অধ্যাপক আনিসুর রহমানের পরিকল্পনা কমিশন

নির্মল সেন, দীন মোহাম্মদ ও আবদুর রশীদ ছদ্ম পরিচয়ের অন্তরালে তিনজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ-অধ্যাপক যথাক্রমে নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমান একাত্তরের মার্চে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পৌঁছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে থাকেন। আবদুর রশীদ কখনো অশোক রায়ও হয়েছেন। তাদের কাজের শুরুটা আরও আগে, পঞ্চাশের দশকেই পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা স্পষ্ট হওয়ার পর থেকেই। বিভিন্ন ব্রিটিশ ও মার্কিন বিশ^বিদ্যালয়ে খ-কালীন দায়িত্ব নিয়ে তারা একসময় ভারতও ছাড়েন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এ পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান সংকট নিয়ে গৃহীত অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হওয়ার পর আনিসুর রহমান ম্যাসাচুসেটস-এর উইলিয়াম কলেজে শারদ মৌসুমের অতিথি অধ্যাপক হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় শীর্ষক একটি পাঠ প্রকল্প পরিচালনার নিমন্ত্রণ পান। ওদিকে একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতা ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে রওনা হন, স্বাধীনতার ১৬ ডিসেম্বর তিনি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মুক্ত শহর কুষ্টিয়াতে। উইলিয়ামস কলেজের সঙ্গে চুক্তির বরখেলাপ না করতে এবং প্ল্যানিং কমিশনের কিছু অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ঢাকা না এসে কলকাতা ফিরে গেলেন এবং সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ততদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এসেছেন। উইলিয়ামস টাউন নিবাসী আনিসুর রহমান সংবাদপত্রে দেখছেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং মোশাররফ হোসেন ও রেহমান সোবহানকে সদস্য করে একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে তিনি ডেপুটি চেয়ারম্যানের টেলিগ্রাম পেলেন: APPOINTED MEMBER PLANNIG COMMISSION, JOIN EMMEDIATELY. NURUL ISLAM দিল্লিতে অশোক মিত্রের বাড়িতে অবস্থানকালে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি বলেন: ‘...বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর আমরা দেশে ফিরলে দেশের অর্থনৈতিক প্রশ্নে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য আমাদের ডাক পড়বে, কিন্তু আমাদের উচিত হবে সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে পরামর্শ দেওয়া। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ রাজনৈতিক বিবেচনা অনুযায়ীই নেওয়া হবে, আমাদের কথামতো নেওয়া হবে না, কাজেই এই সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা পার্টি হয়ে গেলে আমাদের পজিশন কম্প্রোমাইজড হয়ে যাবে। এই কথায় আমার সব কলিগ সায় দিয়েছিলেন।’ বন্ধনী দিয়ে আনিসুর রহমান এর পরপরই যোগ করেন যদিও আসল ঘটনা অন্যরকম হয়ে যায়।

দেশে ফিরে জানতে পারেন ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ তার নিয়োগের গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে যোগ দেন, নিভৃতেই থাকতে চেয়েছেন।

‘পথে যা পেয়েছি’ প্রথম পর্ব থেকে উদ্ধৃত: প্রথমে ফোন করলেন পরিকল্পনা কমিশনের ‘মেম্বার ওয়ান’ (অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন)। ‘কী আনিস, তুমি জয়েন করছ না? তোমাকে ভীষণ দরকার অনেক কাজ।’

আমি বললাম ‘আমার সঙ্গে তো দিল্লিতে কথা হয়েছিল আমরা জয়েন করব না। আপনারা জয়েন করে ভুল করেছেন। আমি করতে চাই না। তা ছাড়া, সবাই ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিলে ছাত্রদের পড়াবে কে?’

তখন স্বয়ং ডেপুটি চেয়ারম্যান (অধ্যাপক নুরুল ইসলাম) ফোন করলেন। তাকেও একই কথা বললাম। তিনি বললেন তার সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু আমি বেয়াদবের মতোই বললাম, দেখা করতে হয় আপনি আসুন।’ তিনি আমার শিক্ষকতুল্য (আমাকে সরাসরি পড়াননি, তবে আমার মাস্টার্স থিসিসের এক্সটার্নাল এগজামিনার ছিলেন), তা ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে তার এখন ক্যাবিনেটমন্ত্রীর পদমর্যাদা। তিনি কী করে আমার কাছে আসবেন?’

