এক অন্ধকার সময় সত্যিই আসতে চলেছে

কখনো কখনো আমাদের রাজনৈতিক নেতারাও হঠাৎ করে এমন সব সত্যি কথা বলে ফেলেন যে তাদের চিন্তাভাবনা-দর্শন বুঝে নিতে সময় লাগে না। যেমন আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঢাকঢাক গুড়গুড় না করে আসল কথাটি সেঙ্গোল বিতর্কে বলে ফেলেছেন। নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদিজি কোত্থেকে এক নতুন তথ্যের আমদানি করলেন যে তামিলনাড়ুর প্রাচীন এক দন্ড সেঙ্গোল ১৯৪৭ সালে তামিল শৈব সম্প্রদায়ের পুরোহিতরা স্বাধীনতার মহালগ্নে মাউন্টব্যাটেন, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওই পবিত্র দন্ড হয়ে ওঠে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক। ভারতের স্বাধীনতার এই মূল্যবান সম্পদ সেঙ্গোল অনাদরে কোথায় কোন এক মিউজিয়ামের অন্ধকার কোণে পড়ে ছিল। আমাদের ভারতের গণতন্ত্রের মন্দির নির্মাণকালে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব এদেশের গণতন্ত্রের সার্থক রক্ষা কর্তাদের।

এর জন্য কোথায় ধন্য ধন্য করবে তা নয়। বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এই সেঙ্গোল পর্বটি পুরোপুরি হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির মাথা থেকে বেরিয়েছে বলে শোরগোল তুলেছে। এই হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি আর কিছুই নয়। সংঘ পরিবারের আইটি সেল। সেখানে এমন অনেক তথ্য রোজ চাউর করে জনমনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে ইতিহাস বিকৃতি সব এখন রোজকার বিষয়। সেখানে এমন অনেক সত্য কথন বলে চালানো হয় তা শুনলে গোয়েবলস সাহেব স্বয়ং মূর্ছা যেতেন। যেমন এই সেঙ্গোল কাহিনি। এটি সম্ভবত চোল সাম্রাজ্যের কোনো এক মন্দিরের দন্ড। এটি আচমকাই ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব আরএসএস নেতা এস গুরু মূর্তির। তিনি তামিলনাড়ুর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে তোষামোদ করতে চোল, শৈব ভারত আত্মা সব এক নয়া প্যাকেজ করে জাতীয়তাবাদের আবেগকে জাগাতে চেয়েছেন।

স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেস এই গালগল্প নিয়ে টুইট করে গোটা বিষয়টিই এক বিরাট ধাপ্পাবাজি তা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিবাদ জানিয়ে বলে উঠলেন যে, এতো ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি অপমান। কংগ্রেস কোনোদিনই ভারতের সংস্কৃতির ওপর শ্রদ্ধাশীল নয়।

এই বিবৃতিই আসল হিন্দুত্ববাদী দর্শনের পরম ভক্তের মানসিকতা বেরিয়ে আসে। বিজেপি তো রাজনৈতিক দল মাত্র। অখণ্ড ভারতের চিন্তক তো আরএসএস। বহুত্ববাদী ভারতকে যারা ভালোবাসে, তাদের সংঘ পরিবারের মতাদর্শের সঙ্গে সংঘাত তো এই জায়গাতেই। হিন্দুত্ববাদী, মনুবাদী দর্শনকেই ভারতের সংস্কৃতি বলে মনে করেন অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদি সরকার। এই একমাত্রিক ভারত গড়াই বিজেপির লক্ষ্য। এখন তো স্যাটেলাইটের যুগ। কোনো কিছুই গোপন করা কঠিন। ফলে গতকাল যে নতুন সংসদ ভবনের অনুষ্ঠান হয়ে গেল তাতে যেভাবে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের সাধু সন্ন্যাসী পরিবৃত প্রধানমন্ত্রীর ছবি সামনে এসেছে যে এটি কোনো সংসদ ভবনের উদ্বোধন না নতুন কোনো রাম মন্দিরের শিলান্যাস!

বহুবার বলেছি, আবারও বলব আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ফের একবার দিল্লির মসনদে বসতে পারে, তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা যে কোনোদিন হবে। আজকের সংসদ উদ্বোধনের নামে যেভাবে মহতি হিন্দু সম্মেলনের রমরমা দেখল সারা দেশ, তাতে আর যাই হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সবকা দেশ, সবকা বিকাশ বলা ভবিষ্যতে বোধহয় হাসির খোরাক হবে।

এমন একদিন কুড়ি হাজার কোটি টাকার নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন করা হলো, যেদিন আরএসএসের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের পূজনীয় বিষ্ণু দামোদর সাভারকরের জন্মদিন। এই সাভারকর ব্রিটিশ রাজের কাছে মুচলেকা দিয়ে জেলমুক্ত হয়ে বাকি জীবন মুসলিম বিদ্বেষের মন্ত্র জপতে জপতে কাটিয়ে দিয়েছিলেন।

দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্যতম মস্তিষ্ক এই সাভারকর। বলছি বটে ঘটা করে তার জন্মদিন পালনের উদ্দেশ্যেই এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে আগামীর হিন্দুরাষ্ট্র গড়ে তোলার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে। সংসদ ভবন তো অসিলা মাত্র। এই দিনেই কিন্তু আপাত ছোট্ট অন্য একটা ঘটনা হয়তো অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে। দিল্লি ইউনিভার্সিটির সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে আল্লামা ইকবালের জীবন, সাহিত্য। তার ‘অপরাধ’ তিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের অন্যতম তাত্ত্বিক। আস্তে করে ভুলিয়ে দেওয়া হলো যে এই ইকবাল ছিলেন সাঁরে যাঁহাসে আচ্ছার লেখক।

