বাড়ছে পানিতে ডুবে মৃত্যু

রাজশাহীতে একের পর এক ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসবের শিকার বেশিরভাগই শিশু বা কিশোর। গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। আর মারা যাওয়া শিশু-কিশোরের অধিকাংশই সাঁতার জানত না। দমকল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডুবে মারা যাওয়া শিশু-কিশোরের ৯৫ ভাগই সাঁতার জানত না। চলতি বছর রাজশাহী শহরেই একাধিক ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা শহরে বেশ আলোচিত হয়। এর একটি ঘটে গত শনিবার পদ্মা নদীতে।  রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় পদ্মা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হয় দুই বন্ধু। তারা হলো রাজশাহী নগরীর মেহেরচ-ি এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে গোলাম সারোয়ার সায়েম (১৭) ও নগরীর দরগাপাড়া এলাকার মৃত খাজা মইন উদ্দিনের ছেলে রিফাত খন্দকার গালিব (১৭)। দুজনই রাজশাহীর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসির প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, পদ্মা নদীতে বর্তমানে কোথাও কম গভীর আবার পাশেই কোথাও অনেক বেশি গভীর। এ কারণে সাঁতার না জানা অনেকেই নদীতে হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে হঠাৎ গর্তে পড়ে আর উঠতে পারে না। সায়েম ও গালিবও এভাবেই গোসল করতে গিয়ে গভীর পানিতে পড়ে আর উঠতে পারেনি। গত ৩০ মে নগরীর হেতেমখাঁ গোরস্তানসংলগ্ন এলাকার একটি পুকুরে গোসলের সময় দুই শিশু ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে নির্ঝর নামে এক শিশুর বয়স ৯ বছর। আরেক শিশুর নাম অনন্ত। তার বয়স ছয় বছর। এ দুই শিশুর কেউই সাঁতার জানত না। রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ২৩টি ঘটনায় তাদের ডাক পড়ে। এসব ঘটনায় ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১২ জন ছেলে এবং ২ জন মেয়ে। ৯ জনকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দিন দিন পুকুর-ডোবা কমে যাওয়া বা সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যাওয়া ও অনাগ্রহের কারণে শিশুরা সাঁতার শিখছে না।। এমনকি আগে গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়েই বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাঁতার শিখে নিত। কিন্তু এখন অধিকাংশ ছেলেমেয়েই বড় হচ্ছে সাঁতার না শিখে।

অভিভাবকরা বলছেন, আগে বাড়ির পাশেই অনেক পুকুর থাকত। এসব পুকুরই গোসলের প্রধান জায়গা ছিল। বাচ্চারা বাবা-মায়ের বা বড় ভাইবোনের কাছ থেকেই সাঁতারটা শিখে নিত। এখন আর বাড়ির পাশে পুকুর নেই। মানুষ গোসল করে বাড়িতেই। এ কারণে সাঁতার আর শেখা হয় না। আবার গ্রামে সাঁতার শেখার জন্য তেমন ব্যবস্থাও নেই।

রাজশাহী নগরীর বড়কুঠি এলাকার বাসিন্দা আবদুর রউফের এক মেয়ে ও এক ছেলে। তারা পড়াশোনা করে। কিন্তু সাঁতার জানে না। তাদের সাঁতার শেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চাকরি করি। ছেলেমেয়েদের এর ফাঁকে ফাঁকে স্কুল, কোচিং ও প্রাইভেটে নিয়ে যাই। কিন্তু সাঁতার শেখানোর সময় হয় না। আমরা চেষ্টা করি ছুটির সময় তাদের সাঁতার শেখাতে, বিশেষ করে তাদের বার্ষিক পরীক্ষার পর। তবে সে সময় শীত থাকে। তাই আর হয়ে উঠে না।

বাংলাদেশ জাতীয় সাঁতার দলের সাবেক কোচ আলমগীর হোসেন বলেন, সাঁতার জানতে হবে। সাঁতার না জানার কারণে আমাদের দেশে প্রতি বছরই বহু মানুষ মারা যায়। মানুষ এটা বুঝতে পারে না যে শিক্ষার পাশাপাশি তাদের সাঁতার শিক্ষাও দিতে হবে। কেননা এই ছেলেটা ডুবে মারা গেলে তার শিক্ষার তো কোনো দাম থাকবে না। জীবন বাঁচাতে তাই সাঁতার শেখাতে হবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে এই আগ্রহটা এখন অনেক কম। সবাইকেই নিজের নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে সাঁতার তাদের শিশুর জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই অনীহা না দেখিয়ে সাঁতার শেখাতে হবে।

রাজশাহী সদর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবদুর রউফ বলেন, রাজশাহীতে যেসব শিশু ও কিশোর পানিতে ডুবে মারা গেছে তারা প্রায় সবাই সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা গেছে। আমরা যখন তাদের পরিবারকে লাশ বুঝিয়ে দিই তখন তাদের কিছু তথ্য নিয়ে থাকি। সেখানে দেখা গেছে প্রায় ৯৫ ভাগ শিশুই সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যায়।

তিনি বলেন, আমরা তো সব সময় প্রচার-প্রচারণা চালাই। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সাঁতার শেখার বিষয়ে কথা বলি। তবে অভিভাবকরা আগ্রহ দেখান না। তাদের কাছে সাঁতার শেখার সময় কম। কিন্তু এই সাঁতার শেখানোর জন্য অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।