‘চেয়ারম্যান আমার বাবাকে খেয়ে ফেলেছে’

‘আমার বাবা (গোলাম রাব্বানী নাদিম) সাহসী সাংবাদিক ছিল। সে সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখত। বাবু চেয়ারম্যানের (মাহমুদুল আলম) নারী কেলেঙ্কারি নিয়েও লিখেছিল। চেয়ারম্যান আমার বাবাকে হুমকি দিয়েছিল। সে আমার বাবাকে খেয়ে ফেলেছে। আমি আমার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’ গতকাল শুক্রবার বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন জামালপুরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমের মা আলেয়া বেগম। পাশাপাশি এখনো অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন তিনি।

আলেয়া বেগমের মতো মাহমুদুলের গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভা থেকে। এ ছাড়া ঘটনা নিয়ে পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে।

গত বুধবার রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে বকশীগঞ্জের পাথাটিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি নাদিম। বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ গত বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করেছে। ঘটনার তদন্তে নেমেছে র‌্যাবও। আর নাদিমের পরিবার বলছে, জামালপুরের বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক নাদিমকে খুন করা হয়েছে।

গ্রামের বাড়িতে দাফন : গতকাল সকালে পৌর শহরের গরুরহাটি কাচারিপাড়ার বাড়ি গেলে দেখা যায় শেষবারের মতো নাদিমকে দেখতে মানুষের ঢল নেমেছে। বাড়ির উত্তর কোণে নাদিমের মা আলেয়া বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। আর বারবার বিলাপ করছিলেন। সেখান থেকে সকাল ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ পৌর শহরের নুর মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নেওয়া হয় নাদিমের মরদেহ। সেখানে প্রথম জানাজার পর মরদেহ নেওয়া হয় উপজেলার নিলাখিয়া ইউনিয়নের গোমেরপাড়ার গ্রামের বাড়িতে। সেখানে জিগাতলা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

এর আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাদিমের মরদেহ বকশীগঞ্জ উপজেলার গরুরহাটি কাচারিপাড়া এলাকার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

নির্যাতনের সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল, আটক ৬ : নাদিমের ওপর হামলার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমকর্মীসহ অনেকেই ফেসবুকে শেয়ার করছেন। ওই ফুটেজ দেখে গত বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।

ভাইরাল হওয়া ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার রাত ১০টা ১৭ মিনিটে সাংবাদিক নাদিমের মোটরসাইকেল বকশীগঞ্জ পৌর শহরের পাটহাটি মোড় অতিক্রম করছিল। এ সময় একজন সন্ত্রাসী চলন্ত মোটরসাইকেলটির পেছনে দৌড়ে গিয়ে টেনে ধরে এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পড়ে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একদল সন্ত্রাসী সেখানে আসে। সবাই মিলে ওই সাংবাদিককে মারধর শুরু করে এবং মারতে মারতে টেনেহিঁচড়ে পাশের অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায়। সেই জায়গাটি সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে নিয়ে তাকে আরও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ওই সাংবাদিক অচেতন হয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাকে ফেলে পালিয়ে যায়। মাত্র ৩২ সেকেন্ড সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হামলার দৃশ্য ধরা পড়ে।

বকশীগঞ্জ থানার ওসি মো. সোহেল রানা জানান, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা হলো গোলাম কিবরিয়া (সুমন), মো. তোফাজ্জল, মো. কফিল উদ্দিন, মোহাম্মদ আয়নাল হক, মো. শহিদ ও ফজলুল হক। তাদের বাড়ি বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। তাদের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া সুমনের বাড়ি বকশীগঞ্জ পৌর শহরের পাটহাটি এলাকায়। যেখানে হামলার ঘটনাটি ঘটে। তিনি যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। মোহাম্মদ আয়নাল হককে সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর ঘনিষ্ঠ হিসেবেই সবাই চেনেন। বাকি চারজনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের লোকজন পলাতক।

ওসি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিভিন্নজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় অপরাধীরা দ্রুত গা-ঢাকা দিয়েছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বাকিদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে র‌্যাব : এদিকে সাংবাদিক নাদিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে র‌্যাব। গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক হত্যা খুবই দুঃখজনক। এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই র‌্যাব ছায়াতদন্ত করছে। র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৪ আসামিদের ধরতে কাজ শুরু করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

জামালপুরে প্রতিবাদ সভা : সাংবাদিক নাদিম হত্যার প্রতিবাদ ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে জামালপুরে প্রতিবাদ সভা হয়েছে। এতে এ ঘটনায় সাংবাদিক সংগঠনের লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণাসহ হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নাদিমকে নিয়ে পুলিশ সুপারের দেওয়া বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের আয়োজনে পৌর শহরের শহীদ হারুন সড়কে এ প্রতিবাদ সভা হয়। জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম এতে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় সাংবাদিক নেতারা তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিন দিনের কর্মসূচির মধ্যে কালো ব্যাজ ধারণ, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান রয়েছে।

সভায় সাংবাদিক নেতারা বলেন, এই প্রথম জামালপুরে কোনো সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুসহ নেপথ্য মদদদাতা ও সক্রিয় অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ ফাঁসির দাবি জানানো হয়।

সভায় সাংবাদিক নেতারা বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠানে জামালপুরের পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হত্যার উদ্দেশ্যে সাংবাদিক নাদিমের ওপর হামলা করা হয়নি। তাকে সতর্ক করার জন্য আঘাত করা হয়েছে। তার এ বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার করে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেন নেতারা।

নাদিম হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকার সাভার, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট, খুলনা, নাটোর, রাজবাড়ী, বরিশালেও মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা হত্যার প্রতিবাদ ও হামলায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানান। দ্রুত এ হত্যার বিচার ও তদন্ত না হলে কঠোর আন্দোলনে নামার হুমকিও দেন তারা।