খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম গত ৯ মে ওয়াশিংটনে মারা গেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তার সঙ্গে প্রথমে ফোনে, পরে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি তাতে সাড়া দেন এবং ই-মেইলের মাধ্যমে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেন। সেই হিসেবে প্রয়াত এই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদের শেষ সাক্ষাৎকার এটি। এখানে তিনি তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, পাকিস্তান আমলে দ্বৈত অর্থনীতির তত্ত্ব, ছয় দফার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ, স্বাধীনতার পর প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছিলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অনিন্দ্য আরিফ।
দেশ রূপান্তর : আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়ন শেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন। পিএইচডি সম্পন্ন করার পর দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগ দিলেন। ঢাবিতে সেই সময়কার শিক্ষকতায় আপনার অভিজ্ঞতাটা জানতে চাই।
নুরুল ইসলাম : হার্ভার্ড থেকে অর্থনীতির ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন শেষে ১৯৫৫ সালের মধ্যভাগে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের রিডার (সহযোগী অধ্যাপক) হিসেবে যোগদান করি। অর্থনীতি বিভাগকে তখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রথমত, যোগ্য শিক্ষকের প্রচণ্ড অভাব। কারণ, বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, যারা হিন্দু ছিলেন তারা ১৯৪৭ সাল এবং তার পরপরেই ভারতে চলে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, পুরনো পাঠ্যসূচি, যেখানে অর্থনীতিবিষয়ক সাম্প্রতিক জ্ঞানের শাখাগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমার প্রথম কাজ ছিল পাঠ্যসূচিকে আধুনিকায়ন করা। আমি সেটা ব্যাপক আকারেই করেছিলাম, বিশেষ করে অর্থনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে (ব্যাষ্টিক, সামষ্টিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য)। জ্যেষ্ঠ শিক্ষক না থাকায় বিএ সম্মান ও এমএ স্নাতকোত্তর উভয় শ্রেণিতেই প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা একটানা পড়াতে হতো। এর মধ্যেই আমাকে পাঠ্যসূচি আধুনিকায়নের কাজ করতে হয়েছিল।
এর সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হওয়াটা তখনকার দিনে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব বলে বিবেচিত হতো। শিক্ষকদের এসব গবেষণা প্রকাশের একটা জায়গা ছিল পাকিস্তান অর্থনৈতিক জার্নাল (পাকিস্তান ইকোনমিক জার্নাল)। পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতি এটা প্রকাশ করত। এর সম্পাদকীয় কার্যালয় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ।
দেশ রূপান্তর : এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হতাশাজনক মান নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
নুরুল ইসলাম : আমি দেশের যে খবর পাই, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমেছে। বলা যেতে পারে, সার্বিকভাবে দেশের শিক্ষার মান কমেছে। তবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক উচ্চমানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তারা বিদেশে গিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভালো শিক্ষক পেতে ভালো বেতন দিতে হবে। তাদের গবেষণার জন্য টাকা দিতে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন গবেষণার জন্য খুব কম টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য শুভ লক্ষণ নয় এবং তাতে এসব মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দেশে থাকতে চাইছেন না।
দেশ রূপান্তর : ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের সম্মেলনে আপনিসহ দশজন অর্থনীতিবিদ পাকিস্তানের দ্বৈত অর্থনীতিবাদের কথা প্রথম উপস্থাপন করেছিলেন। সেই সম্মেলনে আপনাদের প্রণয়ন করা প্রতিবেদনটি আপনার লেখা ‘মেকিং অব এ নেশন’ গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সময় আপনাদের এই দ্বৈত অর্থনীতির তত্ত্ব ঐতিহাসিক ছয় দফার অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি যদি সংক্ষেপে আমাদের সামনে বর্ণনা করতেন।
নুরুল ইসলাম : পাকিস্তানে যে দুটি অর্থনীতি বিরাজ করছে, এই ধারণা প্রথম তোলা হয় ১৯৫৬ সালে। পাকিস্তানের প্রথম খসড়া পঞ্চবার্ষিক (১৯৫৬-১৯৬০) পরিকল্পনার জন্য উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের বিশেষ সম্মেলনে এই ধারণাটি পেশ করা হয়। ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে ঢাকায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের বিশেষ প্রতিবেদনে এই ধারণার মূল দিকগুলো বিস্তৃত করা হয়, যে প্রতিবেদন ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনের কাছে পেশ করা হয়। পুরো প্রতিবেদনটি আমার বইটিতে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।
