‘ভালো’ সম্রাট বনাম ‘মন্দ’ সম্রাট

ইতিহাসে সম্রাট আকবর ও আওরঙ্গজেবের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। এই দুই ব্যক্তিকে ভারত ও পাকিস্তানের মূলধারার ইতিহাসবিদরা দুভাবে বিশ্লেষণ করেন। আকবরের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা আর আওরঙ্গজেবের ধর্মান্ধতার কারণ কী ছিল? লিখেছেন ‍ তৃষা বড়ুয়া        

আকবর-আওরঙ্গজেব

জাতিরাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় ইতিহাস পাঠ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মতো উত্তর ঔপনিবেশিক দেশগুলোর জন্য এটি সর্বৈব সত্য। ভারত ও পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভাগ হয়ে গেলে দেশ দুটির ইতিহাস বিশ্লেষণে ভিন্নতা দেখা যায়। অতীত কোনো ঘটনা বা ব্যক্তি সম্পর্কে যে মূল্যায়ন ভারত রাষ্ট্রটি করে, তার ঠিক উল্টো মূল্যায়ন আমরা পাকিস্তানকে করতে দেখি। এটি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় মোগল সাম্রাজ্যের দুই পরাক্রমশালী শাসক আকবর ও আওরঙ্গজেবের ক্ষেত্রে। এই দুই সম্রাটের শাসনকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে দেশ দুটি। ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকে সম্রাট আকবরকে ন্যায়পরায়ণ ও সহিষ্ণু নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভারতের বেশির ভাগ মানুষ আকবরকে এমনটাই মনে করে। ওই সম্রাট দেশ ও দেশের মানুষকে ধর্মের ওপরে স্থান দেন। আবার তারই বংশধর ও উত্তরসূরি আওরঙ্গজেবকে মোগল সাম্রাজ্য পতনের প্রভাবক হিসেবে সেখানে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান সম্রাট আওরঙ্গজেবকে একজন আদর্শ মুসলমান শাসক হিসেবে দেখে, যিনি ধর্মকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন। বিজেতা ও দক্ষ শাসক হিসেবে আকবরের ব্যাপক প্রশংসা সেখানে করা হলেও তার ধর্মসংক্রান্ত নীতি পাকিস্তানিদের পছন্দ নয়। পাকিস্তানের ইতিহাসবিদ মুবারক আলী ১৯৯২ সালে তার আকবর ইন পাকিস্তানি টেক্সবুকস গবেষণাপত্রে বলেছিলেন, ‘হিন্দু ও মুসলমানকে এক জাতি হিসেবে দেখায় পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি গবেষণাকর্মে ব্যাপকভাবে সমালোচিত আকবর। পাকিস্তানিরা মনে করেন, ‘আকবর তার আমলে মুসলমানদের ভিন্ন পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলেছিলেন।’ অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসবিদ ইয়ান কপল্যান্ড ২০১৩ সালে প্রকাশিত তার এ হিস্টোরি অব স্টেট অ্যান্ড রিলিজন ইন ইন্ডিয়া বইয়ে বলেন, ‘সম্রাট আকবর ও আওরঙ্গজেবের ক্ষেত্রে বাইনারি দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা হলো, এর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত জটিল বিষয়কে অতিমাত্রায় সরল করে দেখা হয়। এটা ঠিক, মোগল আমলে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবনে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তবে এও ঠিক, পরবর্তী সময় ওই অঞ্চলে এর তাৎপর্য ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।’ এই দুই রাজনীতি বুঝতে গেলে জানা জরুরি কেন মোগল সাম্রাজ্য পতনের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করতে গেলে প্রায়ই আকবরকে টানা হয়।  

