পাকিস্তানের বিভক্ত রাজনীতিতে মার্কিন ভূমিকা

সংঘাত-সহিংসতা পাকিস্তানে নতুন কোনো ব্যাপার নয়। জন্ম থেকেই জ্বলছে দেশটি। কালেভদ্রে পাকিস্তানে কোনো সরকার তার মেয়াদ শেষ করার সুযোগ পায় না। ইমরান খানও পাননি। তিনি ক্ষমতা হারালেন প্রথম; তারপর হলেন গ্রেপ্তার। অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ইমরান খান। আগাম নির্বাচনের দাবিতে শাহবাজ শরিফের সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছিলেন তিনি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের খেলা চলছিল। এতে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকেই ছিল চীনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধকালে আমেরিকান বলয়ে ছিল ইসলামাবাদ। নব্বইয়ের দশকে এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গঠনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর জুনিয়র জর্জ বুশের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফের সরকার আমেরিকাকে সব ধরনের সহযোগিতা করলেও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগী হিসেবে ভারতকে প্রতিষ্ঠিত করে। আফগান সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা পরিষেবাসহ নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এক প্রকার ভারতের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অন্তর্ঘাতী কাজে ভারত-মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের সংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে স্থান পায় পাকিস্তান। এসব কারণে পাকিস্তানের মার্কিনবিরোধী মনোভাব ডিপ স্টেটের গভীরে প্রোথিত হয়। আর দেশটির দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতে ইমরান খান গভীর ক্ষমতা বলয়ের সমর্থন পেয়ে তিন বছর আগে পাকিস্তানে সরকার গঠন করেন। কিন্তু পাকিস্তানের বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রক অবস্থানে নিতে পারেননি। তিনি যতই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন ততই তার বিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি বিশেষত মুসলিম লিগ নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি কাছাকাছি চলে আসে। এর সঙ্গে থাকে মওলানা ফজলুর রহমানের দল। পাকিস্তানের সরকার সর্বাত্মকভাবে চীন-রুশ অক্ষে চলে যাওয়ার ধারণা তৈরির পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা শক্তি ইসলামাবাদে সরকার পরিবর্তনের কলকাঠি নাড়তে শুরু করে। তাদের নেপথ্য সমর্থন বিভক্ত বিরোধী দলকে এক সারিতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ইমরান খান তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই আয়োজন সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সেটিকে সঠিকভাবে রক্ষা করতে পারেননি তিনি। এর ফলে এক এক করে পাকিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ তার হাতছাড়া হতে থাকে।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের ঝুঁকিতে পড়ে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক উন্নতির পক্ষেও ইমরান সরকারকে টেকাতে ভূমিকা রাখার মতো বাস্তব অবস্থা থাকেনি।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি থিঙ্কের ইন্দো-প্যাসিফিক সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক লিসা কার্টিস-ট্যাংক বলেছেন, ‘তালেবানের বাহক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের প্রয়োজন নেই। কাতার এখন অবশ্যই সেই ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান চায় তালেবানরা চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলো দমন করার জন্য আরও কিছু করুক এবং তারা এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে সহিংসতা ছড়াবে বলে আশঙ্কা করছে। ইমরান খান ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তান এবং বিশ্বে চীনের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। ৬০ বিলিয়ন ডলারের চায়না-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের দুটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের অধীনে চালু করা হয়েছিল, উভয়ই খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চায়।

আর ইমরান খানকে উৎখাতের জন্য পশ্চিমাদের প্রধান যুক্তি হলো তিনি অতি বেশি চীননির্ভর হয়ে পড়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা শেহবাজ শরিফ পূর্বাঞ্চলীয় পাঞ্জাব প্রদেশের নেতা হিসেবে সরাসরি চীনের সঙ্গে চুক্তি করেন এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো নিজ প্রদেশে নেওয়ার জন্য তার খ্যাতি রয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে তার প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। তিনি অবশ্য বলেছেন, ভিক্ষুকের পররাষ্ট্র সম্পর্কে পছন্দ অপছন্দ থাকা উচিত নয়।

এবারের রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে ইমরান খান বেশি দায়ী করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অগ্রাধিকার হওয়ার সম্ভাবনা কম, যদি না এটি ভারতের সঙ্গে ব্যাপক অস্থিরতা বা ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে পরিচালিত করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ড. কার্টিস বলেছেন, যেহেতু সামরিক বাহিনী সেই নীতিগুলোর ওপর দৃষ্টি রাখে যেগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সত্যই চিন্তার কারণ হয়, যেমন আফগানিস্তান, ভারত এবং পারমাণবিক অস্ত্র। ফলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমরান খানের মস্কো সফর মার্কিন সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিপর্যয় ছিল এবং ইসলামাবাদে একটি নতুন সরকার অন্তত কিছু মাত্রায় সম্পর্ক সংশোধন করতে সহায়তা করতে পারে। ইমরান খানও বলেছিলেন, সাম্প্রতিক মস্কো সফরের কারণে ওয়াশিংটন তাকে অপসারণ করতে চেয়েছিল। তিনি হুমকির চিঠি পাঠানো মার্কিন কর্মকর্তার নামও প্রকাশ করেছিলেন। তিনি জানান যে, দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি অব স্টেট ডোনাল্ড লু থেকে হুমকিমূলক বার্তা পাওয়া গেছে।

ডোনাল্ড লু হিন্দুস্তান টাইমসের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে, হুমকিপূর্ণ বার্তা বিতর্ক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকার করেন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং হোয়াইট হাউজ একসঙ্গে ইমরান খানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।

অন্যদিকে, গ্রেপ্তার ও জামিন পরিস্থিতির পর ইমরানের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পাকিস্তানে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পেলে সম্ভাব্য নির্বাচনে ইমরান খানের ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে। এক জরিপে বলা হয়েছে, বর্তমানে ৫৪ ভাগ পাকিস্তানি ইমরান খানকে সমর্থন করেন। ভারতের রাশিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ায় পাকিস্তানের গুরুত্ব পশ্চিমা বলয়ে কিছুটা বেড়েছে। সেনাপ্রধানের ইউক্রেন আগ্রাসনের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য সে সম্পর্ক আরও বাড়াতে পারে। তবে দেশটির গভীর ক্ষমতা বলয় ইমরান খানকে আবার ক্ষমতায় ফেরাতে চায় কি না সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। ইসলামাবাদ হাইকোর্ট থেকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা বেআইনি ঘোষণা করে তাকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

পাকিস্তানের বর্তমান সংকটকে নজিরবিহীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোথি। ইমরান খানের গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, পুরোটাই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পতন। বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে অসহনীয়। দেশের মানুষ এমনটি কখনো চায়নি। এ অবস্থা আর থাকতে পারে না। অবশ্যই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। তবে এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে পাকিস্তানকে তাদের দেশ ও জাতিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com