ছোটদের বেড়ে ওঠার সময়ে অনেক কিছুই দরকার। বিশেষ করে দরকার পড়ে বীরের। এমন মানুষের, কিশোর যাকে অনুসরণ করে এগোতে পারে। যাকে শ্রদ্ধা করবে, ভালোবাসবে, ভাববে : তার মতো বড় হতে না পারি, অন্তত তার পথ ধরে এগোবার চেষ্টা করব।
বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের জন্য এখন বীর কারা? দেখা যাবে বীর হচ্ছেন নায়ক-নায়িকা, টেলিভিশনের তারকা, খেলাধুলার তারকা। এটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। টেলিভিশনের ও খেলাধুলার মানুষদেরই তো হরহামেশা দেখছে তারা। এদের তারা পছন্দ করে। কিন্তু এখানে মস্ত একটা অসুবিধা আছে। সেটা হলো এই, ওইসব নায়ক স্থায়ী হন না। আকাশের তারার মতো তারা জেগে ওঠেন, আবার সময় শেষ হলে তারাদের মতোই হারিয়ে যান। গতকালের নায়করা আজ স্মৃতিমাত্র। স্থায়ী বীর কারা? যারা আজকে আছেন, গতকালও ছিলেন, ঝরে যাবেন না আগামীকালও। তারা হচ্ছেন ইতিহাসের মানুষ। এই মানুষেরা ইতিহাসকে বদলে দেন এবং বদলে দিয়ে নিজেরাও ইতিহাসের অংশ হয়ে বেঁচে থাকেন। কিশোরদের জন্য এদেরই হওয়া উচিত অনুসরণীয় বীর। এদের দেখে, এদের কথা ভেবে কিশোররা চাইবে মহৎ হয়ে উঠতে।
কিন্তু ইতিহাসে তো অনেক মানুষেরই নাম পাই। তারা সবাই কি বীর হবেন? না, তা হবেন না। এক কথায় যদি বলতে চাই তাহলে বলব, বীর হবেন সেসব মহৎ মানুষ, পৃথিবীকে যারা বোঝেন এবং বুঝে তাকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন। কেবল বুঝতে নয়, চেষ্টা করেছেন বদলে দিতেও।
এমন মানুষদের খোঁজ পাওয়া যাবে নানা ক্ষেত্রে। তারা আছেন সাহিত্যের জগতে। রয়েছেন বিজ্ঞান ও দর্শনের ক্ষেত্রে। তাদের পাওয়া যাবে রাজনীতির অঙ্গনে। তারা সবাই যে এক রকমের বা এক মাপের সেটা অবশ্যই নয়। কিন্তু সবাই মহৎ এবং বীর হওয়ার জন্য আদর্শ মানুষ। এদের সবাই যে পৃথিবীকে বদলাবার শপথ নিয়ে কাজে নেমেছিলেন তা নয়, কিন্তু বড় কঠিন ছিল কাজের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ও কাজের ব্যাপারে সাধনা, সেই সঙ্গে অর্জন করেছিলেন উঁচুমানের সাফল্য। ফলে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। যে পৃথিবীতে তারা এসেছিলেন, তারা চলে যাওয়ার পর সেটি আর আগের মতো থাকেনি, বদলে গেছে।
সাহিত্যের দিকে তাকানো যাক। সেখানে আমরা শেকস্পিয়রকে পাব। শেকস্পিয়রকে আমরা আলাদা করেই রাখব। মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, তাদের বুঝতে চেয়েছেন এবং কেবল ইংরেজি ভাষার পাঠকদের নয়, বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে তিনি মানুষের কল্পনা ও অনুভবের জগতে পরিবর্তন ঘটিয়ে গেছেন। বাংলা ভাষায় আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তো আমাদের একেবারেই কাছের মানুষ।
রবীন্দ্রনাথ মানুষকে ভালোবাসতেন এবং যদি হিসাব করতে হয়, তবে বলতে হবে বাঙালিদের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি হিসেবে নন, অনেক দিক দিয়েই তিনি অসাধারণ। রাজনীতিতেও অংশ নিয়েছেন, নানা বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। পৃথিবীটাকে বুঝেছেন এবং চেষ্টা করেছেন তাকে বদলাবার। এই কাজটা আরও বেশি স্পষ্টভাবে করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম।
