টাকা কোনো বিষয় না। একটু কুবুদ্ধি থাকলেই হয়। এটা সবার থাকে না। থাকলেও পারে না। কীভাবে তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন, কীভাবে গাড়ি-বাড়ি করলেন সেটি তদন্তের ভার দুর্নীতি দমন কমিশনের। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী, মুহাম্মদ এয়াকুবের যদি এই পরিমাণ টাকা থাকে তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিত্ত-বৈভবের পরিমাণ জানলে, অনেকেরই বেকুব হওয়ার দশা হবে এটা নিশ্চিত।
শুধু যমুনা অয়েল কোম্পানি না, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের আর্থিক খোঁজ নিলে, দেখা যাবে তারা টাকায় ভাসছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে ঘুষ-দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। এমন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে কাঠের টেবিলও ‘হাঁ’ করে না। দীর্ঘদিন থেকে এই অনিয়ম চলছে। সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি, মাঝে মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁক ছাড়েন। অনেকটা শূন্যে ছড়ি ঘোরানোর মতন। ফলে কথাগুলোকে কেউ পাত্তা দেন না। যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। ঘুষ চলবে, দুর্নীতি চলবে পারলে ঠেকান! এই ঠেকাঠেকির ফাঁপরে পড়েছে জনগণ। অন্যদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, আবার ঘুষও খাচ্ছেন। যে কারণে, সামাজিক বাজারে, অসামাজিক কাজ করে এরাই হচ্ছেন সম্মানিত এবং পূজনীয়। যে সমাজে অর্থই ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারণ করে, সেই সমাজে এই ধরনের কর্মকা- বন্ধ করা দুরূহ।
প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে এয়াকুব ১৯৯৪ সালে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে অস্থায়ী পদে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে চাকরি শুরু করেন। মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠানের টাইপিস্ট পদে তার চাকরি স্থায়ী হয়। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য খাতে টাকা কর্তন শেষে মাস শেষে তিনি বেতন পান ৩৩ হাজার ৯০৩ টাকা।
ভাড়া বাসা ছেড়ে চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা লালখান বাজারে তিনটি ফ্ল্যাট কিনেছেন এয়াকুব। যার আয়তন প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গফুট। দুটো ইউনিটে তিনি নিজে থাকেন, অন্যটি ভাড়া দিয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, তিনটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মতো। আরও জানা গেছে, নিজস্ব ফ্ল্যাট ছাড়াও চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এক্সেল রোডে এয়াকুবের ৪ কাঠা জমিতে টিনশেডের ঘর আছে। ১০টি পরিবারের
কাছে ভাড়া দিয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধানে এর প্রাথমিক সত্যতাও মিলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে সিবিএ নেতা এয়াকুবের বিরুদ্ধে? অনুসন্ধান করবেন কোন পক্ষ! নিশ্চয়ই তারা সরকারি কর্মচারী।
এই কারণেই সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে, যে করেই হোক সন্তানকে সরকারি চাকরিতে ঢোকাতে হবে। তাতে দুই ধরনের সুবিধা। চাকরি যাওয়ার কোনো ভয় নেই, বড়জোর অফিস পরিবর্তন হতে পারে। এর সঙ্গে আবার ঘুষের সুবিধা! নিশ্চিত জীবন। এই সুবিধার জন্যই এখন, সরকারি চাকরি পেতেও ঘুষ লাগে! এসবের জন্যই, হাজার হাজার শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে প্রতি বছর সরকারি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ফেরে। সমাজের এই ভয়ংকর অবক্ষয়ে কোনো মহলের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।
দেশের সামাজিক কাঠামোর মনস্তাত্ত্বিক এই অধঃপতন, কোন কৌশলে আবার ঊর্ধ্বমুখী করা যাবে তা আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু জানি একটি সভ্য, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা চাইলে এসবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করা কঠিন কোনো বিষয় নয়, আন্তরিকতা থাকলেই হয়। প্রত্যাশা থাকবে, সুষ্ঠু তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে, মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধে যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কোনো ধরনের রাজনৈতিক কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হবে আত্মঘাতী।