আত্মীয়তার ছদ্মাবরণে অপরাধ

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে তার বান্দাদের যে বিধানগুলো দিয়েছেন, তার সবই বান্দার কল্যাণের জন্য। তার কিছু হয়তো আমরা নিজেদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বুঝতে পারি না, আবার কিছু বুঝতে পারি। আল্লাহর বিধানগুলো নিজেদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝে না এলেও মেনে নেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ। অন্যথায় বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।

যেমন নারীদের পর্দার কথাই ধরা যাক। মহান আল্লাহ নারীদের পর্দার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন। ইমানের দুর্বলতার কারণে অনেকে বিধানটিই মানতে চান না, কেউ কেউ মানলেও এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। অথচ এটি না মানার কারণে সমাজের সর্বত্র বিপর্যয় নেমে এসেছে। নারী ও কন্যাশিশুরা ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন; বরং নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের দ্বারাই বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আত্মীয় আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে অনেক নিকটাত্মীয়দের দ্বারা অনেক কিশোরী নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হন। এ জাতীয় অনেক ঘটনা প্রায়ই গণ্যমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ঘটনাগুলো যেন গোটা সমাজে মহামারী আকারে আত্মপ্রকাশ করছে। যার দরুন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।

সমাজে এ ধরনের প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছে। ফলে ধর্মীয় লেবাসেও কখনো কখনো মানুষ এ ধরনের জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে যদি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভয় থাকত, নবী কারিম (সা.)-এর সুন্নত ও নির্দেশনার প্রতি ভালোবাসা থাকত, তাহলে এ ঘটনা ঘটত না।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীর নিরাপত্তার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় সতর্ক করেছেন। তার অন্যতম হলো তিনি নারীদের নিকটাত্মীয়দের সহিংসতার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। হজরত উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হুশিয়ার! (বেগানা) নারীদের কাছে তোমরা প্রবেশ করা পরিত্যাগ করো। সে সময় আনসারিদের এক লোক বলল, দেবর সম্পর্কে আপনার কী মতামত? তিনি বলেন, দেবর তো মৃত্যুতুল্য।’ সহিহ মুসলিম : ৫৫৬৭

অন্য বর্ণনায় আছে, উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাবধান! নারীদের সঙ্গে তোমরা কেউ অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করবে না। আনসার সমপ্রদায়ের এক লোক বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), দেবর সম্পর্কে আপনার মত কী? তিনি বলেন, সে তো মৃত্যু (সমতুল্য)। জামে তিরমিজি : ১১৭১

মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা নববি (রহ.) বলেন, হাদিসে দেবর বোঝানোর জন্য ‘আল হামউ’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। ভাষাবিদদের মতে, এর অর্থ স্বামীর নিকটাত্মীয় বোঝায়। যেমন, স্বামীর বাবা, চাচা, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, চাচাতো ভাই ইত্যাদির মতো কাছের আত্মীয়দের বোঝায়। তেমনিভাবে স্ত্রীর বোন মানে স্বামীর শ্যালিকাসহ শ্বশুরবাড়ির কাছের আত্মীয়দেরও বোঝায়।

হাদিসে নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে সতর্ক করার মানে এই নয় যে, দূরের লোকেরা নিরাপদ; বরং যেহেতু এদের কাছাকাছি বেশি থাকতে হয় ফলে এদের মাধ্যমে ফেতনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি দেখা দেয়। তাই যাদের সঙ্গে কোরআনের নিদের্শমতে পর্দা ফরজ তাদের সঙ্গে নির্জনে একত্র হওয়া দূরের কথা, পরিবারের অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে দেখা দেওয়াও ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। অন্য আত্মীয়দের সঙ্গে সাধ্যমতো নির্জনে মিলিত হওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ নির্জনে কোনো নারী-পুরুষ একত্র হলে, শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে।

ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমার (রা.) তাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিতে গিয়ে বলেন, হে উপস্থিত জনতা, ...সাবধান! কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। জামে তিরমিজি : ২১৬৫

বাস্তবেও নারীরা কাছের আত্মীয়দের মাধ্যমে বেশি সহিংসতার শিকার হয়। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। ‘শতকরা ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয়দের মাধ্যমে। আর ছেলেশিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে তা প্রতি চারজনে একজন।’

সহযোগী এক দৈনিকের তথ্যমতে, মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষিত হয় নিকটাত্মীয় দ্বারা। মেয়ে যখন নিকটাত্মীয় দ্বারা ধর্ষিত হয়, নিজের মা-ও মেয়েকে ঘটনাটি চেপে যেতে বলেন। অর্থাৎ মেয়েটা নিজের মাকেও আপন ভাবতে পারে না। ধর্ষণের শিকার এই মেয়েটিকেই সারাটা জীবন একা একা কষ্টটা বয়ে বেড়াতে হয়। তখন এই পরিবার, এই সমাজ, এই রাষ্ট্র সব কিছু তার কাছে বৈরী, এসবের অংশ হওয়া তো দূরের কথা।

তাই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবার উচিত আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশনা অনুসরণ করা। এর ফলে মহান আল্লাহ আমাদেরকে নিরাপদ জীবন ও সমাজ দান করবেন।