বিশ্বকাপ প্রতিপক্ষদের বাংলাদেশের বার্তা

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ ওয়ানডের সিরিজ ২-০তে জিতে তৃতীয় স্থান নিয়ে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ সুপার লিগ বা ২০২৩ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শেষ করল বাংলাদেশ।  সিরিজের প্রথম ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়াতে বাংলাদেশের বোলারদের বোলিংয়ের সুযোগ খানিকটা কমলেও ব্যাটসম্যানরা ৩ ইনিংসেই ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন। সুযোগটা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ৩ ইনিংসে তার সংগ্রহ ১৯৬ রান, যদিও তার চেয়ে ১০ রান বেশি করে হ্যারি টেক্টর সিরিজের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ৩ ইনিংসে ৫ উইকেট হাসান মাহমুদের, মোস্তাফিজুর রহমান ১ ম্যাচ খেলেই নিয়েছেন ৪ উইকেট। আইরিশ বোলার মার্ক অ্যাডাইর ৭ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি, যদিও তার দল জেতেনি কোনো ম্যাচ।

বাংলাদেশের প্রথাগত পারফরমারদের বাইরে শান্ত বা হাসানের মতো তরুণ ক্রিকেটারদের ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলাটাই এই সফরের বড় প্রাপ্তি হিসেবে মনে করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। সাবেক কোচ ও বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম, সাবেক অধিনায়ক এবং বিপিএল দল সিলেট স্ট্রাইকারসের কোচ রাজিন সালেহ এবং সাবেক পেসার ও বিপিএল দল রংপুর রাইডার্সের পেস বোলিং কোচ তারেক আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে। তাদের কথার সুর মোটামুটি একই। শান্ত’র নিজেকে ফিরে পাওয়া আর হাসান মাহমুদের চাপের মুখে অবিচল থাকাটাই দুটো ম্যাচে বাংলাদেশকে দেখিয়েছে জয়ের পথ।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ব্যাট হাতে ভালো করা শান্ত, তাওহীদ হৃদয় এবং মুশফিকুর রহিম তিন জনই বিপিএল খেলেছেন সিলেট স্ট্রাইকার্সে। ইংল্যান্ডে বসবাসরত বেশিরভাগ বাংলাদেশিই সিলেট অঞ্চলের, সেই জন্যই হয়তো তিনজন ছিলেন বেশি উজ্জীবিত! সিলেট স্ট্রাইকার্সের কোচের দায়িত্ব পালন করা রাজিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আয়ারল্যান্ড যখন বাংলাদেশে এসেছিল তখনো শান্ত বেশ ভালো করেছিল। ইংল্যান্ডে গিয়ে সে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভালো করেছে। সে আসলে এখন নিজের সামর্থ্যটা বুঝতে পেরেছে। তাকে কিন্তু অনেক খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন সে নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে  পেরেছে।’ হৃদয়ের ব্যাটিং নিয়ে রাজিন জানান, ‘বিপিএলের আগে তামিলনাড়ুতে বিসিবি একাদশের হয়ে খেলতে গিয়েছিল সে, আমি ছিলাম কোচিংয়ে। তখনই আমি তার সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। সে তার ব্যাটিংয়ের ধরনটা বদলাতে চাচ্ছিল তখন। তখন পাওয়ার হিটিং নিয়েও কাজ করেছি। এখন দেখেন সে বড় বড় ছয় মারছে।’

সিরিজে ১৪২ রান মুশফিকুর রহিমের। দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেছেন তিন ম্যাচেই, বেশিরভাগ সময়ে নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গেই তাকে উইকেটে থাকতে হয়েছে। মুশফিকও খেলেছেন সিলেটে, রাজিন কাছ থেকে দেখেছেন তার পরিবর্তনটা। রাজিন বলছিলেন, ‘মাশরাফী তাকে অনেকবার বলেছে বেশি চিন্তা না করতে। বলেছে-অনেক দিন হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছিস। এখন আর কী হবে? চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের খেলাটা খেল। সেই পরামর্শই কাজে দিয়েছে।’ মুশফিক দলে নতুন ভূমিকায় ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সাফল্য পাচ্ছেন। তাতে দলের ফলেও পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব।

সাবেক পেসার তারেক আজিজ বিপিএলে কাজ করেছেন হাসান মাহমুদের সঙ্গে। আয়ারল্যান্ড সফরে এই পেসারের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ তারেক, ‘ডেথ ওভারে ও খুব ভালো বল করেছে। ইয়র্কার দিতে পেরেছে। ওর ব্যাক অব দ্য হ্যান্ড ডেলিভারিটাও ভালো হচ্ছে। চাপের মুখে বোলিং করতে হয়েছে ওকে। খুব ভালো বোলিং করেছে।’ এবাদত হোসেন খুব বেশি উইকেট না পেলেও বলের গতি ও নিয়ন্ত্রণ ভালো লেগেছে তারেকের কাছে, ‘এবাদতের বোলিংয়েরও অনেক উন্নতি হয়েছে। ওর গতি, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ খুব ভালো। নতুন বলে সে ভালো বোলিং করেছে। তাসকিন (আহমেদ) দলে ফিরলে সে আর তাসকিন মিলে নতুন বলে দারুণ একটা জুটি হতে পারে।’

