হাসপাতালের ‘অপমৃত্যু’ পরিচালকের দুর্নীতিতে

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় বেসরকারিভাবে পরিচালিত ফাইলেরিয়া হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম অবশেষে বন্ধ হয়ে গেছে। হাসপাতালের অস্থায়ী আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মান্না চক্রবর্ত্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার অভিযোগ, হাসপাতালটির পরিচালক রাকিবুল ইসলাম তুহিনের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা ৯ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় শেষ পর্যন্ত হাসপাতালটি বন্ধই করা হলো।

হাসপাতালের স্টাফদের অভিযোগ, পরিচালনা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জামানতের টাকা আত্মসাৎ, বিদেশি সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ নানা কারণে বিশেষায়িত এ হাসপাতালটির এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলের প্রায় এক হাজার গোদ রোগী (ফাইলেরিয়া রোগী) ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

২০০২ সালে জাপান, কানাডা ও বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ এলাকায় দুটি বহুতল ভবন নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি (আইএসিআইবি) হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে ছিল। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন ওই সময় স্থানীয়ভাবে ১৮ দেশি-বিদেশি চিকিৎসককে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। তবে ২০১২ সালে হাসপাতালটিকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে সংকট সৃষ্টি হলে ভেঙে পড়ে সেবা কার্যক্রম। মুখ ফিরিয়ে নেয় দাতা সংস্থাগুলো। এরপর থেকে ধুঁকে ধুঁকে চলছিল হাসপাতালটি। এরপর ২০২১ সালের শেষে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা লেপরা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ প্যারামেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করে। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান বাংলাদেশ প্যারামেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রাকিবুল ইসলাম তুহিন। এরপর নতুন করে প্রায় ৩৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের পদপদবি অনুযায়ী ফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে নেওয়া হয় ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৩ লাখ করে টাকা। শুরুতে হাসপাতালের কার্যক্রম ঠিকঠাক চললেও হঠাৎ করে বকেয়া পড়তে শুরু করে বেতন-ভাতা। বকেয়া বেতন ও জামানত ফেরত দাবিতে সম্প্রতি কর্মবিরতি পালন করেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা। অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্বে পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও হাসপাতালের সমন্বয়কারী পদত্যাগ করেন। ফাঁস হয় হাসপাতালের দৈনিক আয়ের অর্থ জমা হয়েছে পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে।

এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে  দেয় নেসকো। এরপর গত ৮ মে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে হাসপাতাল ত্যাগ করেন ডা. মান্না।

আরএমও ডা. মান্না চক্রবর্ত্তী বলেন, দীর্ঘদিন থেকে হাসপাতালের চিকিৎসকসহ কর্মচারীদের বেতন বন্ধ। হাসপাতালে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, প্রয়োজনীয় জনবল ও আসবাবপত্রের অভাব, অপারেশন থিয়েটারসহ অন্যান্য বিভাগের যন্ত্রপাতি নেই। তাই পরিচালককে চিঠি দিয়ে হাসপাতাল বন্ধ করার সুপারিশ করেছি।

এ বিষয়ে কথা বলতে হাসপাতালের পরিচালক রাকিবুল ইসলাম তুহিনের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।