পাকিস্তানে গ্রেপ্তার হয়েছে গণতন্ত্র

পাকিস্তানে যুদ্ধক্ষেত্র দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ চলছে সামরিক বাহিনী, সরকার, ক্ষমতাসীন দল এবং জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতা নিয়ে। জনগণ গণতন্ত্র বলতে যা বোঝে আর কি। প্রশ্ন উঠেছে এ কি শুধু দেশীয় অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিক্রি হওয়া ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে জনগণের যুদ্ধ? নাকি এ-যুদ্ধ আরও বড়? এ কি শুধু দেশবাসীর অস্থিরতা, নাকি আমরা বৈশ্বিক খেলোয়াড়দের প্রক্সি যুদ্ধের শিকার?

কেননা, আজ আমরা পাকিস্তানে যা দেখছি তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় সারা বিশ্বে এমন ঘটছে। প্রতিবেশী ইরানে ২০১৭ সালের নির্বাচনে ৮০টি শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা ইসলামপন্থি শাসনের বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশপন্থি প্রয়াত রাজা পেহলেভির পক্ষে ‘রেজা শাহ, আপনার আত্মা শান্তি পাক’ বলে সেøাগান দিয়েছিল। খামেনি তখন পশ্চিমাদের দিকে ইঙ্গিত করে অশান্তির জন্য ‘শত্রুদের’ দোষারোপ করেছেন। বলেছেন তারা অর্থ, অস্ত্র, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা যন্ত্র ব্যবহার করে সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এরপর থেকেই সরকারবিরোধী ‘হিজাব-বিক্ষোভের’ মুখে পড়ে ইরান।

ইরানে পশ্চিমাদের শত্রুতার বিষয় হলো ইসলামি শাসন, কিন্তু পাকিস্তানে সরকার তো পশ্চিমপন্থি, সুতরাং এখানে ‘সমস্যা’ জনগণ। আর জনগণ সমস্যা বলেই একে ভিন্নভাবে নিতে হচ্ছে বা ভাবতে হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কাকে দেখুন। চীনের সঙ্গে শাসকদের ঘনিষ্ঠতা কেন বাড়ছেতাই বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম দিয়ে জনগণের মধ্যে বর্ণিল বিপ্লব (পূর্ব ইউরোপের কালার রেভ্যুলুশনের মতো) ছড়ানো হলো। পাকিস্তানে যে আইনজীবীদের বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছিল, সেটাও রঙ-বিপ্লব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। স্নায়ুযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্রের ফসল এমন বর্ণিল বিপ্লব আজকাল প্রায়ই দেখা দেয়।

অন্যান্য দেশেও পশ্চিমাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অহরহ ঘটনা। কোনো সরকার অপছন্দ হলে বর্ণিল (ছদ্ম) বিপ্লব ঘটিয়ে বদলানো এবং জনগণের কণ্ঠস্বরের আড়ালে পছন্দের শাসককে ক্ষমতায় বসাতে সর্বাত্মক সহায়তা করা একের পর এক দেশে এমন অগণতান্ত্রিক নাটক চলছে। লোকজন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে গণতান্ত্রিক অধিকার ফলায় এবং আশপাশের দেশগুলোতে কী ঘটছে সে সম্পর্কে খবর রাখে না। কারণ ইতিহাস ও দূরত্ব প্রকৃত ঘটনা তাদের বিস্মৃত করে দেয়।

পশ্চিমারা কোনো নেতাকে অপছন্দ করলে রেড-লাইনের তোয়াক্কা করে না। ভেনিজুয়েলায় দেখুন। ২০১৯ সালে রাষ্ট্রপতি মাদুরো গণরায়ে জয়লাভ করেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা তাকে বৈধ মানতে অস্বীকার করে, ফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ব্যাপক নিন্দামন্দ হতে থাকে। পরে পশ্চিমারা হুয়ান গুয়াইদো নামের এক অচেনা সংসদ সদস্যকে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। অল্পসময়ের ব্যবধানে যাকে স্বীকৃতি দিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ভেনিজুয়েলার সুপ্রিম ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তী তিন বছর ভেনিজুয়েলা রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়েছে যা জনগণকে তো বিভক্ত করেছেই, দেশটিকেও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যাক, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ফিরে আসি। দেশটির এই পরিস্থিতিকে অর্থাৎ ইমরান খানকে গ্রেপ্তারে জনরোষ, জামিন ও এ সংক্রান্ত ঘটনায় উদ্ভূত ঘটনাবলিকে উল্লিখিত বর্ণিল বিপ্লবে আখ্যায়িত করার আগে আমাদের আরও ভাবতে হবে অথবা আরও অপেক্ষা করতে হবে।