আসলে, একটা কথা অস্বীকার করা যাবে না। আরএসএস অত্যন্ত শক্তিশালী ও চতুর চরম দক্ষিণপন্থি সংগঠন। তাদের লেখালেখি একটু আধটু পড়লেই তাদের দর্শন আপনি বুঝতে পারবেন। ফলে শুধু সাভারকরের জন্মদিন নয়, সেন্ট্রাল ভিস্তা নির্মাণের পেছনে এক ঢিলে অনেক পাখি মারতে চেয়েছে মোদি সরকার। এক তো, হিন্দু হৃদয় সম্রাট হিসেবে আগামী নির্বাচনের আগে নতুনভাবে মোদির ইমেজ পুনর্নির্মাণ। দ্বিতীয়ত, হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ঘোষণা পাবলিক স্ফিয়ারে নতুন উদ্যমে নিয়ে আসা। তৃতীয়ত, সংসদের জয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক দেশকে পুরোপুরি এক দেশ, এক নেতা সেøাগান দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়া।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী এখনো রাষ্ট্রপতি দেশের এক নম্বর নাগরিক। তাকে না ডেকে নরেন্দ্র মোদির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠাও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দ্রোপদী মুর্মুকে উপেক্ষা আসলেই আদিবাসী জনজাতির মানুষজনের মনুবাদী রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে তোলার পূর্বাভাস। আরএসএসের ভারতে দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখদের কোনো স্বীকৃতি নেই। যেটুকু যা তা স্রেফ ভোটের প্রয়োজনে। গুজরাট ও অন্যান্য অনেক জায়গায় দাঙ্গার সময় দলিত সম্প্রদায়কে কাজে লাগিয়ে পরে তাদের ছিবড়ে করে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে অজস্র তথ্যপ্রমাণ দেওয়া যায়।

স্বৈরাচারী সব শাসকদের বৈশিষ্ট্য আত্মম্ভরিতা ও বিরাটের প্রতি মোহ। বিরাট অট্টালিকা, বিরাট প্রাসাদ, বিরাট মূর্তি প্রতিষ্ঠা। আসলে বিপুলের মধ্য দিয়ে লোকের চোখ ধাঁধানো যায়, আবার লোককে সবক শেখানো যায় যে, দেখো দেখো আমি বিশাল, আমি গগনচুম্বী, তোমার সাধ্য কি আমাকে ছোঁয়ার!

ভয় হয় ভারত সত্যি এক ভয়ংকর সময়ের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই যে এবার মোদি খোলাখুলিভাবে ধর্মীয় সাধুদের দিয়ে হিন্দু কার্ড খেললেন, এ এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়াও। যা ইচ্ছে করব, দেখি কে আমাকে থামায়! কর্নাটকের হার মানতে না পারাও এই অহমিকার উদগ্র প্রকাশ। সংসদ ভবনের চাকচিক্য তুমুল। কিন্তু মোদি জমানায় সংসদ অধিবেশনের সংখ্যা নামমাত্র। বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত এই ক’বছরে নেওয়া হয়েছে সংসদকে এড়িয়ে অর্ডিন্যান্স জারি করে। কংগ্রেস মোদির ন’বছর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ন’টি প্রশ্নের মধ্যে আর্থিক পরিস্থিতি থেকে আদানিকা- সব রয়েছে। এসব ব্যাপারে বিজেপি নীরব থাকতে বেশি পছন্দ করে। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী যত বাকপটু হোন না কেন তিনি কখনোই টেলিপ্রম্টার ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোথাও ভাষণ দেন না কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। আর প্রেসের মুখোমুখি হতে তো বোধহয় নরেন্দ্র মোদিজির অ্যালার্জি আছে। তাই তিনি সাংবাদিকদের সতত এড়িয়ে চলেন। ফলে কখনোই জানা যাবে না যে ঠিক কী কারণে তিনি দ্রৌপদী মুর্মুকে গুরুত্ব দিলেন না অথবা কোন যুক্তিতে বহুমাত্রিক ভারতের সংসদ ভবনের উদ্বোধনকে সরকার হিন্দুধর্মের অনুষ্ঠান করে তুলতে গেল!!

আসলে অমিত শাহ যা বলেছেন সেঙ্গোল প্রসঙ্গে। হিন্দুধর্ম আর ভারতের সংস্কৃতি এক। এই অশালীন, সর্বৈব মিথ্যে দর্শনের বিরুদ্ধে এখনো যদি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি রুখে না দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করতে রাস্তায় না নামে তবে এক অন্ধকার সময় সত্যিই আসতে চলেছে। গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত, জওহরলাল নেহরুর দেশ, স্বাধীনতার জন্য হাজার হাজার হিন্দু, মুসলিম তরুণদের আত্মত্যাগ, আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, নৌ বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর হিন্দু মুসলমান কাঁধে কাঁধ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী লড়াই, সিপাহি বিদ্রোহ, ওয়াহাবি, ফারাজি কৃষক আন্দোলনের যাবতীয় গর্বের ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত রোখার দায় আজ সবার।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com