ক্যাশলেস সোসাইটি গড়তে রোডম্যাপ প্রয়োজন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

কর আদায় নিশ্চিতের জন্য ক্যাশলেস লেনদেন বড় পরিসরে চালু করার আহ্বান জানিয়েছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিকি)। আগামী অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে সংস্থাটি বলছে, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার রোডম্যাপ প্রয়োজন। যাতে এটি সবাই অনুসরণ করতে পারে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এ দাবি জানান। সম্মেলনে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং আয়কর আইন (আইটিএ) ২০২৩-এর খসড়া নিয়ে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিকি। ফিকির নেতারা মনে করেন, করপোরেট এবং সংস্থাগুলোর জন্য নগদ লেনদেন সীমিত করা দেশের উন্নয়নকে সীমাবদ্ধ করবে, কারণ বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি নগদহীন লেনদেন করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। সরকারের উচিত কোম্পানিগুলোর নগদ লেনদেনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ না করে তার খরচের ন্যূনতম শতাংশ ব্যয় করার অনুমতি দেওয়া। যেন পরবর্তী পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে তারা শতভাগ নগদহীন লেনদেনের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।

ফিকি নেতারা বলেন, নতুন অর্থবছরে কার্বোনেটেড পানীয় শিল্পের (বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি) ন্যূনতম কর দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে মোট প্রাপ্তির ৫ শতাংশ বা ৮ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে কোমল পানীয়ের দাম বাড়বে ৩০ শতাংশেরও বেশি। এ খাতে ইতিমধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরোক্ষ কর দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। তাই কার্বোনেটেড বেভারেজে ন্যূনতম ১ শতাংশ কর আরোপের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

ফিকি সভাপতি নাসের এজাজ বিজয় বলেন, আয়কর রিটার্ন জমা হওয়ার পর অ্যাপের মাধ্যমে কনফারমেশন বার্তা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রচলিত আয়কর আইন সেটাকে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে মানে না। ডিজিটাল যুগে অ্যাপে পাওয়া বার্তাকে গ্রহণ করা প্রয়োজন। গাড়ি কেনার ওপর যে কর আরোপ হয়েছে, তা শুধু ব্যক্তির ওপর বহাল করা উচিত বলে মনে করে ফরেন চেম্বার।

বক্তব্যে ফিকি সভাপতি বলেন, কিছু বিধান বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা এবং ব্যক্তির প্রবৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ওপর আরোপিত ভ্যাট এবং লোকসানে থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর করের বোঝা বাড়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতি এড়াতে পারে, এমন সমাধানের বিষয়ে আমাদের কিছু সুপারিশ রয়েছে। আমরা আশা করি যে, সুপারিশগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং চেম্বারকে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অব্যাহত সমর্থন রেখে করবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হবে।

বক্তারা বলেন, খসড়া আয়কর আইন (আইটিএ) ২০২৩-এর বিধানগুলোর গভীর ও বিস্তৃত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ এ আইনের কিছু বিধান আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর বিবেচনায় অযৌক্তিক। আমরা আশা করেছিলাম নতুন আইনে ন্যূনতম করের বিধানগুলো ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে। তার পরিবর্তে সেগুলো উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, ধার্য করের বিধান থেকে একটি অনুবিধি বাদ দেওয়া। এ অনুবিধির অনুপস্থিতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং বিধানটি তার কার্যকারিতা হারাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর মতো একই বিধান প্রস্তাবিত আইনে বা বিধিতে অব্যাহত না থাকলে আধুনিক বাণিজ্যে ডিস্ট্রিবিউটরদের সরবরাহের ওপর করের বোঝা, আমদানিকরা পণ্যের সরবরাহ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, প্রণোদনা বোনাস অতিরিক্ত লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি কোম্পানির ওপর আরও করের বোঝা চাপিয়ে দেবে এবং পরবর্তী সময়ে কর্মচারীদের উপার্জনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসায়িক ক্ষতির বিপরীতে অন্য আয় সচল রাখার অনুমতি না দেওয়া করের চেতনার বিরুদ্ধে যায়। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের সুদের ওপর করের বিধান এবং তৃতীয়পক্ষের বিক্রেতার দ্বারা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ দিতে ব্যর্থতার জন্য তার সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক দিতে অননুমোদন দেওয়ার বিধানটি বাদ দেওয়া উচিত।

খসড়া আয়কর আইন (আইটিএ) ২০২৩ অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে ডব্লিউপিপিএফ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং লভ্যাংশ থেকে আয়ের ওপর আর কোনো ছাড় পাবেন না। লিভ ফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স (এলএফএ) এখন থেকে করের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা কি আদৌ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে কি না এবং সেটা থেকে কর ছাড় পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা নেই। মিউচুয়াল ফান্ড/ইউনিট তহবিল এবং সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বেসরকারি স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলে কর আরোপ করা কর্মীদের আয় হ্রাস করবে এবং সরকারি ভবিষ্যৎ তহবিলকে করমুক্ত হিসেবে রাখার বিষয়টি বৈষম্য সৃষ্টি করবে।

সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ফিকির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি দিপাল আবেবিক্রম, নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবীর প্রমুখ।