বেশি দূরে নয়, সিলেট থেকে শতেক কিলোমিটার। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ ও মাধবপুর উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে শিল্প-কারখানা। এ এলাকাতেই আমাদের চিরচেনা গ্রাম, যেখানে ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছি। পড়ালেখা এবং চাকরির সুবাদে শহুরে জীবনকে ধারণ করতে দীর্ঘদিন গ্রামের বাইরে কাটিয়ে দিলাম। প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দ মনে করিয়ে দেয় চিরচেনা গ্রামের দৃশ্য। গ্রামের স্নিগ্ধ মনোরম প্রকৃতি অনেকটা ইটের টুকরায় বন্দি হয়ে যেতে দেখেছি। সেখানে আর শত শত গাছগাছালি নেই। পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে না, ঘুম ভাঙে মেশিনের শব্দে! সকালের রোদটুকু হারিয়ে যায় অচেনা শহুরের আবেশে। সন্ধ্যার পর রাস্তায় দেখতে পাওয়া যায় হাজার হাজার কর্মব্যস্ত মানুষকে। এখন আর সারি সারি বৃক্ষ চোখে পড়ে না। গ্রামীণ আবহের নিস্তব্ধতা হারিয়ে নতুন করে গড়ে উঠেছে শিল্পায়ন। গ্রামবাংলার যে ঐতিহ্যকে ধারণ করে বড় হয়েছি সবই বিলীন হয়ে গিয়েছে শিল্পায়নের ছোঁয়ায়। পূর্ণিমা রাতে এক ফালি চাঁদের দেখা মেলা ভার। সবই যেন বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় ঝলসে গেছে। স্নিগ্ধ আবেশে শীতের সকালে কুয়াশা দিন দিন ধোঁয়াশায় পরিণত হচ্ছে। কৃষিজমিতে কলকারখানা স্থাপনে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে।
গ্রামের স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশ এখন আর চোখে পড়ে না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। বাঁশঝাড়গুলো উজাড় হয়ে গেছে। শরৎকালে কাঁশবনগুলো আগেকার মতো মুগ্ধতা ছড়ায় না কিংবা পাতা ঝরা ফাগুনের উষ্ণ আলিঙ্গন অনুভূতি জাগায় না। সন্ধ্যাবেলায় যে পাখিগুলো নীড়ে ফিরে আসত তা চোখে পড়ে না। সবই যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে শিল্পায়নের ছোঁয়ায়। সবকিছু শহুরে খাঁচায় বন্দি জীবন। বেরসিক জীবনকে সবাই চলমান পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পাড়ার যে লোকগুলো ভোরবেলায় গরু নিয়ে মাঠে যেত তারা এখন রাত অবধি কারখানায় কাজ করে। ক্লান্তি তাদের হার মানাতে পারে না। যে কৃষক কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা এখন কারখানায় কাজ করে সংসার চালান। খুবই অল্প সংখ্যক কৃষক ঐতিহ্যগতভাবে তাদের পেশাকে ধরে রেখেছে। তাই, ধানচাষ হলেও শীতকালীন ফসলের আবাদ কমে আসছে। ফলে অনেক কৃষিজমি পতিত থেকে কৃষি অর্থনীতি ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পায়নের ছোঁয়ায় সেখানকার অবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ির। পূর্বের তুলনায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বেড়েছে বহুগুণে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ কলকারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাই প্রতিদিন হাজারো লোকের সমাগম হয়। নিস্তব্ধ গ্রামগুলো এখন ব্যস্ততায় ভরপুর। কিন্তু শীতল স্নিগ্ধ বাতাস দূষিত করে তুলছে শিল্পায়নের ডামাডোলে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ সেখানকার মনোরম পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। বহমান নদীতে চর জেগে আছে। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকে না। নদীর পানি দূষিত হয়ে কালছে রং ধারণ করছে। ছোট ছোট খালগুলো অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। তাই, নদী কিংবা খালে মাছের দেখা পাওয়া ভার। পাশে রয়েছে রঘুনন্দন পাহাড়। পাহাড় এবং রেললাইনের পাশে রয়েছে ময়লার ভাগাড়। মেশিনের শব্দ এবং মানুষের সরব উপস্থিতিতে প্রাণীদের অভিযোজন ক্ষমতা কমে আসছে। তাই সেখানকার প্রাণীরা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মূলত জীবিকার তাগিদে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য হারাতে বসেছি। প্রশান্তিময় গ্রামবাংলার কোলাহলমুখর পরিবেশ সেখানে নেই।