আফগানিস্তানের নিকটবর্তী প্রতিবেশী হওয়ায় এমনিতে পাকিস্তানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ওই দেশে পরাশক্তিরা যায় তাদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। তো রুশ-আফগান যুদ্ধ এবং তারপরে মার্কিন আগ্রাসনের সময়ে পাকিস্তানকে ক্রমাগত পরাশক্তির চাপ এবং নিজের অস্তিত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। কৌশল খাটাতে হয়েছে যেন সুনাম অক্ষুন্ন রেখে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা হয় এবং আফগানিস্তানও কখনো আবার পাকিস্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত ‘ডু মোর’ চাপের মুখেও পাক-আফগান উভয়ের জন্য যা ভালো বলে মনে করেছে তা-ই করেছে পাকিস্তান।

অবশেষে দীর্ঘ ২০ বছরের মার্কিন আগ্রাসনের সমাপ্তি হয়েছে শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে। অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাঙ্ক, কপ্টার এবং তাদের দুই দশকের দেশবিরোধী মিত্র আফগানদের রেখে মধ্যরাতে মার্কিন বাহিনী বিব্রতকরভাবে পলায়ন করেছে। এই পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না যুক্তরাষ্ট্র। শত্রুতায় তারা কখনো পিছপা হয় না, বরং বারবার আঘাত করে। তারা মনে করে, সবকিছু হয়েছে পাকিস্তানের দোষে। তাই তারা পাকিস্তানে শাসক পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছে। এটা কোনো বিরাট বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং এটাই তাদের কমন প্র্যাকটিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে খুব কম বছর গেছে, যে-সময়ে তারা বিশ্বের কোথাও না কোথাও এই ফর্মুলা ব্যবহারের চেষ্টা করেনি।

তারপরও যারা মনে করেন যে, পাকিস্তান কিংবা যে-কোনো দেশ মুক্তভাবে বাস করতে পারে, দেশ চালানো জনগণের নিজস্ব কাজ এবং তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, আঞ্চলিক ক্ষমতাধর বা বিশ্বের কারোর কিছুই করার নেই তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন।

আমরা একটি বিশ্ব-গ্রামে বাস করছি, যাতে ভালোর চেয়ে খারাপ অনেক বেশি। শুধু সামরিক হস্তক্ষেপের চাপ নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও এখানে কমন। জন পারকিনসের কথা স্মরণ করা যায়, যিনি ২০০৪ সালে ‘অর্থনৈতিক আগ্রাসী’ বাহিনী সম্পর্কে লিখেছেন, “তারা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতারণা করে। তাদের সরঞ্জাম থাকে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন, কারচুপির নির্বাচন, ঘুষ প্রদান, চাঁদাবাজি, যৌনতা এবং হত্যা। তারা গেম খেলে পুরনো দিনের রাজাদের মতো, কিন্তু বিশ্বায়নের এই সময়ে তা নতুন ও ভয়ংকর মাত্রা গ্রহণ করেছে।” সহজ কথায় তারা বিভিন্ন গোষ্ঠী, সংস্থা, রাজনীতিবিদদের ঘুষ, প্রলোভন ও হুমকির মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি করে। শেষ পর্যন্ত আনুগত্য, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থের মতো লোভনীয় যা আছে, সব বিক্রি হয়ে যায়।

আসলে সাধারণের জন্য, অসচেতন নিরীহ লোকদের জন্য একটি সাধারণ জগৎ রয়েছে, যেখানে আপনি-আমি প্রতিদিন বাস করি। আরেকটি সুপার-জগৎ রয়েছে যেখানে সমাজের উচ্চস্তরের লোকেরা বাস করেন। এই স্তরের লোকেরা আমাদের সমাজে বাস করেন বটে, ব্যবসা করেন তারা এবং সাফল্যও শেয়ার করেন, কিন্তু সাদা চোখে তাদের দেখা যায় না। তাদের সঞ্চিত প্রচুর মুনাফা বাকি মানবদের থেকে তাদের সম্পূর্ণ অসম করে তোলে। তাদের উদ্বৃত্ত লভ্যাংশ সুদূরের ট্যাক্স-হেভেনে জমা হয় যারা বোকার স্বর্গে বাস করছে, তাদের থেকে দূরে কারণ বোকারা বিপজ্জনক, কারণ তারা ‘গণতন্ত্র’, ‘সমতা’ ও ‘স্বাধীনতা’ ধারণার মতো আফিমে অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন।

কিন্তু হঠাৎ করে কী হলো? পাকিস্তানের বোকা জনসাধারণ কি এই আফিম থেকে জেগে উঠছে, যা তাদের চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে খাওয়ানো হয়েছিল?

পাকিস্তানের দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন থেকে ভাষান্তর করেছেন মনযূরুল হক।

লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

globaltab.net এর নিয়মিত লেখক