পরে মেম্বার ওয়ানের মধ্যস্থতায় ডেপুটি চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য (মোশাররফ হোসেন ও রেহমান সোবহান) ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর অফিসে আসেন। সেখানে আনিসুর রহমানকে তাড়াতাড়ি পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দিতে বলেন। আনিসুর রহমান ছয় মাসের জন্য মেম্বার থ্রি হিসেবে যোগ দিতে রাজি হলেন। ছ’মাসে যদি বুঝতে পারেন সরকার তার প্রত্যাশা পূরণ করে এগোচ্ছে তাহলে দায়িত্ব পালন করে যাবেন, নতুবা ছেড়ে দেবেন।

১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ কৃচ্ছ্রসাধনের আদেশ জারি করার লক্ষ্যে তিনি ডেপুটি চেয়ারম্যানকে যে নোট দেন তা আমলা-মন্ত্রী সবাইকে তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন করে তোলার জন্য যথেষ্ট। ১৯৭২ সালেই তার মনে হয়েছে ঢাকায় গাড়ির প্রসেশন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়... ‘আমাদের মতো একটা দরিদ্র দেশে এরকম বিলাসী গাড়ির প্রদর্শন আমাদের দরিদ্র জনগণের জন্য নিদারণ অপমানকর, সমতানীতির বিরুদ্ধে এবং দেশ গড়ার কাজে দরিদ্র জনগণের উৎসাহের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব। এসব গাড়ির স্পেয়ার পার্টস আমদানি নিষিদ্ধ করতে চেয়েছেন যাতে গাড়িগুলোর দ্রুত মৃত্যু ঘটে, অথবা বিদেশে বেঁচে দিতে বলেছেন। গাড়ির ব্যবহার প্রয়োজনভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন, স্ট্যাটাসভিত্তিক নয়।’

তিনি প্রস্তাব করেন, সরকারের মালিকানায় যে সব বড় গাড়ি আছে তা বেশির ভাগ জেনারেল পাবলিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হোক অথবা সম্ভব হলে বিদেশে রপ্তানি করে দেওয়া হোক।

এ আশা তিনি অবশ্যই করতে পারেন, কিন্তু তার নিজের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও সদস্যদ্বয়কে রাজি করাতে পেরেছেন কি না সে সন্দেহ তো রয়েই গেছে। মার্কিন কিংবা ব্রিটিশ বিশ^বিদ্যালয়ে সমাজতন্ত্রের পাঠ নেওয়া তাত্ত্বিক বিদ্বানদের তাতে ‘হ্যাঁ’ করার কথা নয়। আনিসুর রহমান লিখলেন, ‘কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুত সমতাবাদী/সমাজতন্ত্রের পথে এত সহজে এগুবে না। পরিকল্পনা কমিশনের ভেতরেই এবং সঠিকভাবে প্রশাসনে হায়ারার্কিকাল চেতনা তীব্র। অফিসে আমাদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর এবং মেঝেতে শৌখিন কার্পেটের ব্যবস্থা করা হয় সে সময় এটাও আমার অহেতুক বিলাসিতা মনে হয়েছিল। আমি এরকম ঘর নিইনি, কার্পেটবিহীন ফ্যানওয়ালা ঘরেই অফিস করে গেছি।’

তিনি লিখেছেন, শুরু থেকেই প্ল্যানিং কমিশনের সঙ্গে সিভিল সার্ভিসের আমলাদের একটা টেনশনের সম্পর্ক তৈরি হয় ইউনিভার্সিটির মাস্টাররা মন্ত্রী আর প্রতিমন্ত্রীর র‌্যাঙ্ক নিয়ে র‌্যাঙ্কের জোরে সচিবদের ডেকে পাঠাবার অধিকার অর্জন করেছেন। সিএসপিদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং কেউ কেউ পরিকল্পনা কমিশনের প্রফেসরদেরও আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সামন্ত সংস্কৃতি ও আমলা আচরণের নিবিড় নৈকট্য আনিসুর রহমান তুলে ধরেছেন এবং মর্যাদার হায়ারার্কিতে তার সহকর্মীরাও একই সামন্ত সংস্কৃতির ধারক সে ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

