সংসদ নির্বাচন ঘিরে তৎপরতা আরও বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের

সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে নানাভাবে চাপে রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের তৎপরতাও আগের চেয়ে বেড়েছে; বিশেষ করে গত ২৪ মে ভিসানীতি ঘোষণার পর থেকে। এই তৎপরতা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো। বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সোচ্চার যুক্তরাষ্ট্র। তারা বাংলাদেশের নির্বাচনকে বিশেষভাবে দেখছে। এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা জো বাইডেনের বার্তায় তা স্পষ্ট। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান। এখানে নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্য নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও তাদের কোনো বিষয় নেই। তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। বিষয়টি তারা সরকারপক্ষকেও জানিয়েছেন।

ভিসানীতি ঘোষণার পর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস ১৩ দিনে সরকারপক্ষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যার যার ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্যে বাংলাদেশের যেসব আইন নিয়ে ও যেসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ বা অসন্তোষ রয়েছে, সেগুলোর সংস্কারের বিষয়ে সোচ্চার দেশটি। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও শ্রম আইনের বিষয়ে কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন থেকেই।

গত ২৯ মে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে পিটার হাস বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আইনটি সংস্কারের বিষয়ে জানতে চান তিনি। আবার গত মঙ্গলবার শ্রম অধিকার, কর্ম পরিবেশ ও বিদ্যমান শ্রম আইনের সংস্কার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে তার গুলশানের কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন। এ সময়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে পিটার হাসের ওয়াশিংটন যাওয়ার কথা রয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পিটার হাস কয়েক দিন ধরেই বৈঠক করছেন এসব বৈঠকের আলোচনার বিষয় কী এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা কী এমন প্রশ্নে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র শন ম্যাকিনটোশ ই-মেইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েই আলোচনা করছেন এবং বিষয়টির অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন।

গত সপ্তাহে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে ম্যাকিনটোশ বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয় এবং আইনের সংস্কার এবং বাংলাদেশের শ্রম আইনের বিষয়ে কথা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে মার্কিন মুখপাত্র বলেন, ওই বৈঠকে শ্রম বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, আইনের সংস্কার এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন নিয়ে কথা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনিতেই চলমান রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং করোনা মহামারী-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক মন্দা ও রাজনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর নির্বাচন নিয়ে অন্যান্য বারের মতো এবারও রাজনৈতিক বিরোধ এবং সমঝোতা না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহল পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। এর মধ্যে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। এর বাইরে বরাবরের মতো বন্ধুপ্রতিম ও প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেক বেশি নজর রাখে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে। এছাড়া রয়েছে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। নির্বাচনের আগে এই তৎপরতা আরও বাড়বে বলে মনে হয়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা এসব বিষয় নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সবাই চায়। সরকারপ্রধানও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন নিয়ে যে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীও প্রকাশ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছেন। তাই আমি মনে করি এটা নিয়ে খুব আলোচনার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ডেমোক্রসি নিয়ে তাদের একটা এজেন্ডা আছে। এশিয়াতেও আছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেও এই অঞ্চল দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে আমাদের উদ্বেগের কিছু নেই।’