ভালো কাজের হোটেল

ছেলেটির দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেই মনে হচ্ছিল সে সাবলীল নয়। একটু ভয়, একটু সংকোচ নিয়ে সবার শেষে দাঁড়িয়েছিল। দূরে, রাস্তার ওপারের এক মধ্যবয়সী নারীর সঙ্গে কথা বলছিল ইশরায়। নারীটি তাকে লাইনে মিশে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। দূরে দাঁড়ানো সেই নারীটি তার মা।

মার কথা শুনে, ছেলেটি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেও একটু দূরত্ব রাখে ঠিকই। দূরত্ব এবং ইতিউতি তাকানোই তাকে আলাদা করে রাখছিল। ছেলেটির নাম সোহেল। ফুলপ্যান্ট পরা থাকলেও শরীরের ওপরের অংশ খালি। সাত বছর বয়সী সোহেল সকাল থেকে কিছুই খায়নি। কাঁঠালবাগানের একটি খুপরিঘরে থাকে তারা।

লোকমুখে ‘ভালো কাজের হোটেলের’ কথা শুনে মা সোহেলকে নিয়ে এসেছেন। নিজে দূরে দাঁড়িয়ে ছেলের ওপর নজর রাখছিলেন। মা মনোয়ারা বেগমের মুখোমুখি হলে জানান, স্বামী ভ্যানে করে তরিতরকারি বিক্রি করেন। হঠাৎ তার ব্যবসা মন্দায় পড়েছে। তাই সংসারে টানাটানি। তার ওপর জিনিসপত্রের যে দাম! তাতে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। তাই ছেলেকে নিয়ে এসেছেন ‘ভালো কাজের হোটেলে’।

ছেলের সঙ্গে আপনিও তো খেতে পারতেন। মনোয়ারা বেগমের সরল স্বীকারোক্তি, ‘শরম লাগে, কোনো দিন লাইনে দাঁড়াইনি তো। ছেলেটাও দাঁড়াতে চায়নি। কিন্তু কী করব বলেন, পোলাপানের ক্ষুধা কি সহ্য হয়।’

গত শনিবার সোহেল আরও শতাধিক মানুষের সঙ্গে কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ পার্কে ‘ভালো কাজের হোটেলের’ সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। অস্থায়ী এ হোটেলের একপাশে সোনারগাঁও হোটেল অন্যপাশে সুন্দরবন। একটা ফাইভস্টার অন্যটি থ্রিস্টার। স্টারের ছড়াছড়ি থাকলেও সবই মøান ওই ‘ভালো কাজের হোটেলের’ কাছে।

এখানে অভুক্ত মানুষের লাইন, অস্থি-চর্মসার লিকলিকে মানুষগুলো খাবারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের চারপাশে এরা কারা? ক্ষুধা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলো কোথা থেকে আসে? এরা কি ফুটপাতে শুয়ে থাকা সেই মানুষটি? চলার পথে শুয়ে থেকে উটকো বাধার সৃষ্টি করে বলে আমরা ভ্রু কোঁচকাই? নগরজীবনে ঘরমোছা আর কাপড় কাচার মতো কায়িক শ্রমের কাজ করতে করতে যার শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে থাকে, তিনি কি সেই? যার রিকশায় চড়ে আমরা উদাস হয়ে আকাশের রঙ দেখি, এসব নিরন্ন মুখগুলো কি তাদের? আসলে ভবঘুরে, রোজগারপাতি বন্ধ, দিন আনি দিন খাই মানুষেরাই ভিড় জমায় ‘ভালো কাজের হোটেলে’।

কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুদানে নয়, নিজের গাঁটের কড়ি দিয়ে সব হারানো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন একজন মানুষ। পরে পাশে পেয়েছেন বন্ধুদের। এখন অনুসারী আছে। কিন্তু যখন শুরু করেছিলেন তখন তার অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না।

এমন জীবনবোধের সূত্রপাত কীভাবে? আচমকাই নাকি ভাবনাচিন্তা করে? মানুষের পাশে থাকার, কাজের মধ্য দিয়ে মানুষকে মনে রাখার বা মানুষের হাত ধরার চিরন্তন বার্তা তিনি কোথায় পেলেন?