বীর হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও আসবেন। বাংলা গদ্যকে তিনি বদলে দিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনে দিয়ে গেছেন। তিনি চাইতেন মানুষের মেরুদণ্ড শক্ত হোক। পরাধীন দেশে মেরুদণ্ড শক্ত রাখাটা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। তার সময়ে মানুষ নত হতো সমাজের কাছে, ধর্মের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে। বিদ্যাসাগরের গদ্য যেমন শক্ত মেরুদণ্ডের, তেমনি তার নিজের অবস্থানও ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি আপস করার মতো মানুষ ছিলেন না। বেগম রোকেয়ার নামও আসবে। একেবারেই বিরূপ পরিবেশে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন। জগৎটাকে বুঝেছেন এবং চেষ্টা করেছেন সেটিকে বদলে দেওয়ার। বিজ্ঞানের বেলায় খুবই বৈপ্লবিক কাজ করে গেছেন গ্যালিলিও। এক সময়ে ধারণা করা হতো যে, পৃথিবী হচ্ছে স্থির এবং সূর্য, গ্রহ, উপগ্রহ সবাই পৃথিবীর চারপাশ দিয়ে ঘুরছে। এটা যে সত্য নয়, সেটা প্রথমে ধারণা করেন কোপার্নিকাস। গ্যালিলিও তার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার সাহায্যে কোপার্নিকাসের ধারণাই যে সঠিক তা প্রমাণ করলেন। সেই সত্যটাকে তিনি প্রকাশ করেন তার বইতে। এতে তার মহাবিপদ ঘটে। ধর্মযাজকরা ক্ষেপে ওঠেন। এতকাল ধরে তারা বলে আসছেন পৃথিবী স্থির, আর এই লোক কিনা প্রমাণ করতে চায় যে সেটা মিথ্যা কথা, আসলে পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে! ধর্মযাজকদের বক্তব্য তাহলে মিথ্যা? আরও একটি বড় অপরাধ ছিল গ্যালিলিওর। সেটি এই যে, তার ওই বৈজ্ঞানিক বক্তব্য পণ্ডিতদের ল্যাটিন ভাষায় না লিখে সাধারণ মানুষ যাতে বুঝতে পারে সেই লক্ষ্যে মাতৃভাষা ইটালিয়ানে লিখেছেন। ধর্মযাজকরা দেখলেন সাধারণ মানুষ যদি একবার টের পেয়ে যায় যে, তারা মিথ্যাচার করেছেন তাহলে তো তাদের মানসম্মান বিষয়-সম্পত্তি কিছুই আর অক্ষুন্ন থাকবে না। তারা বিচার বসালেন গ্যালিলিওর। চাপ দিয়ে গ্যালিলিওকে বাধ্য করবেন তার বৈজ্ঞানিক বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে। কিন্তু গ্যালিলিও তো পরাজিত হওয়ার মানুষ নন। তাই বইপত্র নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, তার ওপর চোখ রাখা হয়েছে যেন নতুন কোনো ‘উৎপাত’ সৃষ্টি না করেন। কিন্তু হতাশ না হয়ে গ্যালিলিও তার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবার লিখেছেন এবং একজন ছাত্রের সাহায্যে তা গোপনে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার তত্ত্ব রক্ষা পেয়েছে। কাজটি তাকে করতে হয়েছে অত্যন্ত সংগোপনে।
আলো জে¦লে কাজ করছেন দেখলে সন্দেহ করা হবে, তাই রাতের বেলায় চাঁদের আলোতে তিনি লিখতেন। তার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছিল। তিনি অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তবু ক্ষান্ত হননি। তার ওই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কেবল যে বিজ্ঞানের জগতে তা তো নয়, মানুষের চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রেও মস্ত এক বিপ্লব সম্ভব করে তোলে।
ধরা যাক কার্ল মার্কসের কথা। তার দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল বৈজ্ঞানিক। তিনি তথ্য থেকে তত্ত্বে আরোহণ করেছেন। সে কাজটা অবশ্য সব বৈজ্ঞানিকই করে থাকেন; কিন্তু মার্কস যেখানে অন্যদের থেকে আলাদা সে জায়গাটা হলো এই তিনি পরিষ্কারভাবেই বলে দিয়েছেন, তার কাজ কেবল পৃথিবীকে বোঝার নয়, তাকে বদলানোও। বীরত্ব পরিমাপের জন্য পৃথিবীকে বদলানোর যে নিরিখের কথা আমরা বলছি, সেটাও মার্কসেরই দেওয়া। এই নিরিখে বিচার করলে বীর হিসেবে তাকে না দেখে কোনো উপায়ই থাকে না। মার্কসের জন্ম পুঁজিবাদী বিশ্বে, সেই বিশ্বকে তিনি যেমন পরিষ্কারভাবে বুঝেছেন, তার আগে অন্য কেউ সেভাবে বুঝতে পারেননি এবং সেটা বুঝতে গিয়ে তিনি ও তার বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দেখতে পেয়েছেন, কেবল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেই নয়, সব ব্যবস্থাতেই অল্পকিছু মানুষ থাকে যারা শোষক আর বেশির ভাগ মানুষকে হতে হয় তাদের দ্বারা শোষিত। শোষক ও শোষিতের যে দ্বন্দ্ব, তার কারণেই