এলএসডি, আইস ও ডিওবিতে বেশি আগ্রহ ধনীর দুলালদের

এলএসডি, আইস, ডিওবির মতো দামি এবং ভয়ংকর যেসব মাদকদ্রব্য দেশে পাওয়া যাচ্ছে তার ক্রেতা প্রভাবশালী ও বিত্তবানদের সন্তানেরা। উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশ যাওয়া কিছু শিক্ষার্থীর মাধ্যমে দেশে এসব মাদক পরিচিতি পাচ্ছে।

রাজধানীর গুলশান, বানানী, উত্তরা, ধানমন্ডির বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এসব মাদকের চাহিদা তৈরি হয়েছে। অভিজাত এলাকার বাসাবাড়িতে বসছে মাদকের আসর।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট কাউকে আটক করলে তদবির আসে। মাদক উদ্ধার অভিযানে থাকা একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুলশান এলাকায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার মেয়ে, যার নামের আদ্যাক্ষর ‘পি’, বেসরকারি একটি টিভি চ্যনেলের উপস্থাপিকা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন নিয়মিত এলএসডি ও আইসের মতো মাদক সেবন করছেন বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন তারা। তিনি বলেন, এই মাদকসেবীদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ওপরমহলের সায় পেলেই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকসেবীরা নতুন নেশার নানা ধরনের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। মাদকের বৈশিষ্ট্য হলো ঘন ঘন সেবনের পাশাপাশি পরিমাণও বাড়াতে হয়। বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে যায় যে ওই মাদকে আর নেশা হয় না। তখন মাদকসেবীরা নতুন মাদকের দিকে ঝোঁকে। কারবারিরাও সেটা ধরে নিয়েই নতুন নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ে আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ দেশে প্রথম গ্রেপ্তার হন হাসিব মোহাম্মদ মুয়াম্মার রশীদ নামের এক যুবক। তিনি মালয়েশিয়ার নটিংহাম ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে এই মাদকে আসক্ত হন। দেশে ফিরে নিজ বাড়িতে ল্যাব স্থাপন করে আইস উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। আরেক ভয়ংকর মাদক লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডিসহ প্রথম গ্রেপ্তার হন ইয়াসের রিদওয়ান আনান। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গিয়ে এতে আসক্ত হন। নতুন মাদক ডাইমেথক্সিব্রোমো অ্যাম্ফেটামিন বা ডিওবিসহ গ্রেপ্তার করা হয় আসিফ আহমেদ শুভকে। খুলনার একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন তিনি।

এলএসডি, আইস, ডিওবি ও একদম নতুন এমডিএমএ প্রথমবার জব্দ করেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। ডিএনসির বিভাগীয় কার্যালয় ঢাকার অতিরিক্ত পরিচালক জাফরুল্ল্যাহ কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব মাদক দেশে একেবারেই অপ্রচলিত। যারা বাইরের কান্ট্রিতে (দেশে) পড়তে যাচ্ছে, তারা এসব মাদকে আসক্ত হচ্ছে। তারা দেশে এসে বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দেশে এসব মাদকের বাজার তৈরি হচ্ছে।’

ডিএনসি সূত্র বলছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে ১৭৮ কেজির বেশি আইস জব্দ হয়েছে। সর্বোচ্চ জব্দ হয়েছে গত বছর, যার পরিমাণ ১১৩ কেজি। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, মূলত ২০২১ সাল থেকে আইসের বিস্তার বাড়তে শুরু করেছে। গত ৬ মে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর রহমতের বিল সীমান্ত থেকে সব থেকে বড় চালানটি জব্দ করেছে র‌্যাব, যার পরিমাণ ২৪ কেজি ২০০ গ্রাম।

অন্যদিকে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে এলএসডির ২২৮টি স্ট্রিপ জব্দ হয়েছে। সর্বাধিক ১৬৭ স্ট্রিপ জব্দ হয়েছে গত বছর। এ ছাড়া এলএসডির মতো দেখতে আরেক মাদক ডিওবির ১০০ স্ট্রিপ জব্দ হয় ২০২১ সালে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬ হাজার ৪০০টি মিথাইল ডাইঅক্সি মেথা অ্যাম্ফিটামিন (এমডিএমএ) প্রথম ধরা পড়ে।

