সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে পটুয়াখালীর দুমকির ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য চিকিৎসালয় ‘লুথার্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ (এলএইচসিবি)’ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। বোর্ড কর্মকর্তাদের অবাধ লুটপাট, প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতায় প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকা বেহাত হওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। অর্থ সংকটে ১২ মাসের বেতন বকেয়ায় সৃষ্ট অচলাবস্থায় অর্ধশতাধিক চিকিৎসক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদানে বাংলাদেশ এনজিও ব্যুরো’র তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রসূতি মা ও শিশুস্বাস্থ্য চিকিৎসাসেবার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পটুয়াখালীর দুমকির শ্রীরামপুর গ্রামে লুথার্যান হেলথ কেয়ার বাংলাদেশ নামে হাসপাতালটি চালু হয়। স্বল্প ও নামমাত্র মূল্যে দরিদ্রদের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকা-ে খুব অল্প সময়েই হাসপাতালটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হেলেন রেমা ও তার নিয়োগকৃত অনুগত কয়েকজন কর্মকর্তার নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অসামাজিক কার্যকলাপে হাসপাতালের সেই সুনাম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এডি তরুণ দারিং, পিউস ছেড়াও, ডেভিড ঘোষচক্র প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে দৈনন্দিন আয় ও অনুদানের কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন; যা ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠানের নারীকর্মীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে যুথিকা ম-ল নামে এক কর্মচারী তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডেভিড ঘোষের দ্বারা যৌন হয়রানির বিষয়টি প্রকাশ করলে তোপের মুখে পড়ে হাসপাতাল প্রশাসন। পরে ডেভিড ঘোষকে সরিয়ে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে যুথিকা মন্ডল বলেন, ‘কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এবং তাদের অপকর্ম ফাঁস হওয়ায় বেআইনিভাবে আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’
অভিযুক্ত ডেভিড ঘোষ বলেন, ‘আমি চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে কয়েকজন কর্মচারী আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে।’
জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবে গরমিল ও অস্বচ্ছতার প্রমাণ মেলায় ২০২১ সালে বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদানের অর্থছাড় স্থগিত করে দেয় এনজিও ব্যুরো। এতে প্রতিষ্ঠান মারাত্মক অর্থ সংকটে পড়ে। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হেলেন রেমাকে অপসারণের দাবিতে কর্মচারীরা কর্মবিরতিসহ লাগাতার আন্দোলন শুরু করলে হাসপাতালটির কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। আন্দোলন ঠেকাতে হেলেন রেমা বেশ কয়েকজনের নামে ফৌজদারি মামলা দিয়ে হয়রানি ও ৩ জনকে চাকরিচ্যুতির আদেশ দেন। এতে কর্মচারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে হেলেন রেমার অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনে অনড় থাকার ঘোষণা দেন। ফলে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১২ মাস যাবৎ বেতন ভাতা বন্ধ থাকায় চিকিৎসক কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ড সভাপতি হেলেন রেমা বলেন, এটি সাময়িক সমস্যা, দাতা সংস্থার অনুদান যথাসময়ে ছাড় না করায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই তা ওভারকাম হবে। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।