ধর্ম বিষয়ে আকবর

সম্রাট আকবরের সুলহ-ই-কুল (সর্বজনীন শান্তি) দর্শনের মধ্যেই তার ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাচেতনার শেকড় গ্রোথিত। দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফি দার্শনিক ইবনে আরাবি প্রথম সুলহ-ই-কুল দর্শন সামনে আনেন। এতে বলা হয়, রাজারা তাদের প্রজাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ। এই চুক্তি অনুযায়ী, যেহেতু সব ধর্মই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছার পথ, সে কারণে প্রজারা তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হবেন না। দার্শনিক ইবনে আরাবির সেই দর্শন অনুপ্রাণিত করে আকবরকে। সুলহ-ই-কুল দর্শন অনুসরণ করে তিনি সব ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহিষ্ণু আচরণ করেন। ১৫৬৪ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে সম্রাট আকবর হিন্দুদের ওপর আরোপিত বিতর্কিত ও শাস্তিমূলক জিজিয়া কর রদ করেন। একই সঙ্গে তিনি গরু জবাই নিষিদ্ধ করেন। বেদ, মহাভারত ও রামায়ণ ফারসি ভাষায় অনুবাদেরও নির্দেশ দেন আকবর। ধার্মিক মুসলমান হিসেবে আকবরের পরিচিতি থাকলেও গঙ্গা নদীর পানি তিনি পান করতেন বলে কথিত আছে। তিনিই প্রথম মোগল শাসক, যিনি রাজপুত পরিবারের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। ধর্মসংক্রান্ত বিষয়ে আকবর তার শাসনামলে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিলেও জীবনের শেষ সময়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষই তাকে ভুল বোঝে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আকবরকে গোঁড়া মুসলমান হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে তিনি সনাতন ধর্মে ধর্মান্তরিত বলে মনে করতেন মুসলমানরা।      

অবশ্য সম্রাট আকবর যে ভুল বা অন্যায় পদক্ষেপ নেননি, তা নয়। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় চিতোরগড় শহর অবরোধের পর সেখানকার বেসামরিক হিন্দুদের হত্যার নির্দেশ প্রদান। ভারতীয় ইতিহাসবিদ পাবর্তী শর্মা জানান, সম্ভবত মধ্য এশিয়ার মুসলমান অভিজাত শ্রেণির সমর্থন জোরদার করতে তিনি ওই কাজ করেছিলেন। অবশ্য ওই গণহত্যার পর আকবর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করেন এবং সাম্রাজ্যজুড়ে জনগণকে তাদের ধর্মচর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। প্রয়াত পণ্ডিত নাজিদ আহমেদ এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামে বলেন, ‘আকবর ছিলেন সার্বজনীন মানুষ। কোনো এক সম্প্রদায়ের মানুষ তার সম্পর্কে যা কিছু ভাবতেন, তার চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন তিনি। আকবর ছিলেন এশিয়ায় বেড়ে ওঠা ফোক ইসলামের সবচেয়ে খাঁটি প্রতিনিধিত্বকারী। মোঙ্গলরা ওই ইসলাম ধ্বংস করেছিল।’ 