আনন্দের চেয়েও গভীরতর এক সার্থক অনুভূতি প্রকাশ পায় ‘ভালো কাজের হোটেলের’ উদ্যোক্তা আরিফুর রহমানের কণ্ঠে।

হুমায়ূন আহমেদের ‘সবুজ ছায়া’ নাটক দেখে এ কার্যক্রম শুরু করতে উদ্দীপ্ত হন তিনি। যেখানে অভিনেতা জাহিদ হাসান প্রতিদিন একটা ভালো কাজ করতেন। সেটা দেখে আরিফুর রহমানও প্রতিদিন একটা ভালো কাজ করার চেষ্টা করতেন। ২০০৯ সাল থেকে আরও কিছু বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এ পথচলা শুরু। বন্ধ করেননি করোনা মহামারীর সময়ও।

এ পৃথিবী কলেরা মহামারী দেখেছে, প্লেগ দেখেছে, স্প্যানিশ ফ্লু দেখেছে। মৃত্যুর মিছিল থেমে গেছে প্রতিটি মহামারীর পর। নতুন শুরু দেখেছে পৃথিবী। করোনা মহামারীর দিশেহারা সময় পাড়ি দিয়ে স্বাভাবিক সময় এসেছে। মহামারীর সময় আবেগ থাকে, সবাই মিলে বাঁচার চেষ্টা থাকে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে এসে বোঝ যায় কে কার। যারা মহামারীর সময়ের মতোই নিজেকে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তাদের ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে...’। কিন্তু আরিফুর রহমানরা দেখতে পান। তাই তো ‘ভালো কাজের হোটেলের’ দেখা মেলে।

বাপের হোটেলে খাওয়া মানে বিনামূল্যে খাওয়া। বাপের হোটেল না হলেও ‘ভালো কাজের হোটেল’ আছে এ নগরে। তারা সত্যি সত্যিই বিনামূল্যে খাওয়ায়। এখানে খেতে টাকা লাগে না, যেকোনো একটি ভালো কাজ করলেই খাওয়া যায় পেট ভরে। অভুক্ত মানুষগুলো যাচ্ছে এবং পেট ভরে খেয়ে যাচ্ছে শুধু একটি ভালো কাজ করার কথা বলেই। আট-দশটা হোটেলের মতো এখানে চেয়ার, টেবিল কিংবা বিলের জানানো আওয়াজ নেই, নেই মাথার ওপর ছাদও। খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে বসেই দিব্যি আহার সেরে নেন অতিথিরা।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট পাঁচটি স্থানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেছে এ ‘ভালো কাজের হোটেল’। শনি থেকে বৃহস্পতিবার তারা ছুটে যান রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড়, গুলশান, বনানী এবং কমলাপুরে। প্রায় দুই হাজার সদস্য প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা দেন। তাদের ‘ডেইলি টেন মেম্বার’ বলা হয়। তাদের পাশাপাশি কিছু শুভাকাক্সক্ষীর সহযোগিতাও মেলে।

কারা দেন এসব চাঁদা? একজন দাতাকে পাওয়া গেল। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের রোজকার জীবনে শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই মশগুল থাকি। মনে রাখি না আমাদের ঘিরে থাকা মানুষদের কথা। অথচ নিজেদের মতো আনন্দে থাকার অধিকার এ পৃথিবীর সবার আছে। মহামারীতে ঘরে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা সবার আছে। সেই সময় আমি একটা বিষয় খেয়াল করে বিষাদগ্রস্ত হয়েছিলাম। সেটা হচ্ছে, ঘরে থাকা এমন অনেক জিনিস আছে যা আমি কিনেছিলাম কিন্তু কোনো দিন ব্যবহার করিনি। সেই জিনিসগুলো কখনোই সংসারের কোনো কাজে লাগেনি। এটা আমাদের মানসিকতার এক অদ্ভুত দিক। অনেক জায়গাতেই আমাদের ব্যয় প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে না। বরং আমাদের মনের গভীরে থাকা পণ্যরতির কারণেই আমরা ক্রেতা হই। মহামারীকে যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাহলে আমরা নিজেদের প্রয়োজন মতো কেনার মানসিকতা তৈরি হবে। আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই, সুখী থাকতে চাই। ভালো থাকা এবং সুখে থাকা আমাদের মনের ওপর নির্ভর করে। পণ্যরতিতে ডুবে না গিয়ে খরচ সীমিত করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোনো সমস্যা হয় না।’

নিজের বদলে যাওয়ার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেপথ্যের কাহিনি জানালেও নিজের নাম জানাতে রাজি হলেন না এই ‘ডেইলি টেন মেম্বার’।