রোহিঙ্গা সংকট সমাধান কঠিন

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্যবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। ১৯৭৮, ১৯৯২ বা ২০১২-এ বড় পরিসরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার মুখে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা। দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। আর সে তালিকায় প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে নতুন জন্ম নেওয়া ৩০ হাজার রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘকালের হলেও মূলত ২০১৭ সালের গণহত্যার পর এই সংকট বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা যখন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সীমান্ত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছিল তখন বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সীমান্তকে উন্মুক্ত করে দেয়। ২০১৭ সালের সে আপদকালীন আশ্রয়ের পর রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের আলোচনা হওয়া উচিত রোহিঙ্গাদের অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে। ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন ফর রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেন্টস’-এর মতে, একটি রিফিউজি হোস্ট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে সার্বিক সহযোগিতা পাওয়ার কথা তা পায়নি। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। রোহিঙ্গারা অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বসহ নানা সংকটের কারণ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের দুটি সমাধান ১. সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন, ২. তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর।

দ্বিতীয় সমাধানের বাস্তবতা খুবই কম। কারণ এত সংখ্যায় রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে স্থানান্তর করা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে আগ্রহী তৃতীয় দেশের সঙ্গে সংকটাপন্ন এলাকার কোনো ভৌগোলিক সংযোগ নেই। রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান হতে পারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। বর্তমানে খুবই স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা চলছে। তবে এসব আলোচনাকে নানা কারণে প্রশ্নের মুখে রাখা যায়। মনে রাখতে হবে এটা সেই মিয়ানমার যারা কোনো আন্তর্জাতিক রিপোর্ট, উদ্বেগ, অনুরোধকে তোয়াক্কা না করে ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যা চালিয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর। এমনকি তাদের ন্যূনতম ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোকে রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়নি। কোনো সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। রাখাইনে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। সে মিয়ানমারের আলোচনা উদ্যোগকে সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আট লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর তালিকা মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছিল। এরপর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ৬৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি ফিরতি তালিকা পাঠানো হয়। ওই তালিকা থেকে পরিবারভিত্তিক প্রত্যাবাসনের জন্য প্রাথমিকভাবে ১১৪০ জনকে বাছাই করা হয়। ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে হাজারখানেক রোহিঙ্গার নামমাত্র প্রত্যাবাসন সংকটের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার একটা কৌশল হতে পারে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে চীনের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। চীনের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার লি ঝা উই এবং মিয়ানমারের পক্ষে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব আই ই চান। বৈঠকটি নিঃসন্দেহে হাই প্রোফাইলের। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট কোনোভাবেই সৌদি-ইরানের মতো কোনো দ্বিপক্ষীয় সংকট নয় যে, তৃতীয় দেশের দূতের মধ্যস্থতায় দুটি দেশের কূটনীতিকরা বসে একটা সমাধান আনলেন। চীন এখানে মধ্যস্থতাকারী মাত্র, চীন শুধু দুই দেশের সঙ্গে থাকা তার সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মিডলম্যানের কাজটা করছে। মিয়ানমার যদি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাঝখানে বেঁকে বসে সে ক্ষেত্রে এই বৈঠক বা ঐকমত্যে গ্যারান্টার কে হবে!

গত এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় মিয়ানমারকে তাদের যুক্তি পেশ করতে  হয়েছে। যুক্তিতর্কে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে তারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তার একটা বিশদ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এই যুক্তি-তর্ক বেশ একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে নামমাত্র এই প্রত্যাবাসন আইসিজের কাছে সংকট সমাধানে মিয়ানমার আন্তরিকতা প্রমাণের একটি কৌশল হতে পারে। মিয়ানমার ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থল ও সমুদ্রসীমার দেশ। বর্তমান জান্তা সরকারের ন্যূনতম বৈদেশিক গ্রহণযোগ্যতা নেই, এমনকি আসিয়ানও জান্তা সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের নামমাত্র প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে নিজেদের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে চাইছে। বাংলাদেশকে এসব ফ্যাক্টসকে মাথায় রাখতে হবে। এমনিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বের মনোযোগ রোহিঙ্গা সংকট থেকে সরে গেছে। চলমান বৈশ্বিক ক্রাইসিস ফান্ডও কমে আসছে। সুতরাং প্রত্যাবাসন আলোচনা সংকটে গুরুত্ব কমানোর একটি প্রক্রিয়া কিনা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

মিয়ানমারের বর্তমান সরকার ও সবসময়ের জন্য অর্থনীতি, সামরিক নীতি ও রাজনীতিতে চীন এতটাই প্রভাবশালী, চীনকে এড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কঠিন। অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের রাজ্য রাখাইনে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর, গ্যাস ও তেলের পাইপলাইন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলিয়ে রাখাইন রাজ্যে চীনের ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। বিনিয়োগকৃত একটি অঞ্চলকে বিরোধপূর্ণ রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে চীনের স্বার্থেও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান দরকার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের পূর্ণ মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তার সহিত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে প্রত্যাবাসন হওয়া জরুরি। জাতিসংঘ ও আসিয়ানের অংশগ্রহণ ছাড়া বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের অস্বীকৃত একটি সরকারের সঙ্গে শুধু চীনের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলমান ও কত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঘোষণা দরকার। চলমান প্রক্রিয়ায় মিয়ানমার যদি কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার পর ঠুনকো অজুহাতে তাদের অত্যাচার-নিপীড়নের মুখে আবার বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাধানই হবে না।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

shahadatju44@gmail.com