প্রথম দুম্যাচ খেলে ৩ উইকেট পাওয়া শরীফুল ইসলামকে বাদ দিয়ে শেষ ম্যাচ খেলানো হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে। এক ম্যাচেই ৪ উইকেট নিয়ে চার বছর পর ম্যাচ সেরা হন কাটার মাস্টার। তারেক মনে করেন, সমালোচনার জবাবই দিয়েছেন কাটার মাস্টার, ‘মোস্তাফিজ দেখিয়ে দিল কেন সে চ্যাম্পিয়ন বোলার। এভাবে ফিরে এসে সে পারফর্ম করে দেখাল যে সে ফুরিয়ে যায়নি।’ তবে উন্নতির জায়গাও দেখছেন তারেক। দ্বিতীয় ম্যাচে বেশ খরুচে বোলিং ছিল শরীফুল ইসলামের, এছাড়া মৃত্যুঞ্জয়ের আরেকটু সময় প্রয়োজন তৈরি হতে। শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মার খেলেও ফিরে আসার মানসিক দৃঢ়তাটা বাড়াতে হবে পেসারদের, সেটাই মনে করেন তারেক।

শেষ ওয়ানডের ব্যাটিং নিয়ে নিজের ফেসবুক পাতায় নাজমুল আবেদীন ফাহিমের বিশ্লেষণ, ‘রনি তালুকদার তার সুযোগটা হেলায় হারাল এবং একটা অতৃপ্তি নিয়েই তাকে দেশে ফিরতে হবে। তার এই ছোট্ট ইনিংসটার ভিডিও দেখলে সেও হয়তো নিজের ওপর অসন্তুষ্টই হবে। আশা করি ভবিষ্যতে রনি আবার সুযোগ পাবে এবং তার সদ্ব্যবহার করবে। তামিমকে ইনিংসের প্রথম দিকেই হারিয়ে ফেললে আমরা হয়তো বিপদে পড়ে যেতাম। এই ম্যচে এ কারণেই ওর স্ট্রাইক রেট নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোধহয় অনুচিত হবে। সত্যি বলতে তামিমের স্ট্রাইক রেট অন্তত এবার বেশ সন্তোষজনকই ছিল। এই ফরমেটে ওপর থেকে একজনকে লম্বা ইনিংস খেলতেই হবে। তামিম ছাড়া আমাদের বাকি সব ব্যাটারের মধ্যেই অতি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার প্রবণতা খুবই স্পষ্ট। ভালো ফর্ম একজন তরুণ খেলোয়াড়কে নিজের অজান্তেই অনেক সময় অতি আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। সে কারণেই যেমন সুযোগ থাকার পরও মিডল অর্ডারে ব্যক্তিগত বড় স্কোর হয়নি, পাশাপাশি উল্লেখ করার মতো পার্টনারশিপও আমরা পাইনি।’ এছাড়াও মোস্তাফিজের বোলিং নিয়ে ফাহিম বলেন, ‘এই ম্যাচে একটা বড় প্রাপ্তি মোস্তাফিজের বোলিং। তার সমসাময়িক ফর্মের বিচারে এই পারফরম্যান্স ছিল অবাক করার মতো। এই কন্ডিশন তার জন্য আদর্শ নয় বলেই আমরা জানি। এমন বিরূপ কন্ডিশনে এতটা ভালো বোলিং করতে ওকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একজন দ্রুতগতির বোলারের মধ্যে যে আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং তার পাশাপাশি গতি এবং স্কিল দিয়ে বিপক্ষ ব্যাটারদের কাবু করার তাগিদ থাকে তার সবটাই মুস্তাফিজের বোলিংয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি। কেবল মাত্র স্লোয়ার বা কাটারের ওপর নির্ভরতা আজ একেবারেই ছিল না। আশা করি সামনের দিনগুলোতেও মোস্তাফিজকে আমরা এভাবেই দেখতে পাব।’

হাসান মাহমুদের উইকেটপ্রাপ্তির পরও উচ্ছ্বাসহীন থাকার জন্য তাকে ফেয়ার প্লে পুরস্কার দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করেছেন ফাহিম, ‘আউট হয়ে যাওয়া ব্যাটারের জন্য হাসানের যে সহানুভূতি এবং পরবর্তী উচ্ছ্বাসহীন উদযাপন, শুধু এ কারণেই আইসিসির উচিত তাকে একটা বিশেষ ‘ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া। এই ধরনের আচরণ সবার জন্য অনুকরণীয় হতে পারে এবং তা শুধু ক্রিকেটেই নয় সব ক্ষেত্রেই। অত্যন্ত সংবেদনশীল, স্বল্প অভিজ্ঞ এবং তরুণ এই বোলার এর মধ্যেই অধিনায়কের ডান হাতে পরিণত হয়েছে। স্কিলের পাশাপাশি চাপের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখার এই বিরল সক্ষমতা তাকে নিশ্চয়ই অনেক দুর নিয়ে যাবে।’

স্নায়ুক্ষয়ী দুটো ম্যাচ জিতে সিরিজ নিজেদের করেছে বাংলাদেশ, এতে আত্মবিশ্বাসের পালে যেমন হাওয়া লেগেছে তেমনি বিশ্বকেও দেওয়া গেছে একটা বার্তা আইসিসি ওডিআই সুপার লিগের পয়েন্ট তালিকার তৃতীয় দলকে হেলাফেলা করা যাবে না বিশ্বকাপে!