চিকিৎসাসেবায় নার্সদের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব যে কারণে আধুনিক নার্সিং পরিষেবার মহৎপ্রাণ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখতেই ১২ মে দিনটিকে আন্তর্জাতিক নার্স দিবস হিসেবে পালন করে আসছে, ১৯৭৪ সাল থেকে। কারণ সেই দিনেই, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, নার্সিং কোনো পেশা নয় সেবা। বলার অপেক্ষা রাখে না, নার্সিংসেবা স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। শুধু রোগীর সেবা নয়, তার মানসিক-পারিবারিক-সামাজিক বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় নার্সকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, একটি হাসপাতালে ডাক্তার এবং নার্সের অনুপাত হওয়ার কথা ১:৩। এর মানে হচ্ছে, রোগীর সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে একজন চিকিৎসকের জন্য ৩ জন নার্স প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক এবং নার্সের অনুপাত ভয়াবহ রকমের আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। এখানে চিকিৎসক এবং নার্সের অনুপাত ১:০৩! এর মানে হচ্ছে, একজন চিকিৎসকের জন্য একজন নার্সও নেই।
গতকাল দেশ রূপান্তরের শেষ পাতায় প্রকাশিত ‘দেশে প্রয়োজনের ২২% নার্স’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নার্স সংকটের করুণ চিত্র। একই সঙ্গে দেশের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যচিত্রও চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, রোগীদের সঠিক চিকিৎসাসেবা দিতে হলে এ মুহূর্তে বাংলাদেশে নার্স দরকার ৩ লাখ ৬০ হাজার জন। কিন্তু আছে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মাত্র ৭৭ হাজার ৮৩৮ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের মাত্র ২২ শতাংশ নার্স আছে দেশে।
অথচ গত ১২ বছরে নার্স ঘাটতি পূরণে দেশে আনুপাতিক হারে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে সরকারি চিকিৎসক অনুপাতে নার্স নিয়োগ পেয়েছে প্রয়োজনের মাত্র ৫২ শতাংশ। ফলে দেশের সরকারি হাসপাতালে এখন নার্সের চেয়ে চিকিৎসকের সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ সরকারিভাবে প্রয়োজনের মাত্র ৪১ শতাংশ নার্স রয়েছেন। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল এবং নার্সদের পেশাজীবী সংগঠনের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. শেখ দাউদ আদনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে যে নার্স ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, এ সংকট সরকার তৈরি করেনি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করেছে। কতজন ডাক্তার ও নার্স পড়ালে ডাক্তার-নার্স অনুপাত ঠিক থাকবে, সরকার সে অনুযায়ী মেডিকেল কলেজ ও নার্স ইনস্টিটিউট তৈরি করেছে এবং আসন বরাদ্দ রেখেছে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ডাক্তার ও নার্সদের অনুপাত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি। ফলে ডাক্তার ও নার্স প্রায় সমান সমান হয়ে গেছে। সরকারের গত ১২ বছরের চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের পরিসংখ্যান বলছে, এ সময় চিকিৎসক অনুপাতে নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৫২ শতাংশ কম। অর্থাৎ এই ১২ বছরে চিকিৎসক নিয়োগ পেয়েছেন ২২ হাজার ও নার্স ৩৪ হাজার ৩৮২ জন। অথচ একজন চিকিৎসকের জন্য তিনজন নার্স অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যার তুলনায় নার্স দরকার ছিল ৬৬ হাজার। ৩১ হাজার ৬১৮ জন নার্স কম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে চিকিৎসক অনুপাতে ৫২ শতাংশ নার্স কম নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
এত কম নার্স দিয়ে রোগীকে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া কি সম্ভব? অতি দ্রুত ডাক্তার এবং নার্সের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
নার্সসংকট দূর করে, বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি আন্তরিকভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বিভিন্নরকম মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে রেখে উন্নত চিকিৎসাসেবা কখনই পাওয়া সম্ভব না। নার্সদের বিভিন্ন দাবি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগী কিন্তু ডাক্তার না, নার্সের কাছেই বেশি সময় পায়। সুতরাং নার্সের স্বার্থরক্ষা হলে, সাধারণ মানুষও উপকৃত হবে।