‘মঙ্গার মাটিতে’ শিল্পের হাতছানি

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উত্তরের জেলা নীলফামারীতে একের পর এক গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা। স্বাধীনতার পরও প্রায় প্রতি বছরই মঙ্গাপীড়িত হয়ে একবেলা, আধবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে এ জেলার অসংখ্য মানুষকে। কিন্তু চিরচেনা সেই পরিস্থিতি পাল্টেছে। এ অঞ্চলের এক সময়ের দুঃখ হিসেবে পরিচিত মঙ্গা দূর করতে নীলফামারীতে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। আর এই ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জেলাজুড়ে গড়ে উঠছে বিভিন্ন রকমের ছোট-বড় শিল্পকারখানা। যেসব কারখানায় কাজ করছেন কয়েক লাখ শ্রমজীবী নারী-পুরুষ। যার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি।

এদিকে চলতি বছরে চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু এবং পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে নীলফামারীতে শিল্পবিপ্লব ঘটবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। উদ্যোক্তরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট সব সুযোগ-সুবিধাসহ এ জেলায় জমির দাম তুলনামূলক অনেক কম। এ ছাড়া শ্রম মজুরি কম হওয়ায় নতুন বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন। আর স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহও বেড়ে গেছে।

উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালে উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রায় ২১৩.৬৬ একর এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে এই ইপিজেড। এখানে ১৯০টি প্লটের মধ্যে ১৫৪টি প্লটে ২৪টি দেশি-বিদেশি কোম্পানির কারখানা আছে। ওই ২৪টি কোম্পানির মধ্যে ১১টি বিদেশি। এই ইপিজেডে শ্রমিক অসন্তোষ নেই, নেই চাঁদাবাজি। এখানে রয়েছে দক্ষ জনশক্তি, রয়েছে সুন্দর কর্মপরিবেশ। এসব কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন বেশি। ফলে বাড়ছে কলকারখানা, বাড়ছে শ্রমিকের চাহিদাও। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা বলছেন, এখানে বেতন, উৎসব-ভাতা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ শ্রমিকদের পাওনা সঠিক সময়ে পরিশোধ করা হয়। শিল্পায়নের ধারাবাহিকতায় উত্তরা ইপিজেড একটি জুয়েলারি কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স স্মাইল আর্টস কোম্পানি লিমিটেড। যেখানে ৩০০ বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

উত্তরা ইপিজেডে রয়েছে বৃহৎ পরচুলা কারখানা। সেখানে পরিসর কম হওয়ায় পরচুলা কারখানা ছড়িয়ে পড়েছে জেলাজুড়ে। ছোট ছোট ৬০টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কাজ করছে প্রায় লাখখানেক নারী। যার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি। এ ছাড়াও এই ইপিজেডে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে ৫০ হাজার শ্রমিক।

উত্তরা ইপিজেডে রয়েছে ইকো গ্রুপের কারখানা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সিদ্দিকুল আলম জানান, তারা প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়াতে ২০ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য রপ্তানি করছেন।

শিল্পায়নের ধারাবাহিকতায় ৫৫ বছর পর চালু হয়েছে চিলাহাটি-হলদীবাড়ি রেলপথ। শুরু হয়েছে সৈয়দপুর বিমানবন্দর আঞ্চলিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিতকরণ। এ ছাড়া সৈয়দপুরে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস স্টেশনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলছে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন। বর্তমানে সৈয়দপুর-ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে আকাশপথে ১৮টি বিমান প্রতিদিন চলাচল করছে। চিলাহাটি রেলবন্দর দিয়ে সপ্তাহে চার দিন আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী মিতালী এক্সপ্রেস ও সপ্তাহে পাঁচ দিন পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। পাশাপাশি চিলাহাটিতে গড়ে তোলা হচ্ছে রেলওয়ে টার্মিনাল ও আন্তর্জাতিক রেলস্টেশন। রেলবন্দরের পাশাপাশি চিলাহাটিতে স্থলবন্দর স্থাপনের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন।

এ প্রসঙ্গে নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এনসিসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী শফিকুল আলম ডাবলু বলেন, ‘শিল্প উন্নয়নে একের পর এক সম্ভাবনার পথ তৈরি করে দিচ্ছে সরকার। এগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত হলেই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নীলফামারীতে শিল্পে বিপ্লব ঘটবে।’

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শেখ শামীম হোসেন জানান, নীলফামারীতে গ্যাস ডিপোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহও করা হয়েছে। চলতি বছর জুন বা জুলাইয়ের মধ্যে এখান থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।