কূটনীতির খেলা ভোটে চোখ

রাজনীতির মাঠে নিয়ন্ত্রণ থাকায় কোনো চাপে আওয়ামী লীগ বিচলিত নয়, এমন দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকলেও তাতে দুশ্চিন্তার কিছু দেখছেন না এমন দাবি করেন তারা। তাদের ভাষ্য, দুশ্চিন্তাহীন বলেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্ধিদ্বায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হলে তারা দেশ রূপান্তরের কাছে এসব দাবি করেন।

এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সমালোচনা নিয়ে রাজনীতিতে নানা আলোচনা-সমালোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ওই নেতারা দাবি করছেন যে, তারা এতে সংকট দেখছেন না। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।

সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্য কিংবা সংবাদ সম্মেলনে শুধু নয়, বিবিসির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারেও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা এসেছে। তিনি বলেছেন, দেশটি হয়তো আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এ ছাড়া একাধিকবার বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দেশের কাছ থেকে কিছু কিনবেন না। কিন্তু এ বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিনি কিনবে বাংলাদেশ, এমন খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

সরকারের এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সমালোচনা করে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য রাজনীতিরই আরেক কৌশল। তাতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটবে না।’ এ নেতা দাবি করেন, সমালোচনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপেও রাখা যাবে। তার দাবি, সমালোচনাও চলছে, ব্যবসাও চলবে।

১২ লাখ মেট্রিক টন চিনি আমদানির প্রসঙ্গ টেনে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা বলেছেন, কূটনীতিক সম্পর্ক যে অক্ষুণœ রয়েছে এটা তার উদাহরণ। তারা আরও বলেন, বিদেশ ভরসা বাদ দিয়ে সরকার এবারের পরিস্থিতি হাতের মুঠোয় রাখতে তিনটি ব্যাপারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থেকেই আগামী সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করা, নির্বাচন পর্যন্ত রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা ও বিদেশি ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সাময়িক সময়ের জন্য গুরুত্ব না দেওয়া।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা যিনি সরকারের মন্ত্রীও, তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণ রেখে জাতীয় নির্বাচন করে ফেলতে পারলে বিদেশিরাই তখন নিজে থেকে দূরত্ব ঘোছাতে এগিয়ে আসবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনো দ্বিমত নেই। সবার মতো দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে আগ্রহী আওয়ামী লীগও। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশি-বিদেশি কারও সঙ্গে আপস করবে না সরকারি দল আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর দুই সদস্য দাবি করেন, মাঠে আওয়ামী লীগের যে অবস্থান রয়েছে, তাতে আন্দোলন করে দাবি আদায়ের শক্তি কারও নেই। সুতরাং আপস করার নীতিতে হাঁটবেন না তারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সংবিধানের বাইরে একচুলও নড়বেন না। সে কথাই আমিও বলি, হ্যান করেঙ্গা তেন করেঙ্গা বলে যে বা যারা যত তৎপরই থাকুক, নির্বাচন হবে সংবিধানসম্মতভাবেই।’

ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের দাবি, সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি অবস্থানকে এবার আর আমলে নিতে চাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর মতো পরিস্থিতি যেহেতু কারও নেই, তাই নুয়ে পড়ার সুযোগও নেই তাদের।

ওই নেতারা আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিদেশিরা যার ওপর ভর করবে দেশে সেরকম শক্তিশালী কেউ আপাতত নেই। নির্বাচন পর্যন্ত সেই শক্তি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগও তারা দেখছে না। তারা বলেন, মাঠের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে সরকার সংকটে পড়ত। বিদেশিরা সরকার পরিবর্তনের ব্যাপারে আরও সক্রিয় হয়ে উঠত।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, সরকারের বাইরে গিয়ে অন্য শক্তির ওপর ভর করা বা শক্তি সৃষ্টি করার বিদেশিদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিষয়টি সরকার জানে। তাই যুক্তরাষ্ট্র সমালোচনা করলেও সরকার বিচলিত হবে না। সরকার মনে করছে, মাঠ গরম করা ও আন্দোলন করার ক্ষমতা যেহেতু কারোর নেই, অনেকটা নিরুপায় হয়েই বিদেশিরা রণে ভঙ্গ দিতে চলেছে।

ওই নেতারা বলছেন, তারা বিশ্বাস করেন, দেশ-বিদেশের যে চাপ সেটা থাকবে না। নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাই থাকবেন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায়ও আওয়ামী লীগই আসবে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতারা আরও বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও বিদেশিদের হস্তক্ষেপ ও ব্যাপক তোড়জোড় ছিল। তাদের সেই তোড়জোড় আমলে না নিয়ে তখনো যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করার দিকে মনোযোগী ছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপির নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন ব্যর্থ করা হয়। নির্বাচন ঠেকানোর নামে জ¦ালাও-পোড়াও, অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দশম সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার সন্ত্রাসের জন্য অভিযুক্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের কঠোর হাতে দমন করে। নির্বাচন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শপথ নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিদেশিরাও দূরত্ব কমিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করে।

বিদেশ নীতি ও কূটনীতি নিয়ে কাজ করা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সরকারের পক্ষে রাখতে এবার জাপানের ওপর নির্ভর করছে ক্ষমতাসীনরা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সরকার বেশি গুরুত্ব দিয়েছে জাপানকে। তারা বলেন, জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিমধ্যে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কড়া সমালোচনা থাকলেও কূটনীতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না বলে তারা দাবি করেন।

জাপানের নতুন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো কথা না বলার যে সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তা জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন হিসেবেই দাবি করে ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার নিশ্চিত যে আন্দোলনে সরকারকে দুর্বল করার কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারবিরোধী কারও সঙ্গে প্রকাশ্যে থাকবে না। আওয়ামী লীগের এ নেতা মনে করেন, দেশে সে পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সক্ষমতা কারও নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি হবে।

আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যারাই যা করুক, তাদের দাবি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও আওয়ামী লীগও চায় গ্রহণযোগ্য-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। আমরা তো কারও চাওয়ার বিরুদ্ধে নয়, বিএনপিই একমাত্র দেশি-বিদেশিদের চাওয়ার বাইরে গিয়ে আন্দোলন করছে।’

প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ তিন দেশ সফর নিয়ে ফারুক খান বলেন, ‘অনেকের চোখে সফর ব্যর্থ। আমরা জানি এ সফর সফল। জাপান ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যে বৈঠক সেটা সফল হয়েছে। জাপান ও বিশ্বব্যাংক কি আমেরিকার অনুসারী নয়?’