যও দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে প্রিগোজিনের ভিডিওর পর এক বিবৃতিতে রুশ প্রতিরক্ষার শীর্ষদের সমালোচনা করেছেন চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ। বিবৃতিতে ওয়াগনারপ্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন এবং রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ও সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভের মধ্যকার অপ্রীতিকর বিরোধে আক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন কাদিরভ। তিনি বলেন, ইউক্রেনে লড়াইয়ের যে শ্রদ্ধা প্রিগোজিনের তা রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেয়নি বলে এ অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বেড়েছে। পর্যাপ্ত গোলাবারুদ সরবরাহ না করার প্রিগোজিনের অভিযোগের বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য রুশ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চেচেন নেতা। এরপর তিনি ইউক্রেনের মারিওপোলে চেচেন যোদ্ধারা লড়াইয়ের সময় এমন সংকটে পড়েছিল বলে জানান। বিবৃতিতে কাদিরভ জানান, আসলেই যদি ওয়াগনার বাখমুত থেকে সেনা প্রত্যাহার করে তাহলে তার অনুগত চেচনিয়ার আখমাত সেনারা এ রণক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত আছে।
প্রিগোজিন এবং কাদিরভ দুজনই রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রিয়ভাজন হতে চান। তারা তাকে খুশি রাখতে সবকিছু করতে প্রস্তুত, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডে তা প্রমাণিত। এমনকি প্রিগোজিনের ওয়াগনার নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয় সোলেদার যুদ্ধে। ওয়াগনার সেনারা সপ্তাহখানেকের যুদ্ধে ইউক্রেনের সোলেদার শহর দখল করে নেয়। অথচ এ শহরটিকে টানা ১১ মাসের যুদ্ধেও নিয়মিত রুশ সেনারা দখল করতে পারেনি। বাখমুতও ৯৫ শতাংশ দখলে আনার দাবি করেছে ওয়াগনার।
আদতে যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং পুতিনঘনিষ্ঠ প্রিগোজিন-কাদিরভদের মধ্যে বিভেদ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রিগোজিনের সঙ্গে শোইগুর বিরোধটা যেন দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করে যখন ইউক্রেনে অভিযানরত রুশ বাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়। ‘জেনারেল আর্মাগেডন’খ্যাত সের্গেই সুরোভিকিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তার জায়গায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ। ইউক্রেনের রণাঙ্গনে ওয়াগনারের প্রধান প্রিগোজিন এবং জেনারেল সুরোভিকিন ছিলেন মিত্র। সেই সুরোভিকিনকে পরিবর্তন করা প্রসঙ্গে সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক অর্থনীতির বই ‘কমান্ড’-এর লেখক লরেন্স ফ্রিডম্যান বলেছিলেন, ‘এটি প্রিগোজিন-সুরোভিকিন অক্ষের বিরুদ্ধে পুরনো খেলোয়াড়দের (গেরাসিমভ-শোইগু) গৃহীত একটি পদক্ষেপ। গেরাসিমভ ইউক্রেনে যুদ্ধরতদের বিশেষ করে সোলেদার এবং বাখমুতে যুদ্ধরত ওয়াগনার সেনাদের পর্যাপ্ত সহায়তা দেননি এ অভিযোগ পুরনো।’
একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, সেটি হলো নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনাপতির সমালোচনা কেন সহ্য করছেন পুতিন? ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অভ্যন্তরীণ চাপে পড়া পুতিন সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রিগোজিন ও কাদিরভের মতো ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।