তারপরও হাজারটা প্রশ্ন উপেক্ষা করে মেতে ওঠি সম্ভাবনাময় শিল্পায়ন নিয়ে। একদিকে মেশিনের শব্দ, অন্যদিকে হাজারো অচেনা মানুষের কর্মসংস্থান। সকালবেলায় হাজারো লোক উৎপাদন কারখানায় নিয়োজিত থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করে। তাদের ক্ষুদ্র হাতে গড়া পণ্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছে। তাদের শ্রম দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সাহায্য করছে। গ্রামের কেউ আর বসে থেকে অলস সময় পার করে না। বেকারত্ব ঘুচে সবাই এখন স্বাবলম্বী। গাঁয়ের মেঠোপথ এখন পিচঢালা পথে পরিণত হয়েছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়নে যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর হয়েছে। মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ বহুলাংশে বেড়েছে। ফলে শিক্ষার হারও বেড়েছে। সর্বোপরি মানুষের জীবনমানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
তবে গ্রামের মানুষগুলো ফুটবল, ক্রিকেট, হা-ডু-ডু খেলায় কোনো আনন্দ খুঁজে পায় না। চিরচেনা রাখালের গরুর পাল চোখে পড়ে না। কেউ বাঁশি বাজিয়ে চৈত্রের দুপুরটাকে মাতিয়ে রাখে না। গ্রীষ্মের দুপুরে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায় না। হেমন্তকালে নতুন ধানের পিঠা বানানোর আমেজ অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। শীতকালে এখন আর যাত্রাপালা হয় না। বৈশাখ কিংবা পৌষ মাসে মেলার আয়োজন থাকে না। অথচ গ্রামই প্রাণ, গ্রামই আমাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। তা ছাড়া শিল্প ও সংস্কৃতির সূক্ষ্ম মেলবন্ধন গ্রামের পটভূমিতেই ধরা দেয়। অথচ শিল্প ও সংস্কৃতির মৌলিকতা শিল্পায়নের প্রভাবে সেখানে আজ হারাতে বসেছে। ফলে সেখানকার মানুষদের জীবন থেকে গ্রামীণ সংস্কৃতি বিলুপ্ত হচ্ছে।
শিল্পায়নে যেমন সেখানকার জীবনমান উন্নত হয়েছে তেমনি তৈরি হয়েছে নানা মাত্রিক জটিলতা। পারস্পরিক সম্পর্ক এখন টিকে আছে মুঠোফোনের ছোঁয়ায়। তাই সম্প্রীতিকে সুদৃঢ় করার পরিবর্তে হারাতে বসেছি, যা আমাদের চিরায়ত সমাজব্যবস্থাকে ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে। মূলত, আমরা গ্রামের সে দিনগুলো হারাতে বসেছি, যে দিনগুলোয় সমাজের একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াত। সামাজিক হৃদ্য হারিয়ে সবাই এখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছি।
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। রূপবৈচিত্র্যের এ দেশে হাজার বছরের আবহমান গ্রামবাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্য ধরা পড়ে গ্রামীণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এ দেশের কৃষ্টি, কালচার মিশে আছে গ্রামবাংলার মানুষের মনে প্রাণে। তাই গ্রামবাংলার মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ ও লালন-পালন করে আসছে আবহমানকাল থেকেই। কিন্তু শিল্পায়নের ছোঁয়ায় আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির আমেজ থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। খড় কিংবা টিনের ঘরের পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে বহুতল বিশিষ্ট নতুন নতুন ভবন। সেখানে অতি পরিচিত বাঁশঝাড় কিংবা বনলতার শ্যামল স্নিগ্ধ আমেজ আর নেই। অথচ, গ্রামের সে মেঠোপথকে আপন বলে জেনেছি, যে পথে বর্ষাকালে কাদা, শীতকালে ধুলা থাকে। কিন্তু আজ আর তা দেখা যায় না। শিল্পায়নের ছোঁয়ায় রাস্তাগুলো পিচঢালা পথে পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবনমানেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু স্নিগ্ধ কোলাহলযুক্ত নির্মল বায়ুর দেখা মেলে না।
প্রকৃতির সঙ্গে উন্নয়নের পরিমিতবোধ পরিবেশকে অনিন্দ্য সুন্দর করে তোলে। কিন্তু শিল্পায়নের ছোঁয়ায় সে বাঁধন না থাকায় আমরা আজ তা হারাতে বসেছি। অথচ আমাদের সংস্কৃতির রূপায়নে গ্রামের আবহকে অনন্যরূপে বারবার তুলে ধরি। আমরা চাই শিল্পায়নের মাঝে গ্রামীণ অবয়ব আরও অনিন্দ্য সৌন্দর্যের হাতছানি দিয়ে ডাকবে। তবেই তা হবে প্রকৃতির জন্য বিশালত্বের ছোঁয়া।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
anjan999roy@gmail.com