আইস : দামি মাদকের মধ্যে অন্যতম আইস। এটি ইয়াবার থেকে বহুগুণে শক্তিশালী ও ভয়ংকর এই মাদক মস্তিষ্কের নিউরনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আগে থেকেই মাদকটি দেশে ব্যবহার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রথম ধরা পড়ে ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার একটি বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে আইস তৈরির দুটি ল্যাব খুঁজে পায় ডিএনসি। গ্রেপ্তার করা হয় হাসিব মোহাম্মদ মুয়াম্মার রশীদকে (৩২)। তার বাবা প্রকৌশলী এবং মা একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক।

জিজ্ঞাসাবাদে হাসিব জানান, তিনি যখন মালয়েশিয়া থেকে দেশে আসেন, তখন এক গ্রাম আইসের দাম ছিল ১২ হাজার টাকা। প্রথমে নাইজেরিয়ার এক নাগরিকের কাছ থেকে কেনেন। পরে বাড়িতে ল্যাব বসিয়ে তিনি নিজেই আইস বানানো শুরু করেন।

ওই অভিযানে থাকা ডিএনসির তৎকালীন সহকারী পরিচালক (উত্তর) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, হাসিব খুবই ভালো পরিবারের সন্তান। ও লেভেল, এ লেভেল সবগুলোতে এ প্লাস পান। স্কুলে কখনো দ্বিতীয় হননি।

হাসিবের মা-বাবার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা ছুটিতে দেশে আসার পর তারা ছেলের মাদকাসক্তির বিষয়টি বুঝতে পেরে রিহ্যাব সেন্টারে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

এলএসডি : আরেকটি দামি মাদক এলএসডি। এখন পর্যন্ত দেশে উদ্ধার মাদকের মধ্যে সব থেকে ভয়ংকরও। এই মাদকে ঝুঁকে পড়ছে বিত্তবানদের সন্তানেরা। দাম বেশি হওয়ায় সবাই এ মাদক সেবন করতে পারে না। এলএসডি ব্যাপক মাত্রায় আলোচনায় আসে ২০২১ সালের ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এক ডাব বিক্রেতার ভ্যানে রাখা দা নিয়ে নিজের গলা কেটে ফেলেন তিনি। পরে তদন্তে জানা গেছে, হাফিজুর এলএসডি সেবন করেছিলেন।

দেশে এলএসডি প্রথম জব্দ হয় ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই। ডিএনসি কর্মকর্তারা ওই দিন রাজধানীর কাফরুল থানাধীন ডিওএইচএস এলাকা থেকে এলএসডিসহ ইয়াসের রিদওয়ান আনান (২০) ও সৈয়দ আহনাফ আতিক মামুদকে (২০) গ্রেপ্তার করেন। তাদের কাছ থেকে ৪৬টি এলএসডি স্ট্রিপ ও ৫ এমএল এলএসডি উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আনানের মা-বাবা দুজনই চিকিৎসক এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। ছেলেকে পড়ালেখার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পাঠান। সেখানেই এলএসডিতে আসক্ত হয়ে পড়েন আনান। শিক্ষা ছুটিতে দেশে আসার সময় তরল এলএসডির সঙ্গে কিছু রেডি স্ট্রিপও নিয়ে এসেছিলেন। তার মাদকাসক্তির বিষয়টি মা-বাবা জানতেন না।

ওই অভিযানে থাকা ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফজলুল হক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের একটি মোড়ক লাগিয়ে তরল এলএসডি এনেছিলেন আনান। দেশে আসার পরে বন্ধু আতিককে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলএসডি বিক্রি করা শুরু করেন।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ডার্ক ওয়েব’ ও ‘টেলিগ্রাম’-এর মতো নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ ব্যবহার করে এলএসডির বিদেশি কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে দেশের ক্রেতা-বিক্রেতারা।

ডিওবি : ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর নতুন মাদক ডিওবিসহ গ্রেপ্তার হন আসিফ আহমেদ শুভ ও অর্ণব কুমার শর্মা। খুলনা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মূল হোতা শুভ খুলনার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতেন। তার বাবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

অভিযান-সংশ্লিষ্ট ডিএনসির পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিটকয়েনের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে ডিওবি আনেন শুভ। প্রথমে বন্ধুদের নিয়ে সেবন করলেও পরে বিক্রি করা শুরু করেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলএসডি ও ডিওবির মতো ভয়ংকর সব মাদক জব্দের পর দেখা যাচ্ছে, যারা তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ, ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে জানেন তারাই এগুলো কিনছেন।’