তিতাসের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ক্যাবের

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে অবাধে নানা দুর্নীতি চলায় প্রতিষ্ঠানটি এখন ভোক্তার জন্য ‘মৃত্যুবাণ’ বলে অভিযোগ তুলেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনস অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে এ-সংক্রান্ত এক অভিযোগে বলা হয়েছে, মিটারযুক্ত গ্রাহক মাসে গড়ে ৫ শ টাকা বিল দিলেও মিটারবিহীন গ্রাহক বিল দেয় ১ হাজার ৮০ টাকা। এতে তিতাস বছরে প্রায় ২২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে লুণ্ঠন করছে। চুলাপ্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৬০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি কর্তৃক গণশুনানির ভিত্তিতে দুই চুলার জন্য মাসিক গ্যাস বিল ১ হাজার ৮০ টাকা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে নির্ধারিত গ্যাস পায় না গ্রাহক। তা সত্ত্বেও তিতাস ৬০ ঘন মিটারের পরিবর্তে চুলাপ্রতি ব্যবহৃত গ্যাসের পরিমাণ ৮৮ দশমিক ৪৪ ঘনমিটার নির্ধারণের জন্য এখন তৎপর।

ক্যাবের অভিযোগ, ২০১৫ সালে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের গণশুনানিতে তিতাসের বিরুদ্ধে কম গ্যাস দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ লুণ্ঠন, অবৈধ গ্যাস বাণিজ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস পাইপলাইন ব্যবহার, চাহিদার চেয়ে আয় বেশি হওয়ার পরও গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি বিতরণ চার্জ আদায়সহ নানা অভিযোগ উঠে। অভিযোগ আমলে নিয়ে তা সমাধানের জন্য তিতাসকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু তিতাস তা মানেনি। বিইআরসি আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলেও তিতাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ক্যাব মনে করে, তিতাসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বিইআরসির সদস্য হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বোর্ডে সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা থাকায় তিতাসের ব্যাপারে সবাই নির্বিকার। এতে তিতাস শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেই চলেছে। ফলে দেশের গ্যাস সম্পদ ও ভোক্তা লুণ্ঠনের শিকার, এবং ভোক্তার জীবন বিপন্ন। তিতাসকে নানা অবৈধ সুবিধাদি দেওয়ায় বিইআরসি নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

তিতাসের পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়নি উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগে বলা হয়, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ বছর পরও অধিকাংশ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের কারণে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত অর্থবছরে ঢাকায় ১ হাজার ৬৮২ কিলোমিটার পাইপলাইন জরিপ করে ৯ হাজার ৯২৬টি স্থানে ছিদ্রের উৎস পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৪৫৯টি ছিদ্র ধরা পড়ে ও মেরামত করা হয়। তবে গ্রাহকের বাসা পর্যন্ত জরিপ করা হয়নি।

ক্যাবের সিনিয়র সহ সভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের অভিযোগ, ২০১৫ সালে বিইআরসি কর্তৃক প্রিপেইড মিটার সংযোগের আদেশ হলেও বিগত ৭ বছরে মিটার সংযোগ হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬০০টি। গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার নষ্ট হলে নতুন মিটার দেওয়া হচ্ছে না। বিইআরসির আদেশ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দিচ্ছে না তিতাস।

অভিযোগে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সহায়তায় তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নিবন্ধিত ঠিকাদার মিলে একটি চক্র বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগ দেয়। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অবৈধ পাইপলাইন নির্মাণ এবং সংযোগ প্রদানে জড়িতরা সুরক্ষা পায়।

এতে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২১ সালে তিতাসের ৩০ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে তাদের একটি চিঠি দেয়। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য তিতাস কোন বিভাগীয় কার্যক্রমও গ্রহণ করেনি।

২০১৯ সালে তিতাসের দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্ত করে জ্বালানি বিভাগে প্রতিবেদন জমা দেয় দুদক। যেখানে ২২ পন্থায় তিতাস কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দুর্নীতি-অনিয়ম করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি দমনে জ্বালানি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তিতাসকে দুর্নীতিমুক্ত করতে ক্যাবের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার ঘটনা হত্যাকাণ্ড হিসেবে মামলা করতে হবে। তিতাস দুর্নীতিমুক্ত, অবৈধ সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ ও লাইন বিচ্ছিন্ন করা এবং গ্যাস ছিদ্র বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের সিস্টেম লস সুবিধা, বিনিয়োগকৃত মূলধনের ওপর মুনাফা ও বিতরণ চার্জ স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব।

তাদের অপর প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে, তিতাসের বোর্ড থেকে সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা প্রত্যাহার, বিইআরসির আইন অমান্য করার দায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া।

এসব প্রস্তাব কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তিতাস বোর্ডের সদস্যদের সিটিং অ্যালাউন্সসহ সব আর্থিক সুবিধা স্থগিত করা, বিইআরসিকে রেগুলেটর হিসেবে সক্রিয় হওয়া এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার একাধিকবার তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ্কে ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি।