নূন্যতম কর ২ হাজার টাকা যেসব খাতে

প্রস্তাবিত বাজেটে করযোগ্য আয় না থাকলেও অনেকখাতে সেবা নিতে হলে নূন্যতম ২ হাজার টাকার কর দিয়ে বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের স্লিপ দেখাতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত রাজস্ব বাজেট সংক্রান্ত এনবিআরে রুপরেখায় ৩৮টির বেশি সেবার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন আয়কর আইনে এই খাতগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। খাতের সংখ্যা আরো বাড়বে।

আয়কর আইন এরই মধ্যে মন্ত্রী সভার বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে আইনটি চলতি অধিবেশনেই অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত হলে আয়করখাতে অনেক কিছুই নতুনভাবে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর সংশ্লিষ্টরা। নূন্যতম কর নির্ধারণের বিপক্ষে বেশিরভাগ মতামত পাওয়া গেলেও অনেকে আবার এ ধারার পক্ষেই আছে।

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মো আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, অনেকে আয়-ব্যয় ও সম্পদের পরিমাণ গোপন করে ইটিআইএন নিলেও রিটার্ন জমা দেয়া না। এনবিআর মূলত এসব ব্যাক্তিকে খুঁজে বের করতেই ৪৪টি সেবা নিতে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতা মূলক করেছে। কিন্তু এসব ব্যাক্তির সঙ্গে সত্যি সত্যি করযোগ্য আয় নেই এমন অনেকেও পড়ে যাচ্ছে। এদের কাছ থেকে সেবা দেয়ার নামে নূন্যতম ২ হাজার টাকা কর নেয়া হলে বাড়তি বোঝা হয়ে যাবে। তাই আরো খতিয়ে দেখে এ আইন বাস্তবায়নে যেতে হবে। এছাড়া এনবিআরের এত লোকবল নেই যে কে সত্যিকারে হিসাব গোপন করছে তা খুঁজে বের করবে।

আগামী অর্থ বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব জাল বিস্তারে জোর দিয়েছে। ইটিআইএন গ্রহণ এবং রিটার্ন জমায় কঠোরতা আনা হয়েছে। ইটিআইএন ও রিটার্ন জমায়ও কঠোরতা আনা হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থ বছরের অর্থবিলে আইন করে ৪০ ধরনের কাজে ইটিআইএন নেয়ার কথা বলা হয়। তবে বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় এসব কাজে অনেকক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা ছিল বা ছাড় দেয়া হয়েছে।

সরকারের এ আইন মেনে অনেকে ইটিআইএন নিলেও রিটার্ন দাখিল করে না। এতে করদাতা হিসেবে এনবিআরের খাতায় নাম থাকলেও করযোগ্য আয় না থাকায় এনবিআরের আদায়ে প্রভাব পড়ছে না। বর্তমান ৮৭ লাখ করদাতা ইটিআইএন গ্রহণ করলেও রিটার্ন দিচ্ছে গড়ে ৩১লাখ। আগামী অর্থ বছরের প্রস্তাবিত অর্থ বিলে অনেকখাতে রিটার্ন দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এনবিআরের রাজস্ব বাজেট সংক্রান্ত রূপরেখায় ৩৮ ধরনের বেশি খাতে সেবা পেতে গেলে রিটার্ন জমার স্লিপ দেখানো বাধ্যতামূলক করেছে। নতুন আয় আইন অনুসারে আরো ৫খাতে এধরনের সেবার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণের আবেদন করলে; কোম্পানির পরিচালক বা উদ্যোক্তা পরিচালক হলে; আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্র পেতে; সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অধীনে ট্রেড লাইসেন্স লাভ বা নবায়ন; সমবায় সমিতির নিবন্ধন লাভের ক্ষেত্রে।

এনবিআরের রাজস্ব বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাবে, সাধারণ বিমা কোম্পানির সার্ভেয়ার হিসেবে লাইসেন্স পেতে বা তালিকাভুক্ত হতে; নিবন্ধন, স্থানান্তর চুক্তি, বায়নানামা, আমমোক্তারনামা, জমি বিক্রয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা সদরে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ, যেখানে চুক্তিমূল্য ১০ লাখ টাকার বেশি; ক্রেডিট কার্ড নেওয়া বা ধারাবাহিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে (শিক্ষার্থীদের জন্য দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড়); চিকিৎসক, ডেন্টিস্ট, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি, সার্ভেয়ার বা অন্যান্য সমজাতীয় পেশাদারদের পেশাদার সংগঠনের সদস্যপদ লাভ বা টিকিয়ে রাখতে; মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইনের অধীনে লাইসেন্স লাভ ও টিকিয়ে রাখতে; বাণিজ্য ও পেশাদার সংগঠনের সদস্যপদ লাভ ও টিকিয়ে রাখতে; ওষুধ বিক্রির লাইসেন্স পাওয়া ও টিকিয়ে রাখা, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিএসটিআই লাইসেন্স ও ক্লিয়ারেন্স পেতে; যেকোনো এলাকায় গ্যাসের বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্যাসের আবাসিক সংযোগ; ভাড়ায় চালিত লঞ্চ, স্টিমার, ফিশিং ট্রলার, কার্গো, কোস্টার, ডাম্ব বার্জ ইত্যাদিসহ যেকোনো জলযানের জরিপ সার্টিফিকেট লাভ বা তার মেয়াদ অব্যাহত রাখতে;জেলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা পরিবেশ অধিদপ্তরের দ্বারা ইট তৈরির অনুমতিপ্রাপ্তি বা অনুমতি নবায়ন করা, যেখানে যেটা প্রযোজ্য; সিটি করপোরেশন, জেলা সদর দপ্তর ও পৌরসভা এলাকায় আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম বা জাতীয় পাঠ্যক্রমের ইংরেজি সংস্করণের অধীনে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে সন্তান বা পোষ্যের ভর্তির ক্ষেত্রে; সিটি করপোরেশন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় বিদ্যুৎ–সংযোগ পাওয়া; কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাওয়া ও অব্যাহত রাখা; অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া বা অব্যাহত রাখা; আমদানির উদ্দেশ্যে একটি ঋণপত্র খোলা; পাঁচ লাখ টাকার বেশি অঙ্কের পোস্টাল সঞ্চয়ী হিসাব খোলা; ১০ লাখ টাকার বেশি ক্রেডিট ব্যালান্সসহ যেকোনো ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলা ও অব্যাহত রাখা; পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয়; যেকোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা; যেমন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন বা জাতীয় সংসদ; মোটরগাড়ি, স্থান, বাসস্থান বা অন্য কোনো সম্পদ দিয়ে অভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা; ব্যবস্থাপক বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিযুক্ত বা উৎপাদন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক পদে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির ‘বেতন’ হিসেবে অর্থ গ্রহণ; বছরের যেকোনো সময় ১৬ হাজার টাকা বা তার বেশি মূল বেতন গ্রহণ করলে, সরকারি বা কর্তৃপক্ষের, করপোরেশনের, আইন দ্বারা সৃষ্ট সরকারি সংস্থার কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য; মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর বা মোবাইল ফোন অ্যাকাউন্ট রিচার্জের ক্ষেত্রে, অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো কমিশন, ফি বা অন্য ন্যূনতম প্রাপ্তির ক্ষেত্রে; কোনো উপদেষ্টা বা পরামর্শ পরিষেবা, ক্যাটারিং পরিষেবা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট পরিষেবা, জনবল সরবরাহ বা নিরাপত্তা পরিষেবা প্রদানের জন্য কোনো সংস্থার কাছ থেকে কোনো নিবাসীর অর্থ গ্রহণ; মাসিক পেমেন্ট অর্ডারের (এমপিও) অধীনে সরকারের কাছ থেকে কোনো পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা, যদি তার পরিমাণ প্রতি মাসে ১৬ হাজার টাকার বেশি হয়; বিমা কোম্পানির এজেন্সি প্রত্যয়নপত্রের নিবন্ধন বা নবায়ন; দুই-তিন চাকার গাড়ি ব্যতীত যেকোনো ধরনের মোটরগাড়ির ফিটনেস নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন বা নবায়নের ক্ষেত্রে;এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোতে নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থাকে বা মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির লাইসেন্সধারী ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণকারী সংস্থার বিদেশি অনুদান দেওয়া;বাংলাদেশের ভোক্তাদের কাছে যেকোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করা; কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ ও সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ এর অধীনে নিবন্ধিত ক্লাবের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে; পণ্য সরবরাহ, চুক্তি সম্পাদন বা পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে একজন নির্বাহীর দরপত্র নথি জমা দেওয়া; আমদানি বা রপ্তানির জন্য বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়া; রাজউক, সিডিএ, কেডিএ, আরডিএ বা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় যেকোনো ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা জমা দেওয়া। নতুন আয়কর আইন অনুসারে আরো যেসব খাতেও নূন্যতম কর দিতে হবে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি ভাড়া বা লিজ গ্রহণের সময় বাড়ির মালিকের; নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক সেবা বা পণ্য গ্রহণকালে ওই পণ্য বা সেবা সরবরাহকারীর; ট্রাস্ট, তহবিল, ফাউন্ডেশন, এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সং¯’া, সোসাইটি ও সমবায় সমিতির ব্যাংক হিসাব খুলতে ও চালু রাখতে; স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি ও কার্টিজ পেপারে ভেন্ডর বা দলিল লেখক হিসেবে নিবন্ধন, লাইসেন্স বা তালিকাভুক্তি করতে বা বহাল রাখতে; রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে এমন গঠিত কর্তৃপক্ষ বা অন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভায় অনুমোদনের জন্য ভবন নকশার আবেদন দাখিলকালে।