এর কিছুদিন পরেই দুই অর্থনীতির তত্ত্ব ও আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্যের ব্যাপারটি পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন ও গণপরিসরে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়, অর্থনৈতিক সাংবাদিক, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিস্তৃত যুক্তিতর্কসহ এই স্মারকলিপি ও তার সুপারিশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক-বিষয়ক গণআলোচনার মধ্যে স্থান করে নেয়।
পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই তখন এই প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতেন, তারা গণপরিসরে আমাদের লাইনের দুই অর্থনীতি তত্ত্বের নীতিগত ব্যঞ্জনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা চালিয়ে যান। পূর্ব পাকিস্তানের তেমন একটি গোষ্ঠী ছিল ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল প্রগ্রেস, যে দলে ছিলেন রেহমান সোবহান, কামাল হোসেন, মোশাররফ হোসেন প্রমুখ। তারা ১৯৬৬ সালে আমাদের প্রতিবেদন পেশের এক বছর পর দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডিসপ্যারিটি নামে একটি পুস্তিকা লেখেন। এর খসড়া করেছিলেন রেহমান সোবহান, তার মূল প্রতিপাদ্য আর আমাদের স্মারকলিপির মূল প্রতিপাদ্য একই ছিল।
এর মধ্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে তার পূর্ণাঙ্গ ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যে আন্দোলনের সঙ্গে তিনি ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপাদান যুক্ত ছিল, যেটা আমি আগে বর্ণনা করেছি। এর মাধ্যমে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এক নড়বড়ে কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব করেন, যার মধ্যে আবার ভাঙনের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। এর পরেরটা তো ইতিহাস।
দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল কোন সময়ে?
নুরুল ইসলাম : তৎকালীন পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের গভর্নর এম রশিদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু আমার এসব কাজের কথা জানতে পেরেছিলেন। রশিদ সাহেব আমাকে জানান যে, তোমাকে একটু পূর্ব পাকিস্তানে যেতে হবে। সহযোগিতা করতে হবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। ১৯৬৯-এর মার্চে আমি করাচি থেকে একবার ঢাকায় এলাম। বঙ্গবন্ধু আমার সঙ্গে দেখা করলেন এক গোপন স্থানে। মজার ব্যাপার হলো, সেই গোপন স্থানটি একজন বিহারি সম্প্রদায়ের লোকের বাড়ি। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বঙ্গবন্ধু আমাকে জেরা করলেন। সন্তুষ্ট হওয়ার পরেই তিনি জানালেন পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে সংসদে নতুন সংবিধান প্রস্তাব করবেন। আমাকে ড. কামাল হোসেন, রেহমান সোবহান প্রমুখের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছয় দফাকে সেই নতুন সংবিধানের মূলে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করতে বললেন। তার ধারণা যে, আগামী দিনে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে কঠিন বোঝাপড়া করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক নীতিমালা রচনা ও সেসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করার জন্য তার যে টিম রয়েছে, আমি যেন একজন সদস্য হিসেবে তাতে যোগ দিই। আমি তার আহ্বানে সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ্বাস দিই।
দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
নুরুল ইসলাম : আমাকে এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, একজন বড় নেতার গুণ কী? তার উত্তরে আমি বলব, যেকোনো বিষয়ে একটা সামষ্টিক ধারণা থাকা এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই রকম বড়মাপের নেতা।
দেশ রূপান্তর : আপনার মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা যদি সংক্ষেপে বলতেন।
নুরুল ইসলাম : ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর আমি আগরতলা হয়ে দিল্লিতে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে শুনতে পাই, তাজউদ্দীন আহমদ কলকাতায়। প্রধানমন্ত্রীর সচিব পিএন ধরের সহায়তায় এরপর আমি আমেরিকায় চলে যাই। সেখানকার ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ পাই। তখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখা শুরু করি। সে সময় নিক্সন প্রশাসন প্রচণ্ডভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও শিক্ষাবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন পেয়েছিলাম আমরা।
দেশ রূপান্তর : এরপর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তেফা দিয়ে দেশে ফিরে এলেন কেন?