মানুষের ইতিহাস বদলে গেছে। মার্কস-এঙ্গেলস কেবল তত্ত্ব দাঁড় করাননি, তারা ওই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করার যে আন্দোলন তাতেও যোগ দিয়েছেন। পুঁজিবাদে পুঁজির যে শোষণ চলে শ্রমিকের ওপর, সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অগ্রনায়ক হিসেবে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান হচ্ছেন লেনিন। লেনিনও অর্থনীতি ও দর্শনের ওপর বই লিখেছিলেন এবং নিজের দেশ রাশিয়াতে পুঁজির মালিকদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপ্লব সম্পন্ন করেছেন। যেভাবে তিনি সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এই বিপ্লবের কাজটি করতে পেরেছেন, সেটা একটা দৃষ্টান্তও বৈকি। নিপীড়িত মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে এমন কাজ করা যায় না। লেনিনের নেতৃত্বে যে বিপ্লব ঘটল তা ইতিহাস দর্শন রাজনীতি সবকিছু সম্পর্কেই মানুষের ধারণা বদলে দিল। বদলের এই ধারাতে চীনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন মাও সে-তুং। চীন ছিল হতদরিদ্র কৃষকের দেশ; সেই দেশে দেশি-বিদেশি শক্তির শোষণকে উপড়ে ফেলে মানুষের জন্য মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তিনি প্রমাণ করলেন সঠিক পথে সম্মিলিতভাবে এগোলে কেমন করে মুক্তি অর্জন করা যায়। তাদের পথ ধরে এগিয়ে, তবে ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে সমাজকে বদলে ফেলেছেন কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো। তার সঙ্গে ছিলেন আর্জেন্টিনার চে গুয়েভারা। পৃথিবীকে বোঝা এবং তাকে বদলে দেওয়ার ব্যাপারে এদের দুজনের যে কাজ তাও বীরত্বব্যঞ্জক বৈকি। বীর ছিলেন হো চি মিন। মার্কিনিদের যিনি ভিয়েতনাম থেকে তাড়িয়ে এবং ভিয়েতনামের সাম্রাজ্যবাদী বিভাজনের নিরসন ঘটিয়ে আশ্চর্য এক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনেকে এগিয়ে এসেছেন, যাদের কথা বারবার স্মরণ করতে হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন সুভাষচন্দ্র বসু। যিনি ব্রিটিশের আমলা হওয়ার সর্বোচ্চ পরীক্ষায় ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন। পরীক্ষা হয়েছিল লন্ডনে। কিন্তু ততদিনে এই তরুণ বুঝে ফেলেছেন যে, ব্রিটিশের সেবা করা আর যারই সাজুক তার সাজে না। তাই চাকরির অত্যন্ত লোভনীয় আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে চলে এসেছিলেন দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে। কিন্তু অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে, আবেদন নিবেদন করে আর যাই পাওয়া যাক, স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের প্রয়োজন হবে। দেশের ভেতর থেকে সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ যে সম্ভব নয়, সেটা জানতেন তিনি। তাই দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেলেন এবং সেখানে ভারতীয়দের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ নামে এক বাহিনী গড়ে তুললেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটা। তার এই বাহিনী ওই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে রাজধানী দিল্লি দখল করে নেবে এবং ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে এটাই ছিল আশা। তার এই হিসাব নির্ভুল প্রমাণিত হয়নি এ কারণে যে, যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ও তার মিত্রদেরই জয় হয়েছে, জাপানিরা পরাজিত হয়েছে। সুভাষ বসুর অন্তর্ধান ঘটেছে। কিন্তু তবু এই সত্য ইংরেজ লেখকরাই স্বীকার করেছেন যে, সুভাষের সশস্ত্র বাহিনী ব্রিটিশদের যে মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা দিয়েছিল