আওরঙ্গজেবের শাসন

সম্রাট আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আজও চলমান। যদুনাথ সরকারের মতো ইতিহাসবিদরা মনে করেন, আওরঙ্গজেব ধর্মান্ধ ছিলেন। অন্যদিকে শিবলি নৌমানির মতো ইতিহাসবিদদের ভাষ্য, আওরঙ্গজেবের উদ্দেশ্য যতটা না ধর্মীয় ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক। যদুনাথ সরকার তার এ শর্ট হিস্টোরি অব আওরঙ্গজেব বইয়ে বলেন, আওরঙ্গজেব দার-উল-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। এর অর্থ ভারতবর্ষকে তিনি পরিপূর্ণ ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করা জায়েজ। অন্যদিকে শিবলি নৌমানি তার আওরঙ্গজেব আলমগীর পার এক নাজার বইয়ে বলেন, ‘ইসলামের প্রতি আওরঙ্গজেবের আবেগ দেখে বোঝা যায়, তিনি ধার্মিকের চেয়ে রাজনীতিক ছিলেন বেশি।’ যে বিষয়ে ওই দুই পক্ষের ইতিহাসবিদরা তর্কে লিপ্ত হন না, তা হলো ইসলামের প্রতি আওরঙ্গজেবের আনুগত্য। ১৬৫৯ সালে সিংহাসনে দ্বিতীয়বারের মতো অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সম্রাট আওরঙ্গজেব মদ্যপান, জুয়া খেলা ও পতিতাবৃত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। একই সঙ্গে ইসলামিক আইনে বলা নেই এমন বেশ কয়েকটি করও বাতিল করেন তিনি। আকবর যে জিজিয়া কর রদ করেছিলেন, তা পুনরায় অমুসলমানদের ওপর আরোপ করেন আওরঙ্গজেব। তার বেড়ে ওঠা ও সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে জটিলতা তার ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণ বলে মনে করেন একাংশের ইতিহাসবিদরা। তার বাবা সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে আওরঙ্গজেব ও তার তিন ভাইয়ের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে বড় ভাই দারা শিকোর সঙ্গে আওরঙ্গজেবের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল প্রকট। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি প্রকাশ্যে সমর্থন করতেন দারা শিকো। শাহজাহান চেয়েছিলেন, দারা শিকো তার উত্তরাধিকার হোক। বাবার ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি আওরঙ্গজেব। সিংহাসনের জন্য দারা শিকোসহ তিন ভাইয়ের সঙ্গে ভয়াবহ লড়াই বাধে তার। লড়াইয়ের একপর্যায়ে তিন ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন আওরঙ্গজেব এবং শাহজাহানকে কারাগারে পাঠান। জীবনের শেষ সাতটি বছর কারাগারে থেকে মৃত্যুবরণ করেন শাহজাহান।                     

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসবিদ ইয়ান কপল্যান্ডের ভাষ্য, বাবা ও ভাইয়ের প্রতি আওরঙ্গজেবের পাশবিক আচরণের জেরে তার সিংহাসনে বসার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি এমন বেশ কয়েকটি নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, যেগুলো ভারতবর্ষের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাদের সন্তুষ্ট করে। ওই নেতাদের সমর্থন পেতে মরিয়া ছিলেন আওরঙ্গজেব কারণ তারাই তার ক্ষমতা ধরে রাখার মাধ্যম ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান হিস্টোরি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রাশকে জানান, আওরঙ্গজেবের বড় ভাই দারা শিকো ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষের মানুষ। আওরঙ্গজেব চাননি মানুষ তার ও দারা শিকোর চিন্তা-ভাবনার মধ্যে মিল খুঁজে পাক। বড় ভাইয়ের চিন্তাচেতনা তাকে প্রভাবিত করেছে বা তিনি বড় ভাইয়ের নীতি অনুসরণ করেছেন, এমনটা শুনতে রাজি ছিলেন না আওরঙ্গজেব। এ কারণে ধর্মীয় বিষয়ে আওরঙ্গজেবের অবস্থান ছিল দারা শিকোর একেবারে বিপরীত। এটাই তার ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণ বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। সম্রাট আওরঙ্গজেবের এই গোঁড়ামি ছিল রাজনীতির উপজাত, ধর্মের নয়।       

ভারত-পাকিস্তানে দুই সম্রাট

ভারতীয় ইতিহাসবিদরা আকবরকে ন্যায়নিষ্ঠ শাসক হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ অনেক। তারা যেমন অমুসলমানদের প্রতি আওরঙ্গজেবের নিষ্ঠুরতার সমালোচনা করেন, তেমনি বর্তমান সময়ের জিহাদিদের ওপর ওই মোগল সম্রাটের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন। এ ছাড়া মোগল সাম্রাজ্য পতনে অবদান রাখার জন্যও আওরঙ্গজেবকে দায়ী করা হয়। জওহরলাল নেহরু তার ডিস্কোভারি অব ইন্ডিয়া বইয়ে আওরঙ্গজেবকে ‘ধর্মান্ধ ও অত্যন্ত কঠোর নীতিপরায়ণ ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন, যিনি ‘ভারতীয় শাসক থেকে মুসলমান শাসক ছিলেন বেশি’। আওরঙ্গজেবকে ঘিরে নেহরুর ওই ন্যারেটিভ সাত দশকেও পরিবর্তন হয়নি। ২০২০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারানসি শহরে এক অনুষ্ঠানে আওরঙ্গজেবের ‘নৃশংসতা’ ও ‘ধর্মান্ধতা’ নিয়ে বক্তব্য দেন। পরে ২০২২ সালে শিখগুরু তেগ বাহাদুরের জন্মবার্ষিকীতে মোদি বলেছিলেন, ‘আওরঙ্গজেবের অত্যাচারী চিন্তার সামনে পাথরের মতো দণ্ডায়মান ছিলেন তেগ বাহাদুর।’ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৭৫ সালে শিখগুরু তেগ বাহাদুরের শিরñেদ করা হয়।     