নুরুল ইসলাম : আমি ১৬ ডিসেম্বরের পর ছুটি নিয়ে দেশে ফিরি। দেশে ফিরে চট্টগ্রামে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করি। সেই সময় ঢাকায় আসতেই শুনতে পেলাম, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। তখন ভাবলাম, ‘দেখা করে যাই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘লন্ডনেই আপনার খোঁজ করেছি। আপনাকে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব নিতে হবে। কীভাবে করবেন, কাদের নিয়ে করবেন, তার একটি রূপরেখা দিন।’
বঙ্গবন্ধুর কথায় আমি কাজে লেগে পড়লাম। কমিশনের সদস্য হিসেবে যাদের নাম দিলাম, বঙ্গবন্ধু তা মেনে নিলেন। একটি নতুন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ খুবই কঠিন কাজ হলেও সানন্দে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।
দেশ রূপান্তর : এরপর ১৯৭৫ সালের প্রথমদিকে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব এক রকম ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আবার চলে গেলেন কেন?
নুরুল ইসলাম : পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব পালনকালেই সরকারের সমর্থক ও বিরোধী উভয় শ্রেণির পত্রিকায় আমাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করল। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, জাতীয় নীতি গ্রহণে আমাদের গুরুত্ব থাকছে না। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, পরিকল্পনা কমিশন ত্যাগ করব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সে কথা সরাসরি বললাম না। বললাম, কিছুদিনের জন্য ছুটি চাই। তিনি প্রথমে রাজি হলেন না, পরে আমার পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন। বললেন, ‘এক বছর পর আপনাকে ফিরে আসতে হবে।’ সেটি ১৯৭৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের ঘটনা। এরপর তো ১৫ আগস্ট বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন। আমার আর দেশে ফেরা হলো না।
দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আপনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এখন বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতির সুপারিশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক উত্তরণকে কীভাবে দেখছেন?
নুরুল ইসলাম : এখানে আমার মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো অ-কৃষি খাতের অর্জন। এ ক্ষেত্রে ব্র্যাক বা গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আছে। শিক্ষার প্রসার, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তারে তারা ভালো ভূমিকা রেখেছে। বাজার প্রসারের সম্ভাবনার যে ইঙ্গিত এসেছে তাতে কৃষকরা খুব ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য দুটো জিনিস এ পর্যন্ত ভূমিকা রেখে আসছে তার একটি হলো বৈদেশিক আয়, আরেকটি রপ্তানি। যদিও এই রপ্তানি এখন পর্যন্ত মূলত একটি পণ্যে নির্ভর করে আছে। এই খাতে শ্রম কম দক্ষ, নারীদের শ্রমই সিংহভাগ। একটি উন্নয়নশীল দেশে এটি একটি লক্ষণীয় ঘটনা। এসব আয় এসেছে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর হাত দিয়ে। এর ফলে গ্রামীণ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। প্রথম প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যয় করার ক্ষমতায়। প্রভাব পড়েছে অবকাঠামো নির্মাণে ও অকৃষিজ কার্যক্রম, অর্থাৎ ব্যবসা ও ক্ষুদ্রশিল্পে। এর জন্য দরকার ছিল বাজারের অভিগম্যতা আর গ্রামীণ অবকাঠামো। একে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অগ্রগতির এক নতুন অবস্থা বলা যায়।
দেশ রূপান্তর : আপনি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশের সব খবর রাখার চেষ্টা করেন বলে আমরা জানি। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নে আপনার নেতৃত্ব ছিল। এখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আলোকে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। পরবর্তী পরিকল্পনাগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
