রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার দামোদারপুর ইউনিয়নের চানকুটি গ্রামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী লাবিন হোসেন। গ্রামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হওয়ার পেছনে সম্পূর্ণই যেন দিনমজুর বাবার অবদান।
লাবিন বর্তমানে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। লাবিনের শৈশব কেটেছে বদরগঞ্জ উপজেলার চানকুটি নামক ছোট্ট গ্রামে।
দিনমজুর বাবা জেনারুল হকের হাত ধরেই ছয় বছর বয়সে গ্রামের হাড়িয়ার কুঠি স্বতন্ত্র মাদ্রাসায় ভর্তি হন লাবিন। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর পরিবারের অভাব অনটনের শিকার হয়ে বাবার সাথে ইট ভাটায় মজুরির কাজ করতে যেতেন লাবিন।
তখন ১ হাজার ইট সাজিয়ে পারিশ্রমিক মাত্র ২০-২৫ টাকা পেতেন লাবিন। একদিন বাবা লক্ষ্য করলেন, কাজ রেখে স্কুল ফেরত শিক্ষার্থীদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সেদিন ই তার দিনমজুর বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, লাবিনকে আর মাঠে কাজ করাবেন না। স্কুলে পাঠাবেন। সেদিনের পর লাবিন ইটভাটায় যেতে চাইলেও বাবা জেনারুল হক তাকে যেতে দেন নি। এরপর থেকে হাড়িয়ার কুঠি দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতে থাকেন লাবিন।
বাবা জেনারুল সবসময় বলতেন, তোকে আমি দিনমজুর নয়, শিক্ষিত হিসেবে দেখতে চাই। অভাবের কারণে কখনো না খেয়ে, কখনো একবেলা খেয়ে দিন কাটলেও সিদ্ধান্তে অটল থাকেন বাবা।
'লাবিন,বাবা তুই পারবি' কথাটিই বারবার পড়তে বাধ্য করেছে লাবিনকে, জুগিয়েছে সাহস, জোগাড় করেছে শক্তি ও ধৈর্য।
লাবিনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার দাদাও ছিলেন দিনমজুর যিনি শেষ বয়সেরও এসে দারোয়ানের কাজ করছেন। তিনিও তার সন্তানকে পড়াতে চাইছিলেন, কিন্তু অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারেনি তার বাবা।
লাবিন বলেন,বাবা বারবার আমাকে সাহস জুগিয়েছেন; যতবার বলেছি বাবা,আমি পারব না ঠিক ততবারই তিনি বলেছেন তুই পারবি বাবা,তুই পারছিস বাবা,তুই ই পারবি। মা গৃহকর্মী, বাবা দিনমজুর বাড়িতে আমি সহ আরও দুই বোন- সংসারে অভাবের এমন চিত্র দেখে কতবার যে ভেঙে পড়েছিলাম, কতবার যে বলেছি আমিও উপার্জন করব আমিও সংসারের হাল ধরব তার ঠিক নেই।আর ততবারই বাবা বলতেন লাবিন, তুই পারবি বাবা।ঠিক যেন আবার নিজেকে গুছিয়ে নিতাম,অনুপ্রেরণা পেতাম আর ভাবতাম আমি হয়তো পারব।
বাবার এমন অনুপ্রেরণার কথা স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে লাবিন জানান, এসএসসি পরীক্ষার আগে ফর্ম ফিলাপের জন্য তখনই দেড় থেকে দুই হাজারের মত টাকা লেগেছিল। অভাবের কারণে বাবা সেই টাকা জোগাড় করতে পারেনি। ঘুরেছেন বেশ কিছু জায়গায় কিন্তু ব্যবস্থা করতে পারেন নি সেই টাকা। অবশেষে বাবার পছন্দের গাছ, যেটি দিয়ে কিনা বাবা বাড়ির আসবাবপত্র, খাট বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন সেই টাকার জন্য বাবা সেটিকেও বিক্রি করতে দ্বিধা করেননি। সেদিন লাবিনও সংকল্প করেছিল বাবার জন্য কিছু করবে,বাবার স্বপ্ন পূরণে নিজেকে মিলিয়ে ধরবে।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির স্বপ্ন দেখে লাবিন।কিন্তু ভর্তি যুদ্ধের জন্য কোনো কোচিং-এ ভর্তি হওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না তার। বাবার বিশ্বাসকেই পুঁজি করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নেন নিজে নিজেই। সাফল্যও আসে প্রথমবারই। প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পরে আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হন লাবিন।
গ্রামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী লাবিনের এই কৃতিত্বের জন্য বাবাও বেশ বুক ফুলিয়ে গ্রামে বলে বেড়ান তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। একদিন তার অভাব ঘুচবে তারই ছেলের হাত ধরে।গ্রামের শিক্ষার জন্যও অবদান রাখবে সে।
লাবিন বলেন,আজ বাবা না থাকলে এতদূর, এভাবে কখনই আসতে পারতাম না।বাবার জন্যই আমি আজ পাবলিকিয়ান, বাবার জন্যই আমি গ্রামের প্রথম স্নাতক সম্পন্নকারী হবো। আমার এই অবস্থানের পেছনে আমার দিনমজুর বাবার অবদানই মুখ্য।বাবার স্বপ্ন পূরণই আমার লক্ষ্য।