ধার পেতে মানুষ আগে বন্ধু, সহকর্মী বা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভর করত। এসব ধারকর্জ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির সাধ্য বা ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বন্ধু, সহকর্মী বা আত্মীয় থেকে যদিও টাকা পেত তাহলেই মিটত প্রয়োজন। কিন্তু দেশে প্রযুক্তির বিকাশের ফলে এখন তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। এই কার্ডে ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ টাকা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কেনাকাটা ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাচ্ছে। আর কোনো সুদ ছাড়া টাকা পরিশোধে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় মিলছে। এসব কারণে দেশে দিনে দিনে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে লেনদেনও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ মাসে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। এই মাসে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এর আগে ২০২২ সালের এপ্রিলে দেশের ইতিহাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল। ওই মাসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। দেশে দিন দিন ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যাও বাড়ছে। গত মার্চে ক্রেডিট কার্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৭৮ হাজারটি। গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ১৫ হাজার ৮৪১টি। অর্থাৎ ৩ মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬২ হাজার ২০৫টি।
ব্যাংকাররা বলছেন, কার্ডভিত্তিক লেনদেনে গ্রাহক আকৃষ্ট করতে বছরজুড়ে নানা প্রচার চালায় অনেক ব্যাংক। ঈদ বা অন্য উৎসবকে কেন্দ্র করে বাড়তি আকর্ষণের জন্য কেনাকাটার বিল পরিশোধে মূল্যছাড় বা ক্যাশব্যাক অফার দেওয়া হয়। তবে শুধু শুধু অফার বা প্রচারের কারণে নয়, ব্যাংকের সেবার ধরন এবং সুবিধা বিবেচনায় নিজের পছন্দের ব্যাংক বেছে নেন গ্রাহক।
গত এক বছরে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২ লাখ ৮৩ হাজার বা ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ২১ লাখ ১৬ হাজারে ঠেকেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত শীর্ষ ১০ ব্যাংকে রয়েছে ১৪ লাখ ৪২ হাজার কার্ড। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিটি ব্যাংক, যাদের ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা হচ্ছে ৩ লাখ ২০ হাজার, যা মোট কার্ডের ১৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বর মাসে সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ২৭১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের ২ লাখ ৩৬ হাজার কার্ডের বিপরীতে লেনদেন ছিল ২৭০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংকের ১ লাখ ৬৭ হাজার কার্ডের বিপরীতে লেনদেন হয়েছে ৪৭ কোটি টাকা। চতুর্থ অবস্থানে থাকা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এক লাখ ২৮ হাজার ৪৬টি কার্ড রয়েছে। মাত্র ৭ শতাংশ কার্ড নিয়ে এই ব্যাংকটি লেনদেন করেছে ২৫৩ কোটি টাকা। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের পরিমাণ এক লাখ ১৮ হাজার ৫৭৮টি। এই ব্যাংকটি লেনদেন করেছে ৯২ কোটি টাকা।
এছাড়া পর্যায়ক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংকের এক লাখ ১৮ হাজার কার্ডে লেনদেন ২০৩ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এক লাখ চার হাজারের বেশি কার্ড নিয়ে লেনদেন ৩৩৭ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮৮ হাজার ৩৩৫টি কার্ডে লেনদেন প্রায় ১০ কোটি, সাউথইস্টের ৮৪ হাজার কার্ডে লেনদেন ৪৩ কোটি এবং ব্যাংক এশিয়ার ৭৬ হাজার ৫০২টি কার্ড দিয়ে লেনদেন হয়েছে ৯৯ কোটি টাকা।
দেশে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা প্রায় অধিকাংশ ব্যাংকেরই রয়েছে ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডের কার্ড সেবা। তবে এর বাইরে কয়েকটি ব্যাংক কার্ড সেবায় নতুনত্ব আনতে অন্য ব্র্যান্ডের কার্ডও নিয়ে এসেছে। যেমন, সিটি ব্যাংক অ্যামেক্স, প্রাইম ব্যাংক জেবিসি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ডিনার্স ক্লাব, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নেক্সাস পে ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ইউনিয়ন পে ইন্টারন্যাশনাল কার্ড সেবা দিচ্ছে।
দেশের ১৬ বছরের ঊর্ধ্বের যেকোনো নাগরিক ক্রেডিট কার্ড সেবা নিতে পারেন। তবে তার নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা থাকতে হয়। পরিবারের অন্য কেউ উপার্জনক্ষম হলেও তার বিপরীতে কার্ড দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। আর এ কার্ডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়। কার্ডের ব্যবহার সহজ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হচ্ছে।
বিশ্বের সব উন্নত দেশে ক্রেডিট কার্ড এখন বহুল প্রচলিত একটি আর্থিক পণ্য। নগদ টাকার বিকল্প হয়ে ওঠায় এটাকে প্লাস্টিক মানিও বলা হয়ে থাকে। প্রতি দেড় মাস পর নির্দিষ্ট দিনে খরচের টাকা পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না। সেজন্য পৃথিবীজুড়ে দিন দিন ক্রেডিট কার্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। কমছে টাকা বহনের ঝুঁকিও।
বিশ্বের ১২১টি দেশের জনসংখ্যা ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে র্যাংকিং তৈরি করেছে বৈশ্বিক অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যাটিস্টা’। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে কানাডা। দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের ৮২ দশমিক ৭৪ শতাংশের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এ তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ৬৯ দশমিক ৬৬, সুইজারল্যান্ডের ৬৯ দশমিক ২১, দক্ষিণ কোরিয়ার ৬৮ দশমিক ৪৪, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ দশমিক ৭ ও যুক্তরাজ্যের ৬৬ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। ১২১টি দেশের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রাপ্তবয়স্কদের ৪ দশমিক ৬২ শতাংশের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এমনকি নেপালেরও এক দশমিক ৮৭ শতাংশ মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে নেপালের অবস্থান ১০৩তম।