কর্মতৎপর এক মহামনীষীর জীবন

ইসলামের খেদমতে আত্মনিবেদিত সুনাগরিক সৃষ্টির কাজে কর্মতৎপর এক মহামনীষী ছিলেন হজরত মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। নিজ প্রতিভা আর কর্মদক্ষতার সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি এর প্রমাণ রেখেছেন আমৃত্যু। ফলে তিনি সমকালে সচল ও প্রাণবন্ত একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন বিশেষভাবে।

প্রবীণ এ আলেম ১৯৪৫ সালের ৬ ডিসেম্বর সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলাধীন ডাকনাইল দক্ষিণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা ইছহাক (রহ.) একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং এলাকার মান্যবর ব্যক্তি হিসেবে সমসাময়িককালে ছিলেন সুখ্যাত। তিনি গাছবাড়ী ও আকুনী মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন। মাতা আজনূরী বেগম একজন পরহেজগার, পর্দানশিন ও গুণবতী মহিলা ছিলেন।

তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষক সামছুল হকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর মজাহিরুল উলুম (আকুনী) মাদ্রাসায় আলিয়া চাহারম পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন এবং সব পরীক্ষায় বৃত্তিলাভ করেন। তিনি কানাইঘাট দারুল উলুম মাদ্রাসায় আলিয়া পাঞ্জমে কিছুদিন এবং রানাপিং হোসাইনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় ১ বছর অধ্যয়ন করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ১ম বিভাগে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ৩ বছর ফেকাহ, মানতিক, তাফসির, আদব প্রভৃতির ওপর লেখাপড়া করেন। ১৯৬৯ সালে সেখানকার ৩শ’ ছাত্রের মধ্যে ১ম বিভাগে ১ম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন।

মাওলানা গাছবাড়ী (রহ.) ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জের দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম হোসাইনিয়া দরগাহপুর মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি ৪ বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ১৯৭৩ সালে সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাদ্রাসার মুহতামিম আকবর আলী (রহ.)-এর আহ্বানে সেখানে তিনি সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যান। ধারাবাহিকভাবে তিনি সেখানকার শায়খুল হাদিস পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০১৯ সালে দরগাহ মাদ্রাসার তৎকালীন মুহতামিম মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া (রহ.) ইন্তেকাল করলে তিনি মাদ্রাসার মুহতামিম নিযুক্ত হন। তিনি একাধারে জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসার মুফতি, শায়খুল হাদিস ও মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ-বিদেশে তার বহু ছাত্র ইলমে দ্বীনের খেদমতে রয়েছেন নিয়োজিত।

তিনি ১৯৭০ সালে শায়খুল আরবে ওয়াল আজম সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর খলিফা শায়খে কৌড়িয়া (রহ.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭৪ সালে স্বীয় পীরের কাছ থেকে এজাজতপ্রাপ্ত হন। তার একটি মৌলিক রচনা গ্রন্থ হচ্ছে- ‘আছবাক্বে তাজবীদ।’ এ গ্রন্থের মাধ্যমে ইলমে তাজবিদের জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি সুবিস্তার লাভ করেছে। তিনি বেশ কয়েকবার হজপালন করেছেন এবং ভারতের দেওবন্দ এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান সফর করেছেন।

মাওলানা গাছবাড়ী ১৯৭১ সালে গড়াই গ্রামের তবারক আলীর ৪র্থ কন্যা নজমুন্নাহারের সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। পারিবারিক জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক। তারা হলেন- ফারহানা বেগম, ইমরানা বেগম, সুলতানা বেগম, নাঈমা বেগম, হাফিজ মাওলানা এনামুল হক (জুনায়েদ), নাজমুল হক (জাহিদ), আনোয়ারুল হক (মাহফুজ)।

মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী (রহ.) ২০২৩ সালের ১৭ মে বুধবার সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। ১৮ মে বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় সিলেট শহরের শাহী ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন বড় ছেলে মাওলানা এনামুল হক জুনাইদ। জানাজা শেষে মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া (রহ.)-এর কবরের কাছে তাকে দাফন করা হয়।