রসে বশে নজরুল

কাজী নজরুল ইসলামের কাজে, কবিতায় এবং দৈনন্দিন জীবনে হাস্যরস সংযোজন করার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। লেখালেখি ছাড়াও বাস্তবজীবনে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু মজার গল্প রয়েছে।

নিজের পায়ে দাঁড়ানো

কাজী নজরুল ইসলাম একবার প্রচ- ভিড়ে ট্রেনে দাঁড়িয়ে তার গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। ট্রেনে এক লোক কবির পায়ের ওপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। কবি সেখান থেকে কোনোভাবেই পা সরাতে পারছিলেন না। তিনি লোকটিকে বলেন, এত বড় হয়েছেন এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখেননি? লোকটি তৎক্ষণাৎ পা সরিয়ে নিলেন।

সুধীর বাবুর চা

কবি নজরুল প্রচুর পরিমাণে পান খেতেন। একই সঙ্গে তিন-চারটি পান তিনি মুখে পুরে নিতেন। শুরু করতেন গান। পান হলে তার গান হতো ৬-৭ ঘণ্টা ধরে। তিনি যে কক্ষে গানের আসর বসাতেন সেখানে কেউ ঘড়ির দিকে তাকাত না। নজরুলের গান রচনার আর রেকর্ডের আস্তানা ছিল কলকাতার বিষ্ণু ভবন। সেখানে যিনি প্রতিদিন চা বানাতেন তার নাম ছিল সুধীর এবং কাজ ছিল প্রতি আধ ঘণ্টা পরপর কবিকে হাফ-কাপ চা এনে দেওয়া। তা-ই হতো। কিন্তু এই চায়ের রূপ দুধের স্বল্পতার কারণে কালচে-লাল হতো কখনো কখনো। রসিকতায় কবি সে চায়ের নাম দেন ‘সুধীর বাবুর বদরক্ত’।

কপিরাইটার নজরুল

নজরুল ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় লেখালিখি করতেন। তখন পত্রিকাটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। সেই পত্রিকায় বিভিন্ন বিজ্ঞাপন যেত। কলকাতার এক বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী নজরুলের কাছে এলেন তার বাদ্যযন্ত্র কোম্পানির জন্য একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে দিতে। কোম্পানিটির নাম ছিল ডোয়াকিন অ্যান্ড সন্স। তাদের তৈরি হারমোনিয়ামের জন্য নজরুল তৎক্ষণাৎ একটি বিজ্ঞাপন লিখে ফেললেন,

‘কি চান? ভাল হারমোনি?/কাজ কি গিয়ে-জার্মানি?/আসুন দেখুন এই খানে,/যেই সুর যেই গানে,/গান না কেন, দিব্যি তাই,/মিলবে আসুন এই হেথাই,/কিননি কিন, ডোয়ার কিন।

আনন্দের আবাদ

একদিন গোপীনাথ নামের একজন কবিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের মনে এত আনন্দ আসে কোত্থেকে?’

এমন প্রশ্ন শুনে কবি বলে ওঠেন, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে, শোন, আনন্দ কোত্থেকে জাগে, তার উত্তর নেই, কিন্তু নিরানন্দ কেন হবে, তার উত্তর শুনতে চাই তোমার কাছে।’

 গোপীনাথ জবাব দিলেন, ‘দেশ পরাধীন, ইংরেজ সাহেবদের অত্যাচারে বিচলিত সবাই। এমন যন্ত্রণার মধ্যে আনন্দ জাগে কীভাবে? দেশে অবস্থিত সব ইংরেজ আমাদের শত্রু, এত জ¦ালা-যন্ত্রণার মধ্যে হাস্যরস থাকে?’

নজরুল ভারী গলায় বললেন, ‘এ শত্রুদের ভাসিয়ে দিতে হলে চাই প্রাণবন্যা, এরই আবাদ করছি আমরা এখানে।’

            গ্রন্থনা : আবির হাসান