নুরুল ইসলাম : আমার মতে, পঞ্চবার্ষিক, দ্বিবার্ষিক কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমরা যা-ই করি না কেন, এগুলো হলো একটি দেশের উন্নয়ননীতি তৈরির কাঠামো বা ব্যবস্থা। এর ওপর দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি নির্ভর করে না, নির্ভর করে সেই নীতি বাস্তবায়নের ওপর। আপনি যত ভালো নীতিই গ্রহণ করুন না কেন, বাস্তবায়ন করতে না পারলে কাজ হবে না। সে কারণে প্রথমেই ঠিক করতে হবে একটি পরিকল্পনায় কী কী নীতি থাকা প্রয়োজন, সেসব বাস্তবায়ন সম্ভব কি না এবং নীতিগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না। এটা মেনে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটাই সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ এখন অদূর ভবিষ্যতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে আছে। আপনি এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
নুরুল ইসলাম : আমাদের মনে রাখতে হবে, যে আয় হলে একটি দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে, সেটা কিন্তু পরিবর্তিত হয়। তাই বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের মধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়, তাহলে তার প্রধান উদ্দেশ্যই হবে আয় বাড়ানো। আমাদের প্রবৃদ্ধির আকার ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। সেটাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
দেশ রূপান্তর : আগামীতে কেমন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেন?
নুরুল ইসলাম : প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের উন্নতি হচ্ছে। তবে অনেকেই বলবেন, আরও হতে পারত। এ নিয়ে আক্ষেপ বা দুঃখবোধ থাকতে পারে। আমি আশাবাদী। আমরা যদি লক্ষ্যে স্থির থাকি, আমাদের নীতি যদি সঠিক হয়, তাহলে উন্নতি হবেই। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দারিদ্র্য তো কমেছে। তবে এ সাফল্যের পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক দুনিয়ায় যেসব দেশ দ্রুত উন্নতি লাভ করছে, সেসব দেশেও বৈষম্য বেড়েছে। বৈষম্য বেড়েছে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রেও।
কিন্তু আমাদের এই বৈষম্য হ্রাসের বিষয়ে ভাবাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ লক্ষ্য রাখা উচিত আয়ের অতি-বৈষম্যের প্রতি। আয়ের অতি-বৈষম্য পুঁজি বিদেশে স্থানান্তরের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশে বিনিয়োগের যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবেশ ও প্রণোদনা আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্য মূলত একটি রাজনৈতিক সমস্যা। আমার মতে, এর ফলে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি করার জন্য স্বাধীন, নিখুঁত ও পক্ষপাতহীন উপাত্তের প্রয়োজন। সঙ্গে চাই অরাজনৈতিক বিশ্লেষণ। তা না হলে অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি করা অসম্ভব। তা নিশ্চিত করতে পারলে রাজনীতিবিদরা আজ পার পেয়ে গেলেও আগামী দিনে তাদের ব্যর্থতার জন্য দোষের ভাগী হবেন। আর গবেষকদের উচিত রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারেন এমন ভাষায় তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা। রাজনীতিবিদদের ভাষা গবেষকদের বুঝতে-শিখতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এ ক্ষেত্রে আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে?
নুরুল ইসলাম : আমার পরামর্শ হলো, প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নীতি প্রণয়ন, সমন্বয় ও বাস্তবায়ন করবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণমান বাড়ানো হবে প্রথম কাজ। দ্বিতীয় কাজটি হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষের মধ্যে এই ধারণাটি পাকাপোক্ত করতে হবে যে, দেশে আইনের শাসন রয়েছে। তাহলেই কাক্সিক্ষত অগ্রগতির দিকে বাংলাদেশের অভিযাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
নুরুল ইসলাম : আপনাকেও ধন্যবাদ।