পাকিস্তানে অবশ্য আওরঙ্গজেবকে একজন আদর্শ মুসলমান নেতার মূর্তরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সামনের সারির সমর্থক, রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে একজন জাতীয়তাবাদী ও ‘ভারতে মুসলমান জাতির প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে দেখেন। মওলানা আবুল আ’লা মওদুদীর মতো পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা আওরঙ্গজেবের ইসলামের প্রতি অঙ্গীকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রচনায় ওই সম্রাটের নীতি অনুসরণের আহ্বান জানান তারা। পাকিস্তানি পাঠ্যপুস্তকে আওরঙ্গজেবকে নয়, বরং আকবরকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করা হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসবিদ মুবারক আলী বলেন, ‘এই দুই সম্রাটকে যেভাবে পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরা হয় তা দেখে মনে হয়, ভালো ও মন্দকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাসবিদদের হাতে আকবর অপমানজনকভাবে পরাজিত। পাকিস্তানের পাঠ্যক্রমে আকবরকে ঠিক প্রত্যক্ষ নয়, অনেকটা পরোক্ষভাবে সুফি পণ্ডিত আহমেদ সিরহিন্দির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়,  ইসলামকে উদারভাবে দেখার দারা শিকোর মানসিকতা পাকিস্তানের শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির বাইরে খুব মানুষই জানেন। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক আওরঙ্গজেব দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আজকের পাকিস্তানে চরমপন্থার যে উত্থান হয়েছে, তার বীজ বপন করেছিলেন তিনি। জিয়াউল হকের শাসনামল থেকে আওরঙ্গজেবের ছবি পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের দেয়ালে টাঙানো শুরু হয়।      

আকবর ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন না, এই ধারণা মূলত আসে তার দ্বীন-ই-ইলাহি মতাদর্শ থেকে। আকবর তার প্রজাদের ওপর ওই মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আকবরের সমালোচকদের ভাষ্য, দ্বীন-ই-ইলাহির মাধ্যমে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে ইসলামকে একত্র করে আকবর ইসলামকে বিকৃত করতে চেয়েছিলেন। এটাই তার আল্লাহর প্রতি অনাস্থার প্রমাণ।

ইতিহাসবিদ মুবারক আলীর মতে, মোগল সাম্রাজ্য পতনে আকবরকে দায়ী শুরুতে করেছিলেন পাকিস্তানি ইতিহাসবিদ আই এইচ কুরেশি। মোগল শাসনকাঠামোয় আকবরের অমুসলমানদের অন্তর্ভুক্তির কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। এক নিবন্ধে কুরেশি বলেন, ‘আকবর শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি ব্যাপক পাল্টে দিয়েছিলেন। মুসলমানরা তখনো সমাজে প্রভাবশালী সম্প্রদায় ছিল। আকবর তার নীতির মাধ্যমে ধর্মকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিলেন যে, তার কারণে মুসলমানরা তাদের সেই প্রভাব ধরে রাখতে পারেনি।’ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আকবর ও আওরঙ্গজেব দুজনই মানুষের ভালোবাসা ও ঘৃণা দুটোই পান। আকবর ও আওরঙ্গজেবের সময় ভিন্ন ছিল, তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এক ছিল না। সেসব বিবেচনা না করে কেবল হিন্দু-মুসলমান বা ভারত-পাকিস্তান বা ধার্মিক-অধার্মিক এই বাইনারির মধ্যে থেকে তাদের মূল্যায়ন করা হলে ইতিহাসকে অতি সরলভাবে বিশ্লেষণ করা হয়ে যায়।