দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বপ্রান্তে ক্ষুদ্র একটি দেশের নাম ফিজি। ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইনে অবস্থিত পৃথিবীর একমাত্র আবাদি অঞ্চল এটি। এ ডেটলাইনের পাশেই রয়েছে একটি মনোরম মসজিদ। এখান থেকেই প্রতিদিন পৃথিবীর সর্বপ্রথম আজান শোনা যায়। ইন্দোনেশিয়ার সময় থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা আগে এখানে ফজরের আজান হয়, আর জাপানের সময় থেকে ২ ঘণ্টা আগে।
এখানেই প্রতিদিন সবার আগে সূর্য ওঠে। এই অঞ্চলে ইসলাম আসে ভারতীয়দের মাধ্যমে। সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের যারা এখানে এসেছিলেন, তারা নামাজ, রোজা প্রভৃতি ধর্মীয় মৌলিক বিষয় মেনে চলতেন। তারা ইসলামের প্রতীকী বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান ছিলেন। তারাই এখানে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু যেহেতু নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না; তা ছাড়া হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখদের সঙ্গে ছিল সার্বক্ষণিক মেলামেশা। ফলে ধীরে ধীরে দ্বীনের অনুসরণ ও ধর্মীয় আমল-আচরণ ম্লান ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
অবশেষে দ্বীনি দাওয়াতের অসিলায় আল্লাহতায়ালা এখানে দ্বীনের আলো পুনরুজ্জীবিত করেন। সর্বপ্রথম সম্ভবত ১৯৬৭ সালে জাম্বিয়া থেকে তাবলিগ জামাতের আগমন হয়। তারাই ধর্মের প্রতি ফিরে আসার প্রেরণা জাগিয়ে তোলে। এখানকার অধিবাসীরাও তাদের ধর্মীয় কর্তব্যের কথা জানতে পারে। নতুন নতুন মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়। সেখানে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ, এখন দেশজুড়ে ধর্মীয় তৎপরতা সযত্নে চলমান।
এখানকার মানুষের মধ্যে দিন দিন ধর্মীয় অনুভূতি বিকাশের ফলে এখানে বেড়েছে মসজিদ-মক্তবের সংখ্যা। কিন্তু মুসলিমদের ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা এখানে ছিল না। পরে বাংলাদেশের মাওলানা আবদুল গোফরানের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা এখানে একটি দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসার সূচনা করেছেন। বর্তমানে ফিজিতে অভিজ্ঞ আলেম তৈরি হচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে ফিজির মুসলিমরা।
দুই হাজার চৌদ্দ সালের এক জরিপে এসেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশের নাম ফিজি। ফিজির রাজধানী সুভা সিটি। দ্বীপ রাষ্ট্রটির মোট আয়তন ১৮ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। ফিজি দ্বীপপুঞ্জে ৮৩০টি দ্বীপ রয়েছে। ফিজির সমাজ মিশ্র ধর্মীয়। জনসংখ্যা ১১ লাখের মতো। মোট জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ খ্রিস্টান, ২৭ শতাংশ হিন্দু ও ৬.৩ শতাংশ মুসলিম। সে হিসেবে মুসলিমদের মোট সংখ্যা ৬৫ হাজারের মতো। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
১৯ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয় অধিবাসীরা ফিজি এসেছিল। তার আগে ১৬৪৩ সালে একজন ডাচ আবেল তাসমান ফিজি আসেন। ১৮৭৪ সালে ফিজি ব্রিটেনের উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯৭০ সালের ১০ অক্টোবর ফিজি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯৮ সালের ২৭ জুন দেশটির নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। একই সঙ্গে দেশের নাম ফিজি দ্বীপপুঞ্জ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
বর্তমানে ফিজিতে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে। দেশটির মুসলিম যুবকরা দিন দিন ধর্ম পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ইসলামবিরোধী নানা প্রচারণা থাকার পরও ফিজির সাধারণ মানুষ ইসলামের প্রতি ঝুঁকছে। বাড়ছে মসজিদমুখী মুসল্লির সংখ্যা। ফিজির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মুসলিমদের জাগরণ চোখে পড়ার মতো। সেখানকার জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় তাদের।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ফিজির মুসলমানরা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লৌটোকাতে সর্ববৃহৎ মসজিদ নির্মাণ করেছেন। দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মসজিদটি নির্মাণে খরচ পড়েছে দেড় মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ টাকা)। ২৫টি মসজিদ রয়েছে ফিজিতে। রয়েছে ১৩টি প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র ও বেশ কিছু মাদ্রাসা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিবসে ফিজিতে সরকারি ছুটি রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মের বিশেষ দিনগুলোতেও ছুটির নিয়ম রয়েছে।