পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন, সুদিনের স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা

পাবনায় প্রথমবারের মতো এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহারে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন চাষিরা। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিক এই পদ্ধতিতে কমপক্ষে ৯ মাস পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন কৃষক। পরীক্ষামূলক সংরক্ষণে সফলতা আসায় এ পদ্ধতি নিয়ে আশাবাদী কৃষিবিভাগও।

দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনায় পেঁয়াজ সংরক্ষণে এখনো চাষিদের নির্ভরতা মান্ধাতার আমলের বাঁশের মাচা পদ্ধতি। প্রকৃতি নির্ভর এই পদ্ধতিতে সংরক্ষিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়। বাধ্য হয়ে উত্তোলন মৌসুমে একসঙ্গে সব পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন কৃষক। কম দামে সে পেঁয়াজ কিনে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট কারসাজিতে বাড়ে দাম। নাভিশ্বাস ছুটে ভোক্তাদের।

পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকের সংকটে এবার পাবনা কৃষকদের সুদিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এয়ার-ফ্লো মেশিন সংযুক্ত আধুনিক সংরক্ষণাগার। এতে একটি সেমিপাকা ঘরে ১০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১০ ফুট প্রস্থের একটি বাঁশের মাচা ও ইটের দেওয়াল তৈরি করে মোটর সংযুক্ত একটি এয়ার-ফ্লো মেশিন বসিয়ে চেম্বার তৈরি করা হয়। প্রতিটি চেম্বারে সংরক্ষণ করা যায় প্রায় ৩০০ মণ পেঁয়াজ। দিনে ছয় ঘণ্টা মেশিন চালু রাখলে পেঁয়াজে পচন ধরবে না দাবি উদ্যোক্তাদের।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (আশা) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় জেলার সুজানগর উপজেলায় চারজন কৃষকের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার। স্বল্প খরচের এই সংরক্ষণ পদ্ধতিতে ভালো ফল পেয়েছেন কৃষকেরা।

আশার আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (কৃষি) মো. শামসুদ্দিন বলেন, সুজানগর উপজেলায় প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। সাধারণত বাজারে নতুন পেঁয়াজ ওঠার পরেই দাম কমতে থাকে। এজন্য কিছু দিন সংরক্ষণ না করতে পারলে চাষিদের কোনও লাভ থাকে না। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে বাঁশের মাচা বা চাঙে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলে অধিক তাপমাত্রায় ঘেমে যাওয়া, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পে পচন ধরা ও রঙ নষ্ট হওয়াসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হন চাষিরা।

কিন্তু, এয়ার ফ্লো মেশিনে কৃষকদের বাড়িতে সংরক্ষণ ব্যবস্থায়, ছাদযুক্ত টিনের কিংবা ইটের ঘরের মেঝেতে ইট দিয়ে মাচা তৈরির পর ছিদ্রযুক্ত মাদুর বা বানা দিয়ে ঢেকে তার মধ্যে সাড়ে ছয় ফুট লম্বা ও ১৪ ইঞ্চি চওড়া একটি ভার্টিক্যাল সিলিন্ডার বসানো হয়। এক হর্স পাওয়ারের একটি বৈদ্যুতিক মোটর যুক্ত করে পাখার সাহায্যে উপর থেকে বাতাস টেনে নিয়ে নামানো হয়। পরে আটকে থাকা বাতাস পেঁয়াজের মধ্য দিয়ে বের হয়। ছোট্ট একটি কক্ষে এভাবে বাতাস প্রবাহ করে মজুতকৃত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

শামসুদ্দিন আরও জনান, এয়ারফ্লো মেশিন স্থাপনে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। আর বিদ্যুৎ খরচ হিসেবে মাসে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা গুণতে হচ্ছে কৃষকদের।

সুজানগর উপজেলার পোড়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মাসুদ খান বলেন, তিনি তিনশ মণেরও বেশি পেঁয়াজ পেয়েছেন এবার। আগে চাঙে খামাল দিয়ে পেঁয়াজ রাখতেন। তাতে, ৩০০ মণ পেঁয়াজ রাখলে ১০০ মণ পচে নষ্ট হত। এ বছর এই মেশিন দিয়ে ২২৫ মণ পেঁয়াজ রেখেছেন। পেঁয়াজ আর আগের মতো পচে যাচ্ছে না।

একই গ্রামের হোসাইন খাঁ বলেন, এই মেশিনে পেঁয়াজ রাখলে খুব সুন্দর বীজ হয়। গজায় কম। ঘাটতিও কম। পেঁয়াজের রং এবং গুণগত মান ভালো থাকে। ফলে এই পদ্ধতির প্রতি তাদের নির্ভরতার কারণে অন্যরাও ঝুঁকে পড়ছেন এর প্রতি।

তিনি জানান, প্রতি মণে আগে চার থেকে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ পচে যেত। কিন্তু এভাবে পেঁয়াজ রেখে আমি সাড়ে তিনশ মণ পেঁয়াজ বের করে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার কেজি পেঁয়াজ পচা পেয়েছি। পেঁয়াজে দাগও হয় নাই। পেঁয়াজের জিল থাকে ভালো। এই কারণে আমরা এর নাম দিয়েছি ‘কৃষকের এসি’।

সম্প্রতি, পাবনার সুজানগরে এসে এয়ার ফ্লো মেশিনে পেঁয়াজ সংরক্ষণ পরিদর্শন করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, কৃষি বিজ্ঞানীদের চেষ্টায় উন্নত উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজের জাত আবিষ্কার হয়েছে। তাতে এখন বিঘা প্রতি ৫০ মণেরও বেশি ফলন পাচ্ছেন চাষিরা। সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি হয়। আমরা দেখেছি নতুন প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের কৃষি বিভাগ পরীক্ষা করছে, কার্যকারিতা প্রমাণ হলে ব্যাপক ভিত্তিতে এ ধরনের সংরক্ষণাগার তৈরিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাতে, আমদানি নয় আমরাই ভারতে পেঁয়াজ রপ্তানি করতে পারবো।