‘লাল ঘোড়া আমি’ নিছক শিশুসাহিত্য নয়

গায়ের রং টকটকে লাল। কপাল ও কান সাদা। হাঁটুর নিচ থেকে পা চারটিও সাদা। দৌড়ালে মনে হয় শূন্যে ভাসছে। বল‌তে পার এটা কী? ঘোড়া! হ‌্যাঁ, বন্ধুরা ঠিকই ধ‌রেছ।

ত‌বে সাধারণ কো‌নো ঘোড়া নয় এটি। একটা কিশোর উপন‌্যাসের নায়ক সে। শুনবে না কি ঘোড়া‌টির গল্প! জান‌বে তার কথা! দাদা-দাদি কিংবা নানা-না‌নির কাছে শোনা রূপকথার মতো নয় সেটা। গল্পটা অন‌্যরকম।

প্রখ‌্যাত কথাসা‌হি‌ত্যিক হাসান আজিজুল হকের লেখা একমাত্র কিশোর উপন‌্যাস‌ ‘লাল ঘোড়া আমি’। লেখক টকট‌কে লাল টগবগে এক পঙ্খিরাজ ঘোড়ার জীবন কাহিনি ‌লিখেছেন এ উপন‌্যা‌সে। একবার পাঠ কর‌তে শুরু কর‌লে অন‌্য এক জগ‌তে হা‌রি‌য়ে যাবে। উপন‌্যা‌সের শুরুতে লাল ঘোড়া শোনা‌য় তার বর্ণিল শৈশব আর দুরন্ত কৈশোরের গল্প।

নিছক কো‌নো ঘোড়ার জীবন কাহিনিও নয় এটি। লেখক এই উপন্যাসে ঘোড়াকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে মূলত এই সমাজের চিত্রই তুলে ধরেছেন। ঘোড়ার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন মানুষের নানা অসংগতির কথা। গরিব কৃষকের জীবন থেকে শুরু করে অত্যাচারী শাসক রাজার বিমূর্ত চিত্র ফুটে উঠেছে এখা‌নে। অনেক শিক্ষামূলক বিষয়ও আছে। যেমন নিষ্ঠুর মনিব ঘোড়া‌টি‌কে খে‌তে দিত ব‌লে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ঘোড়াটি বলে, ‘কারও কাছ থেকে কোনো উপকার পাওয়া গেলে তা কোনোদিন ভোলা চলবে না।’

এক ম‌নি‌বের কা‌ছেই থম‌কে থা‌কে না ঘোড়াটির জীবন। লাল ঘোড়া আমি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সেই ঘোড়াটি একের পর এক হাত বদল হতে থাকে। তার ভাষায় কিছু নোংরা কাগজের (টাকা) জন্য তাকে বিক্রি করে দেয় মনিবরা। তাই একেক সময় একেক রকম মানুষের সঙ্গে থাকতে হয় ঘোড়াটিকে। আর তাই রংবেরঙের মানুষ দেখে কখনো ব্যথিত হ‌য় আবার কখনো আনন্দিত হয় সে।

প্রথমে এক গরিব মানুষের কাছে ছিল ঘোড়াটি। হাটে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে। চৌদ্দ বছরের কি‌শোর হাশেমের বায়না রাখতে ঘোড়াটি কেনে এক মহাজন কৃষক। হাশেমদের বাড়িতে ঠাঁই হয় ওর। হা‌শেম ওকে ভীষণ ভা‌লোবা‌সে। গুরুত্বপূর্ণ  হাশেমের মাও ঘোড়াটিকে ছেলের মতো আদর ক‌রে মা‌ঝে মা‌ঝে। হা‌শে‌মের বাবা বি‌লের ধা‌রে ঘুর‌তে নি‌য়ে যায়।

অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয় ওর। ওসব মানুষের খপ্পরে পড়ে ও দৌড়ানোর নানা কসরত শে‌খে। বেশ ভালো কাটছিল দিন। একদিন হাশেম ওর পিঠে ওঠে। ঘোড়া চালাতে দক্ষ না হওয়াই ছিটকে পড়ে যায়। পা ভেঙে যায়। এরপর এই বাড়ি থেকে বিদায় হতে হয় ওকে।

ওর তেজের কারণে ওকে কিনে নেয় সেখানকার জমিদার বাবু। নতুন ঠিকানায় গিয়ে ভীষণ সুখে থাকে সে। কিন্তু ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা হয়। নিষ্ঠুর জমিদার খাজনা আদায় করতে কৃষকদের অত্যাচার করে নির্যাতন করে এসব দেখতে হয় ওকে। অত্যাচারীর পতন যে অনিবার্য সে দৃশ্য সে নিজে চোখে দেখতে পায়। একদিন এই জমিদারকে কেটে টুক‌রো টুক‌রো ক‌রে জ‌মি‌তে ছড়িয়ে দেয় গ্রামের মানুষরা। ওই দিন আহত হয়েছিল ঘোড়াটিও। এরপর আবার দুঃখের দিন শুরু হয় তার।

এবার এক দারোগাবাবু নিয়ে যায় ওকে। অসুস্থ শরীরে এই দারোগাকে টেনে নিয়ে বেড়ায় ঘোড়াটি। ঘুষখোর দারোগার নানা অপকর্ম দেখে সহ্য করতে হয়। এখানেই শেষ নয়, হঠাৎ দারোগাটিও বিক্রি করে দেয় ঘোড়া‌টি। কিনে নেয় এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। অনেকদিন ডাক্তার চ‌ড়ে বেড়িয়েছে লাল ঘোড়ায়। তারপর একদিন ঘোড়া‌টির কী হয়? জান‌তে ইচ্ছা কর‌লে সময় করে পড়ে ফেলতে পারো উপন্যাসটি। আরও নানা মজার বিষয় দিয়ে সুসজ্জিত বইটি। এটা পড়‌লে জানতে পারবে ঘোড়ার জীবন আসলে কেমন হয়? ওরা কী খায়? কেমন করে ঘুমায়? কেমন আবহাওয়া পছন্দ করে? ঘোড়াটির দাবি মানুষের চেয়েও শ্রেষ্ঠ সে। কিন্তু মানুষের বুদ্ধির কাছে ওকে হার মানতে হয়।

লেখক হাসান আজিজুল হকের ‘লাল ঘোড়া আমি’ উপন‌্যাস‌টি প্রথম প্রকাশ হ‌য়ে‌ছিল বাংলা‌দেশ শিশু একা‌ডে‌মি থে‌কে প্রকা‌শিত শিশু পত্রিকায়। এরপর শিশু একা‌ডে‌মি বই আকা‌রে প্রকাশ ক‌রে ১৯৮৪ সা‌লের জানুয়া‌রি মা‌সে। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় ও ২০১৬ সা‌লে তৃতীয় মুদ্রণ হয় বইটির। উপন‌্যাসটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ ক‌রে‌ছি‌লেন হাশেম খান। পাতায় পাতায় অসাধারণ ছ‌বিগু‌লো মুগ্ধতায় ভরা। বইটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। লেখক এ উপন্যাসের মাধ্যমে কিশোরদের সামনে এনেছেন সমাজে চলে আসা অসঙ্গতি, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, অন্যায্য শোষণ। অসাম্য ও সুস্থ সমাজের প্রত্যাশী লেখক এই অসঙ্গতি তুলে ধরে প্রত্যাশা করেন আজকের শিশু-কিশোর যারা আগামী দিনের কর্ণধার, তারা পরিবর্তন করবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সব কুআচার। তাদের হাত ধরেই সূচিত হবে অসাম্যের সভ্যতা। সে অর্থে কিশোর উপন্যাস ‘লাল ঘোড়া আমি’ নিছক শিশুসাহিত্য নয়, তার থেকে বেশি কিছু।