তার দরুনই তারা ভারত থেকে দ্রুত প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সুভাষ বসুর মতোই সশস্ত্র পথে স্বাধীনতা আনতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্য সেন। ব্রিটিশের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে নিজের যুববাহিনীর সাহায্যে সূর্য সেন চট্টগ্রাম শহরকে স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। সেই স্বাধীনতা অবশ্য দুদিনের বেশি ধরে রাখতে পারেননি; শেষ পর্যন্ত তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রাণ দিয়েছেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারও। মেয়েদের রাজনীতিতে যেতে নেই, এই সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ছিন্ন করে প্রীতিলতা সূর্য সেনের দলে যোগ দেন এবং সামনাসামনি যুদ্ধ করে শহীদ হন।
পূর্ববঙ্গে আরও পেয়েছি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। তিনি ছিলেন পিতৃ-মাতৃহীন এক কিশোর, যার শিক্ষাজীবন কেটেছে ধর্মের আশ্রয়ে। কিন্তু তিনি দেখেছিলেন কৃষক কীভাবে অত্যাচারিত হয় জমিদারের হাতে। আসামে চলে গিয়েছিলেন সেখানকার বাঙালি কৃষকদের পাশে দাঁড়াবার জন্য। পরে বুঝেছেন কেবল জমিদার নয়, ব্রিটিশের রাষ্ট্রই কৃষকবিরোধী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভাসানী যোগ দিয়েছিলেন এই আশা বুকে নিয়ে যে, ওই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটলে
কৃষক মুক্তি পাবে। কিন্তু সেই মুক্তি আসেনি। যে জন্য তিনি রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তানি সেনাশাসকরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল এবং অস্ত্রধারী ভীরুরা যা করে তাই করেছিল, ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালিদের ওপর। ফলে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছেন। এরা সবাই ছিলেন বীর। পরবর্তী প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের জন্য আদর্শ হওয়ার মতো মানুষ।
বীরদের মধ্যে বিজ্ঞানীদের কথা এসেছে। তাদের বীরত্বটা ভিন্ন রকমের। তাদের অনেক সময়েই একাকী কাজ করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে গবেষণাগারে। সেই যে তাদের অভিনিবেশ, একাগ্রতা, অঙ্গীকারে অবিচলিত থাকা, সেসবও বীরেরই কাজ। তারা তাদের সময়কার প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেও আস্থা রাখেননি, সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। যেমন নিউটন ও ডারউইন। নিউটন মাধ্যাকর্ষণের তত্ত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে আগে যেসব চিন্তা প্রচলিত ছিল তা তাকে সন্তুষ্ট করেনি। তাই তিনি গবেষণা করে নতুন ব্যাখ্যা উপস্থিত করলেন। যার ফলে মানুষের চিন্তাজগতে বিরাট এক পরিবর্তন ঘটে যায়। বীর ছিলেন ডারউইনও। মানুষ যেকোনো এক বিশেষ দিনে সৃষ্টি হয়নি, তাকে আসতে হয়েছে বিবর্তনের অতি দীর্ঘ একটি পথ পার হয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে তিনি প্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত ও পরিবর্তিত করে দিয়েছেন।
মূল কথাটা রয়ে গেল এই যে, বীর তারাই, যারা পৃথিবীটাকে বুঝতে চান ও তাকে বদলাতে চান। আমাদেরও কাজটা হওয়া চাই ওই রকমেরই। আমরা প্রত্যেকেই যে বীর হব এমন নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু বীরদের পথ ধরে চলতে চাইব না কেন? আরেকটা কথা, যারা বীর হন তারা কেউই কিন্তু স্বার্থপর হন না। কেবল নিজের কথা ভাবেন না, সবার কথা ভাবেন। নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে অন্যদের কথা ভাবার ব্যাপারটা একেবারেই প্রাথমিক বটে।
লেখকঃ ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়