‘যুদ্ধবিধ্বস্ত’ দেশজুড়ে মানুষের এত কষ্টের মধ্যে এলিট শ্রেণির ভোগবিলাসের চাকচিক্য দেখে আমি ৮ মার্চ (১৯৭১) প্রধানমন্ত্রীকে ‘প্রথম পদক্ষেপ’ বলে একটি প্রস্তাব লিখে পাঠাই।’ প্রথাগতভাবে ডেপুটি চেয়ারম্যানের হাত হয়ে পাঠাতে গেলে হয়তো আটকে যেত সে আশঙ্কা থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়ে ‘প্রথম পদক্ষেপ’-এর অনুলিপি তাকে দেন। অন্যসব মন্ত্রীকেও দেন। এই কর্মটি ডেপুটি চেয়ারম্যানের ‘অসোয়াস্তি’-র কারণ ঘটিয়ে থাকতে পারে।

বাহাত্তরের এপ্রিলে ঢাকা টেলিভিশনের আগে কেনা কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য সোয়া লাখ টাকার বরাদ্দের জন্য আবেদন জানানো হলে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্বাসন অগ্রাধিকারের কথা বললেন এবং গণমুখী টেলিভিশনের সুপারিশমালা দিতে একটি কমিটি করে দিলেন যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপিত হয়েছে বলা মুশকিল, ‘কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় সদস্যরা যখন ডেপুটি চেয়ারম্যানের অফিস কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভারীকণ্ঠ শোনা যায়, ‘ডাক্তার সাহেব আপনারা পরিকল্পনা কমিশনে খুব বাড়াবাড়ি করেছেন। টেলিভিশনের ওপর কমিটি করতে আপনাদের কে অধিকার দিয়েছে? আমি এর রিটেন এক্সপ্ল্যানেশন চাই।’ ডেপুটি চেয়ারম্যান ঘাবড়ে গেলেন।

‘আনিস, প্রধানমন্ত্রী আমাদের কমিটি করার ওপর রিটেন এক্সপ্ল্যানেশন চাচ্ছেন, কী বলব?’ আমি বললাম এতে তো কোনো সমস্যা নেইÑ আজ তো শনিবার কাল ছুটি আপনি বলেন যে সোমবার সকালে আমরা তার কাছে গিয়ে রিটেন এক্সপ্ল্যানেশন দিয়ে আসব।’

পরিকল্পনা কমিশনের করা কমিটি বাতিল হলো। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লেখা পত্রটি একই সঙ্গে এক্সপ্ল্যানেশন এবং আনিসুর রহমানের পদত্যাগপত্র। দীর্ঘপত্রের শুরুটা ও শেষটা কেবল উদ্ধৃত করছি:

‘টেলিভিশন ব্যবস্থার র‌্যাশনালাইজ করবার জন্য কমিটি’ নাম দিয়ে যে কমিটি গঠন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং যে ঘটনা নিয়ে মনে হয় বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে সেটার জন্ম দেওয়ার জন্য আমিই দায়ী।’ সুতরাং তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো পথ দেখছেন না। অতএব ‘অন্য কোনো আদেশ না পেলে আমি ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে ডেপুটি চেয়ারম্যানের কাছে আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেব।’

অর্থমন্ত্রী পদত্যাগপত্র পড়ে শোনালেন আর প্রধানমন্ত্রী আনিসুর রহমানকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব আমি সব বুঝতে পেরেছি, আপনি সমস্ত ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দেন, আমি সব ঠিক করে দেব। আর পদত্যাগপত্র ছি ছি আমাকে এভাবে লজ্জা দেবেন না।... আমি বুঝতে পেরেছি আপনাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ করার একটা বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। কারা এটা করছে তাও আমি বুঝে গেছি।’

প্রধানমন্ত্রীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে কি আর পদত্যাগ করা যায়?

প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য লন্ডনে। এ সময় পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রী আর তাকে জড়িয়ে ধরে আটকাতে পারবেন না। ২ আগস্ট ১৯৭২ প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসাকালীন অনুপস্থিতির সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। কমিশনের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হননি তখনো। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দাখিলের পর ২ অক্টোবর ১৯৭৩ তিনি কমিশন থেকে বেরিয়ে এলেন, তার ভাষায় প্রধানমন্ত্রী আমাকে (পরিকল্পনা কমিশন থেকে) ছেড়ে দিলেন।

অনুমেয়, পরিকল্পনা কমিশন হয়েছিল বটে, কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি। এটা না  টেকারই কথা।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

momen98765@gmail.com